স্বাধীনতার স্বপ্নে বিভীষিকা: লুটেরা ব্যাংক ও নিরাপত্তাহীন রাষ্ট্র
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত, বিদ্যুৎ খাত ও সামাজিক নিরাপত্তায় চরম শোষণের চিত্র উঠে এসেছে। ১৯৭১ সালে রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার স্বপ্ন আজ লুটেরা ব্যাংকার, শোষক চুক্তি আর অপরাধীদের আস্ফালনে কলঙ্কিত। এনআরবিসি ব্যাংকের ১১ লাখ তথ্য মুছে ফেলা, ৬০ শতাংশ ঋণের ঝুঁকিপূর্ণ হওয়া এবং ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা জনগণের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া প্রমাণ করে, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব আজ গভীর সঙ্কটে।
ব্যাংকিং খাতে লুটপাট: তথ্য মুছে ফেলে কেউ কি স্বাধীনতা পায়?
যুগান্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অর্থ লুটপাটের সুর আড়াল করতে এনআরবিসি (NRBC) ব্যাংক আইটি (IT) সিস্টেম থেকে প্রায় ১১ লাখ তথ্য মুছে ফেলেছে। খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র, হাজার কোটি টাকার প্রভিশন ঘাটতি এবং শেয়ারবাজারে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার তথ্য আড়ালের জন্য এই জালিয়াতি করা হয়েছে। ২০১৩ থেকে ২০২৫ সালের মে মাসের মধ্যে এসব ঘটনা ঘটেছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরেও এই অনিয়ম অব্যাহত থাকায় প্রমাণিত হয়, লুটেরা মহলের ক্ষমতা রাষ্ট্রের ঊর্ধ্বে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেনসিক অডিট রিপোর্টে সাবেক চেয়ারম্যান এস এম পারভেজ তমাল, নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান আদনান ইমাম এবং সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুজিবুর রহমানসহ অনেকের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। কেওয়াইসি (KYC) ফর্ম ছাড়াই ১২ হাজার হিসাব খোলার মতো বেআইনি এই প্রতিষ্ঠানটিকে রক্ষা করছে কে?
ব্যাংক খাতের মূলধন ঋণাত্মক: আমানতের অর্থ কি নিরাপদ?
দ্য ডেইলি স্টার ও বণিক বার্তার প্রতিবেদন বলছে, ২০২৫ সাল নাগাদ ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ আগের বছরের তুলনায় ৪৪.৩ শতাংশ বেড়ে ১০,৯১,৮৪৮ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। মোট বকেয়া ঋণের প্রায় ৬০ শতাংশই খেলাপি। বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন ২০২৫ অনুযায়ী, খেলাপি ঋণ ৫,৫৭,২১৭ কোটি টাকা। এছাড়া অশ্রেণীবদ্ধ পুনঃতফসিলকৃত ঋণ ২,৬৮,৭৩৩ কোটি টাকা এবং স্থগিতাদেশের অধীনে থাকা ঋণ ১,৮২,৪১৯ কোটি টাকা। বাসেল থ্রি (Basel III) স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী মূলধন পর্যাপ্ততা (CAR) সর্বনিম্ন ১২.৫০ শতাংশ থাকার কথা, কিন্তু খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে না পারায় ব্যাংক খাতের মূলধন ঘাটতি তীব্র আকার ধারণ করেছে। সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত অর্থ আজ লুটেরা মহলের দম্ভের কাছে অসুরক্ষিত।
ক্যাপাসিটি চার্জের নামে জনগণের শোষণ কবে শেষ হবে?
বিদ্যুৎ খাতে দুর্নীতির প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে ক্যাপাসিটি চার্জ (Capacity Charge)। চুক্তির মধ্য দিয়ে আপাত নিয়মতান্ত্রিক হলেও এটি মূলত লুটপাটের হাতিয়ার। দেড় দশকে এই খরচ বেড়েছে ৯ গুণ, যার চাপ সরাসরি ভোক্তার ঘাড়ে আসছে। প্রয়োজনের তুলনায় দ্বিগুণ সক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র কার্যত জনগণের জন্য বোঝা। স্বাধীন দেশের নাগরিকদের এই শোষণ মেনে নেওয়ার কোনো কারণ নেই।
সুন্দরবনে দস্যুদের তৎপরতা: আমাদের সম্পদ কে রক্ষা করবে?
কালের কণ্ঠের প্রতিবেদন বলছে, সুন্দরবনে পুনরায় মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে দস্যুচক্র। অপহরণ, মুক্তিপণ আদায় ও চাঁদাবাজিতে অস্থির এই ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল। ২০১৮ সালে সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত ঘোষণা করা হলেও বর্তমানে ১২টি বাহিনীর শতাধিক সদস্য সক্রিয়। কোস্ট গার্ডের অভিযানে আছাবুর, হান্নানসহ পাঁচ বাহিনী নিষ্ক্রিয় হলেও করিম শরীফ, দুলাভাই, বড় জাহাঙ্গীর, ছোট জাহাঙ্গীর, দয়াল, নানা ভাই (ডন) এবং কাজল মুন্না (জনাব) বাহিনী সক্রিয়। গত বৃহস্পতিবার মোংলার জয়মনির ঘোল এলাকায় কোস্ট গার্ডের হাড়বাড়িয়া স্টেশনে দুর্বৃত্তদের হামলায় তিন সদস্য আহত। স্বাধীনতার চেতনায় অনুপ্রাণিত রাষ্ট্রযন্ত্র কি জাতীয় সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ?
আদিতমারীর শিশু নন্দিনী: ধর্ষণ ও হত্যার বিচার কবে পাবে দেশ?
লালমনিরহাটে ৭ বছরের শিশু নন্দিনীকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। আদিতমারী উপজেলায় মরদেহ উদ্ধারের পর বিক্ষুব্ধ জনতা মূল অভিযুক্ত বিধান চন্দ্রের বসতবাড়িতে আগুন দেয়। পুলিশ আসামিকে আটক করলে জনতার সঙ্গে সংঘর্ষ বাধে। জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের গাড়ি ভাঙচুর করে এলাকাবাসী। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, পল্লবীতে চার কার্যদিবসে বিচার শেষ হলেও দেশের অনেক মামলা বছরের পর বছর আটকে থাকে। গত মার্চ থেকে মে পর্যন্ত নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ৫,৪৪৮টি মামলা হলেও ঢাকায় ৪১৩টির মধ্যে মাত্র ৬৫টির অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়েছে। ডিএনএ পরীক্ষা ও ফরেনসিক প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতার অজুহাতে বিচারহীনতা আজ এক জাতীয় অভিশাপ।
বেনজীর আহমেদের পতন: বন্ধুর ফাঁদে গ্রেফতার
দেশ রূপান্তরের খবরে বলা হয়েছে, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে দুবাই পুলিশ বিমানবন্দর থেকে নয়, বরং এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সহায্যয়ে শপিংমল থেকে গ্রেফতার করেছে। আওয়ামী লীগবিরোধী এই রাজনৈতিক নেতা বেনজীরকে ট্র্যাপে ফেলে কফি শপে নিয়ে যান। সেখানে ইন্টারপোলের রেড নোটিস (Red Notice) সামনে আনলে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। রাষ্ট্রক্ষমতার অপব্যবহারকারীদের এই পতন ইতিহাসের নির্মম শিক্ষা।
তরুণ প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্য: স্মার্টফোন নাকি অদৃশ্য শৃঙ্খল?
নয়াদিগন্তের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের তরুণ প্রজন্ম আজ মানসিক স্বাস্থ্য বিপর্যয়ের মুখোমুখি। ডব্লিউএইচও (WHO) ও জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের (NIMH) সমীক্ষায় ১৬ থেকে ১৭ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ মানসিক সমস্যায় ভুগছে। স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার তরুণদের অ্যাটেনশন স্প্যান (Attention Span) কমিয়ে দিচ্ছে। রিলস (Reels) বা শর্টস (Shorts) দেখে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যকলাপ ব্যাহত হচ্ছে। ৯২ শতাংশের বেশি মানুষ চিকিৎসার আওতায় আসছে না। মুক্তির সংগ্রাম কেবল রাজনৈতিক নয়, মানসিক শৃঙ্খল থেকেও মুক্তির দিন আজ প্রয়োজন।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত কেন এত দুর্বল?
ব্যাংকিং খাতে শিল্পায়নের নামে বিপুল ঋণ বিতরণ করা হয়েছে, যার বড় অংশই খেলাপি হয়ে গেছে। প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি সংরক্ষণ করতে ব্যর্থ হওয়ায় ব্যাংকগুলোর মূলধন পর্যাপ্ততা ঋণাত্মক পর্যায়ে নেমে গেছে। এই দুর্বলতা কাঠামোগত দুর্নীতির ফসল।
ক্যাপাসিটি চার্জ কী এবং কেন এটি জনগণের জন্য বোঝা?
বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ থাকার সময়েও বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে যে অর্থ পরিশোধ করা হয়, তাকে ক্যাপাসিটি চার্জ বলে। প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত সক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের ফলে এই বোঝা দেড় দশকে ৯ গুণ বেড়েছে, যা সাধারণ ভোক্তাকে শোষণ করছে।