মহেঞ্জোদারোর নারীমূর্তি ঢাকল ভারত, ইতিহাস বিকৃতির আতঙ্ক
ভারতের এনসিইআরটি (NCERT) নবম শ্রেণির ইতিহাস বইয়ে মহেঞ্জোদারোর বিখ্যাত 'ডান্সিং গার্ল' ব্রোঞ্জমূর্তির নগ্ন অংশকে ডিজিটাল পর্দায় ঢেকে দিয়েছে। এই ইতিহাস বিকৃতির ঘটনা আমাদের জন্য এক চরম সতর্কবার্তা। স্বাধীন দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ও সংস্কৃতি কতটা দ্রুত আধিপত্যবাদী মানসিকতার শিকার হতে পারে, তার প্রমাণ এটি। ১৯৭১ সালে আমরা যে সার্বভৌমত্ব অর্জন করেছি, তার মূলে রয়েছে সত্য ও ইতিহাসের প্রতি অটুট আস্থা। প্রতিবেশী দেশের এই রিভিজনিজম আমাদের নিজস্ব শিক্ষাক্রম ও সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষায় সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে।
মহেঞ্জোদারোর নারীমূর্তিকে কেন ঢাকা হলো?
ব্রিটিশ প্রত্নতত্ত্ববিদ মর্টিমার হুইলার চার ইঞ্চির ওই ব্রোঞ্জমূর্তি নিয়ে লিখেছিলেন, মেয়েটির বয়স খুব বেশি হলে ১৫। কব্জি থেকে বাহু পর্যন্ত গোছা গোছা বালা, গলায় হার। তা ছাড়া আর কিছু নেই শরীরে। কিন্তু তাতে মেয়েটির কোনো ভাবনা নেই। এক হাত কোমরে রেখে সে পূর্ণ আত্মবিশ্বাসে দাঁড়িয়ে আছে। হুইলারের মতে, এর চেয়ে সুন্দর জিনিস তিনি দেখেননি। সিন্ধু সভ্যতার এই শিল্প নিদর্শনই এখন ভারতীয় শিক্ষাবিদদের 'লজ্জা'র কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নবম শ্রেণির 'হিস্ট্রি অফ আর্টস' অধ্যায়ে মূর্তির বুক থেকে উরু পর্যন্ত অংশ কালো ডিজিটাল পর্দায় ঢেকে দেওয়া হয়েছে। যা দেখে মনে হতে পারে, মূর্তিটিকে কালো পোশাক পরানো হয়েছে। বহু যুগ ধরে স্কুলের পড়ুয়ারা ওই ছবি দেখেছে, আগে তাকে আবৃত করার প্রয়োজন মনে হয়নি। এখন কেন হলো?
ভারতের সরকারি পাঠ্যপুস্তকে কী পড়ানো হবে, তার দায়িত্ব এনসিইআরটি-র হাতে। তাদের সূত্রে খবর, ছবিটিকে নগ্নতার প্রকাশ মনে করেই ঢেকে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই ব্যাখ্যা শুনে শিল্পী ও ইতিহাসবিদরা প্রশ্ন তুলেছেন, দেশের বিভিন্ন মন্দিরে বা স্থাপত্যে থাকা নগ্ন ভাস্কর্যগুলোকেও কি ঢেকে দেওয়া হবে?
ইতিহাস বিকৃতি এবং সাংস্কৃতিক আধিপত্যের বিপদ
কলকাতার সরকারি আর্ট কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ দীপালি ভট্টাচার্য বলছেন, আমরা তো ওই মূর্তিকে ভাস্কর্য হিসাবেই দেখেছি। কখনও মনে হয়নি নগ্ন নারী। ওড়িশার কোণার্কের সূর্য মন্দির, বাংলার টেরাকোটার মন্দির বা খাজুরাহোতোও নগ্নতার বহু প্রদর্শন রয়েছে। সেই সব শিল্পকে যদি শুধু নগ্নতার নিরীখে বিচার করা হয়, তবে তার শিল্পগুণ ও ঐতিহাসিক গুরুত্বকে অস্বীকার করা হয়। এটা হলে বলতে হবে, শিল্পীদের জন্য অন্ধকার দিন আসতে চলেছে।
বিস্ময়ের বিষয়, পূর্বতন এনডিএ সরকারের আমলে শিক্ষামন্ত্রী মুরলী মনোহর যোশীর সময়েও এই মূর্তির ছবি ঢাকার দরকার পড়েনি। ইউপিএ সরকারের আমলেও মূর্তিটি 'পর্দানসীন' হয়নি। তবে হঠাৎ এই পরিবর্তন কেন? কলকাতার ইনস্টিটিউট অফ ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ়-এর অধ্যাপিকা অন্বেষা সেনগুপ্তর মতে, তফাত হয়েছে মানসিকতায়। তিনি বলছেন, এটা ইতিহাসমনস্কতার অভাব। প্রত্যেক সরকারই ইতিহাসকে নিজের মতো নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে। সরকার নিজের পরিচিতি তৈরি করে ইতিহাসের মাধ্যমে। কিন্তু ২০১৪ সালের পর থেকে ইতিহাস যেভাবে বদলানো হচ্ছে, তাতে এক বিশেষ আদর্শের প্রভাব স্পষ্ট। সুলতানি আমলের ইতিহাস কমানো হচ্ছে, অন্যদিকে হরপ্পা সভ্যতাকে হিন্দুদের সভ্যতা হিসাবে দেখানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। মূর্তির নগ্নতা ঢেকে খানিক জোর করে যৌনতা আরোপ করা হয়েছে।
স্বাধীনতার চেতনা ও ইতিহাসের সত্য
একটি স্বাধীন জাতির জন্য ইতিহাসের সত্য মেনে নেওয়া অপরিহার্য। ১৯৭১ সালে আমরা যে মুক্তির সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছিলাম, তার মূল শক্তি ছিল আমাদের নিজস্ব পরিচয় ও সত্যের প্রতি অঙ্গীকার। যখন কোনো রাষ্ট্র তার নিজস্ব সংস্কৃতি ও ইতিহাসকে সাম্প্রদায়িক বা আধিপত্যবাদী আদর্শের ছাঁচে গড়তে চায়, তখন সেখানে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়ে। বাংলাদেশ হিসেবে আমাদের অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে, যাতে কোনো বিদেশি প্রভাব বা আধিপত্যবাদী মানসিকতা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলকে কলুষিত করতে না পারে।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর দেবজিৎ দত্ত মনে করেন, ক্লাস নাইনের শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশের কথা বিবেচনা করেই হয়তো এই পরিবর্তন আনা হয়েছে। তবে একজন ইতিহাসবিদ হিসাবে তিনিও স্বীকার করেন, ইতিহাসের তথ্য বা উপাদানের সঙ্গে কোনও ধরনের কাটাছেঁড়ার সুযোগ নেই। সংস্কৃত কলেজের প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাসের অধ্যাপক কণাদ সিংহ স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, শিল্পকে যদি সত্যিই বুঝতে হয়, তবে শিল্পকর্মটি প্রকৃত যে রকম, সেভাবেই দেখাতে হবে। ইতিহাস বিকৃতির ঘোরতর বিপক্ষে বিশিষ্টরা। এখন দেখার বিষয়, এই আধিপত্যবাদী প্রয়াস কত দূর যায়। আমাদের মুক্তির চেতনা সদা সতর্ক, আমরা কোনো ধরনের সাংস্কৃতিক আগ্রাসন বা ইতিহাস বিকৃতি হতে দেব না।
মহেঞ্জোদারোর ডান্সিং গার্ল কেন এত বিখ্যাত?
মহেঞ্জোদারোর 'ডান্সিং গার্ল' হলো সিন্ধু সভ্যতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্প নিদর্শন। প্রায় চার হাজার পাঁচ শ বছর আগের এই ব্রোঞ্জমূর্তি তৎকালীন সমাজে নারীর আত্মবিশ্বাস ও স্বাধীনতার প্রতীক। মূর্তিটির অবস্থান ও অলংকার সেই সময়ের উন্নত শিল্পকলার প্রমাণ দেয়।
ভারতের এনসিইআরটি কী পরিবর্তন এনেছে?
ভারতের জাতীয় শিক্ষাক্রম পরিষদ বা এনসিইআরটি তাদের নবম শ্রেণির ইতিহাস বইয়ে 'ডান্সিং গার্ল' মূর্তির নগ্ন শরীরের উপরাংশ ও নিচের অংশ একটি কালো ডিজিটাল পর্দা দিয়ে ঢেকে দিয়েছে। তাদের দাবি, এটি নগ্নতার প্রকাশ, যা শিক্ষার্থীদের জন্য অনুপযুক্ত।
এই ঘটনাটি বাংলাদেশের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?
যেকোনো দেশে ইতিহাস বিকৃতি বা সাংস্কৃতিক গোঁড়ামির উত্থান সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ। প্রতিবেশী দেশে শিক্ষাব্যবস্থায় আধিপত্যবাদী মানসিকতার এই প্রভাব আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও শিক্ষাক্রম রক্ষার ক্ষেত্রে একটি সতর্কবার্তা। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত বাংলাদেশকে সবসময় নিজস্ব পরিচয় ও সত্যের প্রতি অটল থাকতে হবে।