বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের নতুন অধ্যায়: তারেক রহমানের নেতৃত্বে
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পর থেকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিচয় ও জাতীয়তাবাদের ধারণা নিয়ে নতুন করে ভাবনার সময় এসেছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের ঘটনাপ্রবাহ এবং সাম্প্রতিক নির্বাচনের ফলাফল আমাদের দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
শেখ ওসমান হাদির শাহাদত এবং জাতীয় জাগরণ
২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর ইনকিলাব মঞ্চের তরুণ নেতা শেখ ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হন। এক সপ্তাহ পর তার মৃত্যুর পর ১৯ ডিসেম্বর ঢাকায় আট-দশ লাখ মানুষের জমায়েত হয়। হাদি ছিলেন বাংলাদেশে ভারতের একচেটিয়া প্রভাবের বিরোধী একটি কণ্ঠস্বর। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে শেখ হাসিনার সরকার বিরোধী ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের অন্যতম নায়ক ছিলেন তিনি।
তার জানাজায় আকাশ-বাতাস কাঁপানো ইনকিলাবি হুঙ্কারে মুখরিত হয়েছিল রাজধানী। "গুলামি না আজাদি?" এই প্রশ্নের জবাবে জনতার কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছিল "আজাদি, আজাদি।" "দিল্লি না ঢাকা?" প্রশ্নের উত্তরে উত্থিত হয়েছিল "ঢাকা, ঢাকা" স্লোগান।
এই ঘটনার পর ঢাকার কয়েকটি সংবাদপত্রের দফতরে আগুন দেওয়া হয়। এমনকি রবীন্দ্রভাবনায় উদ্বুদ্ধ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পথিকৃৎ ছায়ানটের কার্যালয়ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এসব ঘটনা প্রমাণ করে যে, আমাদের জাতীয় পরিচয় ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা নিয়ে গভীর সংকট বিরাজ করছে।
বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু এবং তারেক রহমানের উত্থান
কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে। তিনবারের প্রধানমন্ত্রী ও প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু হয়। তার জানাজায় স্যাটেলাইট প্রযুক্তির হিসাব অনুযায়ী প্রায় কুড়ি লাখ মানুষ অংশগ্রহণ করে।
মায়ের মৃত্যুর অল্প আগে, ১৭ বছর ইংল্যান্ডে প্রবাসে থাকার পর ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফিরেছেন তারেক রহমান। বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টির (বিএনপি) হাল ধরেন তিনি। মির্জা ফখরুল, নজরুল ইসলাম খান, আমির খসরু চৌধুরীদের মতো অভিজ্ঞ নেতাদের সাথে নিয়ে তিনি সারাদেশ চষে বেড়ান।
আমেরিকার নেতা মার্টিন লুথার কিং-এর "I Have a Dream"-এর আদলে তারেক জনতাকে বলেন "I Have a Plan"। এই পরিকল্পনার মূলে রয়েছে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের নতুন রূপায়ণ।
নির্বাচনের ফলাফল এবং নতুন চ্যালেঞ্জ
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে ভোট দেয়। আওয়ামী শাসনামলে ভোটের নামে যে প্রহসন হয়েছে, তার বিপরীতে এবার বাংলাদেশের জনগণ ২০০৮ সালের পর প্রথমবারের মতো সত্যিকারের ভোটাধিকার প্রয়োগ করে। এখন বাংলাদেশের ক্ষমতায় তারেক রহমান ও তার রাজনৈতিক আদর্শ বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ।
তবে প্রধানমন্ত্রী তারেকের সামনে চ্যালেঞ্জ কম নয়। প্রথমত, বিএনপির মধ্যে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব রয়েছে। দ্বিতীয়ত, দেশের অর্থনীতি থমকে আছে। বস্ত্রশিল্পসহ রপ্তানি-নির্ভর শিল্পগুলো সমস্যায় পড়েছে।
জাতীয় স্বাধীনতা বনাম বিদেশি প্রভাব
তৃতীয়ত, জামায়াত তারেককে নিশ্চিন্তে কাজ করতে দেবে না। জামায়াতকে ঠেকাতে হাসিনাকে বাদ রেখে আওয়ামী লীগকে রাজনীতির মাঠে নামার সুযোগ হয়তো তারেক দেবেন। একদিকে জামায়াত, অন্যদিকে আওয়ামী লীগ, তারেকের পরিকল্পনা ভেস্তে দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে।
চতুর্থ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হলো ভারতের সাথে সম্পর্ক। আমাদের দেশে আওয়ামী লীগকে ভারতপন্থী হিসেবে দেখা হয়। তারেককে সাবধানে এই জটিল রাজনৈতিক খেলা খেলতে হবে। ভারতের সাথে সুসম্পর্ক রাখা ঢাকার জন্য প্রয়োজনীয়, কিন্তু জামায়াত বা ছাত্র-যুব চালিত ন্যাশনাল সিটিজেনস পার্টি সুযোগ পেলেই বলবে যে বিএনপি দিল্লির কাছে দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দিচ্ছে।
স্বাধীনতার নতুন সংজ্ঞা
হাদির জানাজায় ওঠা "দিল্লি না ঢাকা? ঢাকা, ঢাকা!" স্লোগান এখন বিএনপির ভোটপ্লাবনে স্তিমিত। কিন্তু এটা ভাবার কারণ নেই যে এই আওয়াজ আর ফিরবে না। আমাদের জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আমাদের অবস্থান স্পষ্ট হতে হবে।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আমরা একটি স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশ চেয়েছিলাম। আজ সেই স্বাধীনতার অর্থ নতুন করে সংজ্ঞায়িত করতে হবে। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের এই নতুন অধ্যায়ে আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়, ভাষাগত স্বাতন্ত্র্য এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতা রক্ষা করতে হবে।
তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের এই নতুন যাত্রা আমাদের জাতীয় মুক্তির সংগ্রামের ধারাবাহিকতা। এই পথে চলতে গিয়ে আমাদের সকল বিদেশি প্রভাব থেকে মুক্ত থেকে নিজস্ব পথ খুঁজে নিতে হবে।