ভারতের তৃণমূলে ভাঙন: কাকলির বিদ্রোহ ও স্বৈরাচারের পতন
স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের সংগ্রামে ঋদ্ধ বাঙালির ইতিহাস। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ আমাদের শিখিয়েছিল, স্বৈরাচার আর নীতিহীনতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হয়। সেই একই সংগ্রামের প্রতিধ্বনি এবার শোনা যাচ্ছে প্রতিবেশী দেশের বাংলায়। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেসের ভেতরে যে তাসের ঘরের মতো ধস নামছে, তা প্রমাণ করে যে গণতান্ত্রিক নীতির ভিত্তি ছাড়া কোনো রাজনৈতিক কাঠামোই টিকে না। চার বারের সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদারের বিদ্রোহ সেই স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রামেরই এক নতুন অধ্যায়।
নীতিহীনতার প্রতিবাদে কাকলির বিদ্রোহ
গত একমাসের মধ্যে লোকসভা নির্বাচনের ফলের পর তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে যে ফাটল ধরেছে, তার শুরুটা হয় বারাসাতের সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদারকে দিয়ে। তিনি সরাসরি দলের শীর্ষ নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নীতি এবং শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতার বিরুদ্ধে Social Media-তে তির্যক মন্তব্য করে সরব হয়েছেন। শুক্রবার তাঁর একটি অত্যন্ত অর্থপূর্ণ পোস্ট ঘিরে রাজনৈতিক মহলে তীব্র জল্পনা শুরু হয়েছে।
Chief Whip পদ হারানো ও সংঘাতের সূত্রপাত
ছাব্বিশের লোকসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের আগে পর্যন্ত দিল্লির দরবারে তৃণমূলের লোকসভার Chief Whip পদে ছিলেন কাকলি। কিন্তু নির্বাচনে দলের ভরাডুবির পর আচমকাই তাঁকে সেই পদ থেকে সরিয়ে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে দায়িত্ব দেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এই সিদ্ধান্তের পরেই প্রথম Social Media-তে বেসুরো পোস্ট করেন কাকলি। এরপর জেলা সভাপতির পদ থেকেও ইস্তফা দিয়ে দলের সঙ্গে দূরত্ব বাড়াতে শুরু করেন তিনি। তৈরি হয় অন্য দলে যাওয়ার জল্পনা।
নীতির জয় ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে
চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তৃণমূল নেত্রীর ছায়াসঙ্গী কাকলি এ দিন Social Media-তে নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থের চেয়ে বৃহত্তর নীতির কথা তুলে ধরেছেন। পোস্টে সরাসরি দল বা দলনেত্রীর নাম উল্লেখ না করলেও তাঁর নিশানা যে কালীঘাট, তা বুঝতে বাকি নেই রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের।
কাকলি লিখেছেন, 'আপনি কী মনে করেন? একটি রাজনৈতিক পরিবারের ৪ বারের সংসদ সদস্য, যিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত থেকে ৪ দশক ধরে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন, তিনি নিজের স্বার্থের কথা ভাবেন? এটা আসলে নীতির বিরুদ্ধে এবং শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতার বিরুদ্ধে দেওয়া একটি রায়।'
কাকলির এই বিস্ফোরক মন্তব্য স্পষ্ট বুঝিয়ে দিচ্ছে যে, বর্তমান পরিস্থিতি ও দলীয় টানাপড়েনের জন্য তিনি সরাসরি তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বের নীতির অভাব এবং শাসনের ব্যর্থতাকেই দায়ী করছেন। স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে যে প্রতিবাদ জন্ম নেয়, তা ক্ষমতার অহংকারে অন্ধ নেতৃত্বকে শেষ পর্যন্ত গিলে খায়। এটি ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের চেতনারই সমার্থক, যেখানে নীতি ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা স্বৈরতন্ত্রকে পরাস্ত করেছিল।
বিধানসভার পর লোকসভায়ও ভাঙন?
ইতোমধ্যেই বিধানসভায় তৃণমূলের পরিষদীয় দল ভেঙে খানখান হয়ে গিয়েছে। বহিষ্কৃত নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সন্দীপন সাহার নেতৃত্বে জোট বেঁধেছেন প্রায় ৫৮ জন বিদ্রোহী বিধায়ক, যাঁরা নিজেদেরই 'আসল তৃণমূল' বলে দাবি করছেন। বিধানসভার পর এবার কি লোকসভাতেও একই ভাঙন অপেক্ষা করছে?
রাজ্যসভার আরেক সাংসদ সুখেন্দুশেখর রায়ও দল হারার পর বড় কথা বলেছিলেন। যখন দলের বিভাজন স্পষ্ট, তখন তিনি বলেন, 'আমি রাজ্যসভার সাংসদ। লোকসভার বিষয়ে বলতে পারব না। তবে দিল্লিতে থাকার সময় শুনেছি যে লোকসভার কয়েকজন সংসদ এ বিষয়ে চিঠি দিতে চলেছেন। বাকিটা সময় এলে দেখা যাবে। তবে ৬০ বছরের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে এরকম প্রথম দেখলাম যে একটি দল ভোটে হারার কয়েকদিনের মধ্যেই এরকম বিধ্বস্ত অবস্থায় চলে এসেছে। এই জল অনেকদূর যাবে। আর জল তো সবসময় নিচের দিকেই গড়ায়। পরিস্থিতি যা তাতে বুঝতে পারছি তৃণমূল কংগ্রেস তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে।'
সার্বভৌমত্বের পাঠ ও আগামী দিন
রাজনৈতিক সূত্রের খবর, আগামী রবিবার তৃণমূলের লোকসভার বিক্ষুব্ধ সাংসদরা একটি গোপন বৈঠকে বসতে চলেছেন। জল্পনা চলছে, এর পরেই তাঁরা লোকসভার স্পিকারের কাছে দল ভাঙার চিঠি জমা দিতে পারেন এবং সেখানে লোকসভার নতুন দলনেতা হিসেবে কাকলি ঘোষ দস্তিদারের নাম প্রস্তাব করা হতে পারে। যদিও এই বিষয়ে এখনও পর্যন্ত কাকলি আনুষ্ঠানিক ভাবে কোনও মন্তব্য করেননি। তবে তাঁর রোববারের পদক্ষেপের দিকেই এখন চাতক পাখির মতো তাকিয়ে রয়েছে বাংলার রাজনৈতিক মহল।
প্রতিবেশী দেশের এই রাজনৈতিক অস্থিরতা আমাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। সার্বভৌমত্ব ও গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষায় সচেতন একটি জাতি কখনও বিদেশি প্রভাবের কাছে মাথা নত করে না। ১৯৭১-এর মতো আজও প্রমাণিত হচ্ছে, নীতি ও আদর্শের পতন ঘটলে ক্ষমতার তাসের ঘর মাটিতে মিশে যায়। মুক্তির সংগ্রাম কেবল অস্ত্রের নয়, নীতির জয়েও নির্ভরশীল।