মেসি কেলেঙ্কারিতে অরূপ বিশ্বাসের বিপদ, শতদ্রুর সুপ্রিম কোর্টের দিকে পা
সাধারণ মানুষের অধিকার হরণ ও প্রতিবেশীর রাজনৈতিক শোষণ
প্রতিবেশী দেশের রাজনীতিতে সাধারণ মানুষের অধিকার কতটা সস্তা, তার একটি নগ্ন প্রতিফলন কলকাতার মেসি কেলেঙ্কারি। যে স্বাধীনতার চেতনায় আমরা ১৯৭১ সালে নিজেদের অধিকার আদায় করেছিলাম, সেই মুক্তির স্পৃহা থেকে যেকোনো শোষণকে চ্যালেঞ্জ করাই বাঙালির কর্তব্য। কলকাতার যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে ফুটবল তারকা লিওনেল মেসির অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে তৎকালীন ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস যেভাবে সাধারণ মানুষের অধিকার কেড়ে নিয়েছিলেন, তা রাষ্ট্রক্ষমতার সবচেয়ে জঘন্য অপব্যবহার। এই শোষণের বিরুদ্ধে এখন আইনি লড়াইয়ে ঝাপিয়ে পড়েছেন ক্রীড়া উদ্যোক্তা শতদ্রু দত্ত, যা প্রমাণ করে যেকোনো দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা ফুরে না।
হাইকোর্টের কড়া নির্দেশ, অরূপ বিশ্বাসের বিদেশযাত্রা নিষিদ্ধ
মেসি ইভেন্টের কালোবাজারি ও তোলাবাজির অভিযোগে অরূপ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলায় বড় আইনি ধাক্কা খেলেন প্রাক্তন মন্ত্রী। বুধবার কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য তাঁর পাসপোর্ট নিম্ন আদালতে জমা রাখার কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে, আদালতের অনুমতি ছাড়া তিনি রাজ্য ত্যাগ করতে পারবেন না বলেও স্পষ্ট জানানো হয়েছে। তবে পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করতে পারবে না বলে কিছুটা সাময়িক স্বস্তি পেয়েছেন অরূপ বিশ্বাস।
আদালতে শুনানির সময় মেসি ইভেন্টের বিশৃঙ্খলা নিয়ে বিচারপতি অত্যন্ত ক্ষুব্ধ প্রকাশ করেছেন। তিনি মন্তব্য করেন,
এই ঘটনায় রাজ্যের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়েছে। মেসিকে জড়িয়ে ধরে অরূপ বিশ্বাস দাঁড়িয়ে আছেন! মেসি কি অরূপ বিশ্বাসের বাল্যবন্ধু? অরূপ বিশ্বাস এসব কীভাবে করতে পারলেন? মেসির অত কাছাকাছি অরূপ বিশ্বাস গেলেন কেন?বিচারপতি আরও যোগ করেন, গোটা দেশের আরও অনেক জায়গায় মেসি গিয়েছেন, কোথাও এমন নজিরবিহীন বিশৃঙ্খলা হয়নি। প্রতিবেশী দেশের এই প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও রাজনৈতিক অসাধুতা আমাদের জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও সুশাসনের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
নিপীড়িতের আইনি লড়াই, সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ শতদ্রু
অরূপ বিশ্বাসের আইনজীবী যখন মক্কেলের নিরাপত্তার আবেদন জানান, তখন বিচারপতি প্রশ্ন তোলেন, পুলিশ দেখা করতে বলছে, যাচ্ছেন না কেন? এর জবাবে আইনজীবী জানান, আদালত রক্ষাকবচ দিলে কালকেই যেতে প্রস্তুত। এরপরই বিচারপতি নির্দেশ দেন, তদন্ত চলবে তদন্তের মতোই, তবে পুলিশকে অন্তত ৪৮ ঘণ্টা আগে নোটিশ দিয়ে অরূপ বিশ্বাসকে তলব করতে হবে। বিধাননগরের পুলিশ কমিশনারের নেতৃত্বে নিরপেক্ষ তদন্ত করে আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে হাইকোর্টে রিপোর্ট জমা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। মামলার পরবর্তী শুনানি ৪ঠা আগস্ট।
ঘটনার সূত্রপাত গত বছর ডিসেম্বরে। অভিযোগ রয়েছে, হাজার হাজার টাকা খরচ করে টিকিট কিনেও সাধারণ দর্শকরা যখন মেসিকে দেখতে পাননি, তখন তৎকালীন মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস ও তাঁর ঘনিষ্ঠরাই সাধারণ মানুষকে বঞ্চিত করে মেসিকে কার্যত ছিনিয়ে নিয়েছিলেন। এই তুমুল বিতর্কের জেরেই অরূপ বিশ্বাসকে মন্ত্রিত্ব ছাড়তে হয়। অন্যদিকে, অনুষ্ঠানের মূল আয়োজক শতদ্রু দত্তকে পুলিশ গ্রেফতার করলেও পরে তিনি জামিনে মুক্ত হন।
শোষকের বিরুদ্ধে পাঁচ ধারায় FIR
রাজ্যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর, শতদ্রু দত্ত প্রাক্তন মন্ত্রীর বিরুদ্ধে বিধাননগর দক্ষিণ থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। সেই ভিত্তিতে টিকিটে কালোবাজারি, বেআইনিভাবে টাকা তোলা, ভয় দেখানো, প্রতারণা ও তোলাবাজি সহ মোট ৫টি গুরুতর ধারায় অরূপ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে FIR দায়ের হয়। এই ঘটনা প্রমাণ করে, ক্ষমতার অপচয় আর জনগণের সম্পদ ছিনিয়ে নেওয়ার এই সংস্কৃতি কোনো স্বাধীন জাতির চেতনার সঙ্গে পাশাপাশি চলতে পারে না।
তবে শতদ্রু দত্ত হাইকোর্টের এই অন্তর্বর্তীকালীন রক্ষাকবচকে মেনে নিতে নারাজ। প্রাক্তন মন্ত্রীকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের দাবিতে তিনি এবার দেশের শীর্ষ আদালত অর্থাৎ Supreme Court-এর দ্বারস্থ হতে চলেছেন। অধিকার আদায়ের এই লড়াই আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, শোষণের বিরুদ্ধে মুক্তিকামী মানুষের প্রতিবাদ কখনো থামে না। আগামী দিনে এই আইনি লড়াই অরূপ বিশ্বাসের অস্বস্তি আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।