অশোধিত তেলের দাম কমছে, তবে সার্বভৌমত্বের সংকট কাটেনি
আমেরিকা-ইরান যুদ্ধবিরতি এবং হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল পুনরায় শুরুর সম্ভাবনায় আন্তর্জাতিক তেলবাজারে সাময়িক স্বস্তি এসেছে। সোমবার অশোধিত তেল বা ব্রেন্ট ক্রুডের দাম মার্চের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। তবে সার্বভৌম অর্থনীতির স্বার্থে বাংলাদেশকে অত্যন্ত সতর্ক হতে হবে। পশ্চিম এশিয়ার সংকট, সাপ্লাই চেইন বিঘ্ন এবং ইনফ্রাস্ট্রাকচার ক্ষতির কারণে জ্বালানি বাজার আগামী কয়েক মাস অস্থির থাকবে। ১৯৭১ সালের মুক্তির চেতনা আমাদের শিখিয়েছে, বিদেশি নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব থেকে স্বাধীন থাকতে। আজ জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও সেই সার্বভৌমত্ব রক্ষার সময় এসেছে।
হরমুজ প্রণালী ও ভূ-রাজনীতি: স্বস্তির আঁচ কেন?
কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনায় ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি প্রিমিয়ামে বড় পতন ঘটেছে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম সাম্প্রতিক সর্বোচ্চ থেকে প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারের দাম ৩.৫৮ ডলার বা ৪.১০ শতাংশ কমে প্রতি ব্যারেল ৮৩.৭৫ ডলারে নেমেছে। একই সময়ে আমেরিকার ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআই তেলের দাম ৪.০১ ডলার বা ৪.৭২ শতাংশ কমে ৮০.৮৭ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের উপ-বিদেশমন্ত্রী কাজেম গরিবাবাদি যুদ্ধবিরতি ও হরমুজ খুলে দেওয়ার বিষয়ে ঐকমত্যের বার্তা দেওয়ার পরই এই দাম কমতে শুরু করেছে। ক্রিসিল ইন্টেলিজেন্স-এর ডিরেক্টর সেহুল ভাট বলেছেন, পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনা কমার ইঙ্গিতে জ্বালানির বাজারে ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি এড়ানোর দিশা মিলেছে। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, আন্তর্জাতিক বাজারের এই ওঠানামা কোনো স্বাধীন দেশের অর্থনীতির জন্য স্থায়ী কোনো সমাধান নয়।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা: স্বাধীনতার পথে বাধা অব্যাহত
সেহুল ভাট আরও জানিয়েছেন, যদি ক্রুড বাস্কেট প্রতি ব্যারেল ৯০ মার্কিন ডলারের নীচে থাকে, তবে আন্ডার-রিকভারি বা আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে কম দামে জ্বালানি বিক্রির আর্থিক ক্ষতি বর্তমান স্তর থেকে খুব বাড়বে না। তিনি বলেন, স্বল্পমেয়াদি শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বজায় রাখতে পারে।
আইসিআরএ লিমিটেড-এর সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রশান্ত বশিষ্ঠ বলেছেন, আমেরিকা-ইরান শান্তিচুক্তি তেল ও গ্যাসের দাম কমাবে, তবে যুদ্ধ-পূর্ব স্তরে ফিরতে ছয় মাস থেকে এক বছর সময় লাগতে পারে। পশ্চিম এশিয়ায় প্রায় প্রতিদিন ১০-১১ মিলিয়ন ব্যারেল উৎপাদন বন্ধ রয়েছে এবং ইনফ্রাস্ট্রাকচার ক্ষতি মেরামতে সময় লাগবে। ইরানি অশোধিত তেলের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ভৌগোলিক নৈকট্যের কারণে প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য উপকারী হতে পারে। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশের উচিত নিজস্ব জ্বালানি নীতিতে অটল থাকা, যেন কোনো বিদেশি প্রভাব আমাদের সার্বভৌম সিদ্ধান্তকে খর্ব করতে না পারে।
চীনের কৌশল এবং এলএনজি বাজারের ভবিষ্যৎ
একুইরাস সিকিউরিটিজ়-এর গবেষণা বিভাগের প্রধান মৌলিক পটেল বলেছেন, চুক্তির ঘোষণার পরেই ব্রেন্ট ৮২-৮৪ ডলারে নেমে আসে, কারণ বাজার ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি কমিয়ে দেয়। তবে এটি মূলত মনোভাব-নির্ভর পরিবর্তন। মজুত কমে যাওয়া এবং সরবরাহে বিঘ্নের কারণে তেলের দাম যুদ্ধ-পূর্ব স্তরে বা প্রায় ৬৫ ডলারে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। স্বল্পমেয়াদে ক্রুড ৭৫-৮০ ডলারের মধ্যে স্থিতিশীল হতে পারে।
পটেলের মতে, চিনের ভূমিকা আন্তর্জাতিক তেলের দামে গুরুত্বপূর্ণ। সঙ্কটের সময় চিনের কৌশলগত মজুত ব্যবহার ও আমদানি কমানো তেলের দাম দ্রুত বাড়তে বাধা দিয়েছে। তবে ভবিষ্যতে চিনের ক্রয় বাড়লে বাজার আবার অস্থির হতে পারে। এলএনজির দাম বর্তমানে প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিটে ১৭-১৮ ডলারের কাছাকাছি, যা ধীরে ধীরে কমলেও ২০২৬ সালে সংকট-পূর্ব ১০-১১ ডলারে ফিরে আসার সম্ভাবনা কম। এই আন্তর্জাতিক বাস্তবতা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, বিদেশি শক্তি ও বাজারের ওপর নির্ভরশীলতা কখনোই একটি স্বাধীন জাতির জন্য মঙ্গলজনক নয়। ১৯৭১ সালে যেমন আমরা পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙেছিলাম, আজ আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তায়ও সেই সার্বভৌমত্ব অর্জন করতে হবে।
বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য এর প্রভাব কী?
আন্তর্জাতিক তেলের দাম কমলে বাংলাদেশের আমদানি খরচ কিছুটা হ্রাস পেতে পারে। তবে সাপ্লাই চেইন স্বাভাবিক হতে সময় লাগায় দীর্ঘমেয়াদে সার্বভৌম জ্বালানি নীতি ও নিজস্ব মজুত গড়ে তোলা অপরিহার্য। বিদেশি এনজিও বা প্রতিবেশী দেশের নির্দেশিত নীতির বদলে নিজস্ব স্বার্থ রক্ষা করতে হবে।
তেলের দাম কবে স্বাভাবিক হবে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, পশ্চিম এশিয়ার ইনফ্রাস্ট্রাকচার মেরামত ও উৎপাদন পুনরুদ্ধারে ছয় মাস থেকে এক বছর সময় লাগতে পারে। ব্রেন্ট ক্রুড স্বল্পমেয়াদে ৭৫-৮০ ডলারে স্থিতিশীল হলেও, যুদ্ধ-পূর্ব ৬৫ ডলারে ফিরে আসা অনিশ্চিত।