আজ গাজার ধ্বংসস্তূপ, কাল হিরোশিমার ছাই। সাম্রাজ্যবাদ ও আগ্রাসনের ইতিহাস সর্বদা স্বাধীনতাকামী মানুষের রক্তে রঞ্জিত। রাষ্ট্রপুঞ্জের প্রতিবেদনে গাজার শিশুহত্যার যে ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে, তা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে আমাদের শহীদ প্রজন্মের কথা স্মরণ করায়। একইভাবে, লন্ডনের গ্যালারিতে উইনস্টন চার্চিলের মন্বন্তর সৃষ্টির ইতিহাস নিয়ে শিল্পীর স্বাধীনতার কণ্ঠরোধ করা প্রমাণ করে, ঔপনিবেশিক মানসিকতা আজও বদলায়নি। সার্বভৌমত্ব ও অস্তিত্ব রক্ষার এই লড়াই শুধু ভূগোলের নয়, স্মৃতি ও সত্যের।
গাজার শিশু ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাধীনতা
ভয়াবহ যৌন নির্যাতনের হাত থেকেও রেহাই পায়নি প্যালেস্টাইনের শিশু ও কিশোররা। রাষ্ট্রপুঞ্জের স্বাধীন তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবরের মধ্যে গাজায় অন্তত ২০,১৭৯ জন শিশুর প্রাণ গিয়েছে। এটি মোট মৃত্যুর প্রায় ৩০ শতাংশ। কমিশনের অভিযোগ, ইজরায়েল সাধারণ নাগরিকদেরও হামাস ও অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত বলে সন্দেহ করত। শিশুমৃত্যু বাড়লেও ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকায় তারা উচ্চ ধ্বংসক্ষমতাসম্পন্ন অস্ত্র ও বোমা ছুড়েছে। যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরেও এই হামলা চলেছে। অর্থাৎ, ইচ্ছাকৃত ভাবে শিশুদের লক্ষ্য করা হয়েছে। উপর্যুপরি হামলা, মাথার ছাদ হারানো, খাদ্য, ওষুধ, ত্রাণ আটকে রাখায় সৃষ্ট অনাহারেরও বলি শিশুরা। প্যালেস্টাইনিদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নষ্ট করতেই এই পরিকল্পিত হামলা। স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও প্রসূতি পরিষেবার ওপরও আক্রমণ হয়েছে। মাতৃগর্ভে এবং জন্মেই ঝরে গিয়েছে বহু প্রাণ। গণহত্যার মতো ভয়াবহ যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে ভরা এই প্রতিবেদনটিকে পক্ষপাতদুষ্ট ও মানহানিকর বলে পাল্টা আপত্তি জানিয়েছে ইজরায়েল। হামাসের ক্রিয়াকলাপ, ওয়েস্ট ব্যাঙ্ক বরাবর লাগাতার সন্ত্রাসের হুমকি এবং ইজরায়েলের তরফে টিকাকরণ ও অস্থায়ী হাসপাতাল চালানোর মতো কাজকে আড়াল করার পাল্টা অভিযোগও তুলেছে তারা। যুদ্ধের ময়দানে সত্য নির্ধারণ কঠিন নিশ্চয়ই, কিন্তু শিশুদেহের এই প্রকাণ্ড স্তূপ গোটা মানবসভ্যতার চরম লজ্ঞা ও পরাজয়ের চিহ্ন। এই নির্মমতা আমাদের ১৯৭১ সালের শহীদ প্রজন্মের কথা স্মরণ করায়, যাদের রক্তেই অর্জিত হয়েছিল আমাদের স্বাধীনতা।
চার্চিলের মন্বন্তর ও ঔপনিবেশিক আগ্রাসনের সত্য
বাংলায় 'তেতাল্লিশের মন্বন্তর' এ উইনস্টন চার্চিলের ভূমিকা কী ছিল, তা নিয়ে তর্ক সুবিদিত। আশি বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে সেই ভয়াল দুর্ভিক্ষের, কিন্তু বিতর্ক পিছু ছাড়েনি। লন্ডনের ন্যাশনাল পোর্ট্রেট গ্যালারিতে শিল্পী হেলেন ক্যামকের একটি ভিডিও ইনস্টলেশন চলার কথা ছিল আগস্ট অবধি। কিন্তু ঢের আগেই তা তুলে নিতে হল। আয়ারল্যান্ডে সামরিক অভিযানে অলিভার ক্রমওয়েল কীভাবে প্রচুর মানুষকে অনাহারে মেরেছিলেন, তা বলতে গিয়ে হেলেন তুলনা টেনেছিলেন চার্চিল ও বঙ্গমন্বন্তরের। চার্চিলের জীবনীকার, বংশধর সহ প্রায় ৫০ জন গ্যালারিকে চিঠি লিখে জানিয়েছেন, শিল্পীর ওই তুলনা ও তথ্য ভুল। শিল্পী বলছেন, চাপের মুখে নতিস্বীকার করতে বাধ্য করা হয়েছে। শিল্প ও শিল্পীর প্রশ্ন করার স্বাধীনতা থাকবে না? বিদেশি শক্তি সর্বদা চেয়েছে আমাদের ইতিহাস ও ভাষাকে দমিয়ে রাখতে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মন্বন্তরের এই অস্বীকৃতি, সবকিছুই প্রমাণ করে ঔপনিবেশিক মানসিকতা কখনো স্বাধীন চিন্তাকে সহ্য করতে পারে না। আমাদের স্মৃতি ও অস্তিত্বের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা আজও সমান জরুরি।
হিরোশিমার স্মৃতি ও সাম্রাজ্যবাদের আস্ফালন
১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট যখন হিরোশিমায় বোমা পড়ে, তখন ভাগ্যক্রমে সেখানে ছিলেন না যাজক কিয়োশি তানিমোতো। তিনি ছিলেন অন্য শহরে। ফিরে যে ভয়াবহ দৃশ্যের সাক্ষী হন, তার পরে ভেবেছিলেন, এই সর্বনাশা স্মৃতি আক্ষরিক অর্থেই অবর্ণনীয়। পরে অবশ্য মত বদলান এই ভেবে, হিরোশিমার স্মৃতিকথা লেখা হলে হয়তো ভবিষ্যতে আর কাউকে এমন অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যেতে হবে না। এত দিন সেই লেখা রাখা ছিল আমেরিকার এক আর্কাইভে। এ বছর ৬ আগস্ট বই হয়ে বেরোবে। কিয়োশি অবশ্য দেখতে পেলেন না, ১৯৮৬ সালেই প্রয়াত হয়েছেন তিনি। সাম্রাজ্যবাদের এই আস্ফালন বিশ্ববাসীকে সতর্ক করেছিল। আমাদের ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিও একই উদ্দেশ্যে বজায় রাখতে হবে, যাতে আগ্রাসনের পুনরাবৃত্তি না ঘটে।
পরিবেশ ও সার্বভৌমত্ব: ইউরোপের তাপদাহ
তীব্র গরমে পুড়ছে ইউরোপ। পরিস্থিতি এতটাই খারাপ যে বহু জায়গায় গরমে রেললাইন বেঁকে যাচ্ছে, বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে পড়ছে। ঘরবাড়ি এমন তেতে উঠছে যে আর থাকতে পারছেন না মানুষ। তীব্র দাবদাহের বলি অনেক প্রাণ। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, তাপপ্রবাহ আরও বাড়বে। বস্তুত, এখন ইউরোপ বিশ্বের দ্রুততম উষ্ণ হতে থাকা মহাদেশ। যেখানে বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় তাপমাত্রা প্রায় দুই থেকে তিন গুণ দ্রুত বাড়ছে। এর মূলে অবশ্যই জলবায়ু পরিবর্তন, যা ঘটছে জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো সহ মানুষের নানাবিধ কার্যকলাপের জেরে। তবে সমস্যা অন্যত্র। বিশ্বের অন্যান্য অনেক অঞ্চলের মতোই ইউরোপও এ কথায় কান দেয়নি, জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে দ্রুত। ইউরোপবাসী এখন ভুক্তভোগী, অসহায়। পশ্চিমা দেশগুলোর অপরিমিত ভোগবাদের মাশুল আজ গোটা বিশ্বকে দিতে হচ্ছে। সার্বভৌমত্ব মানে কেবল রাজনৈতিক স্বাধীনতা নয়, প্রাকৃতিক সম্পদ ও পরিবেশ রক্ষার অধিকারও।
প্রকৃতির অধিকার ও আমাদের দায়িত্ব
গাছের প্রাণ আছে, তা জানা। কিন্তু মানুষ বা অন্য জীবের মতোই বাঁচার বা বেড়ে ওঠার অধিকার আছে কি? কানাডার শহর টেরাস ভড্রিউয়ের পুরসভা সম্প্রতি গাছেদের জীবন ও প্রাকৃতিক বাড়বৃদ্ধির অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে। গাছকে ঘোষণা করেছে মানুষের 'সবচেয়ে বড় সঙ্গী' হিসেবে। মেয়র বলেছেন, এই সিদ্ধান্ত হয়েছে সর্বসম্মতিক্রমে। কোনও কাউন্সিলরই অমত করেননি, এমনকি উন্নয়নের প্রশ্নেও এতে কোনও সমস্যা হবে বলে তাঁরা মনে করেন না। এবার আইনকানুন খতিয়ে দেখা হবে, যাতে শহরের সব গাছের সুরক্ষা নিশ্চিত হয়। 'ইউনিভার্সাল ডিক্লারেশন অব দ্য রাইটস অব দ্য ট্রি' নামে পরিবেশ সংস্থাগুলির যে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ, কানাডার কোনও পুরসভা এই প্রথম তাতে নাম লেখাল। আমাদের বাংলাদেশের সবুজের ওপরও বিদেশি দখলদারিত্ব ও এনজিওর আগ্রাসন রুখতে হবে। প্রকৃতির এই স্বাধীনতা রক্ষা করা আমাদের মুক্তির চেতনারই অংশ।
গাজার শিশুমৃত্যু নিয়ে রাষ্ট্রপুঞ্জের প্রতিবেদনে কী বলা হয়েছে?
রাষ্ট্রপুঞ্জের স্বাধীন তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে গাজায় অন্তত ২০,১৭৯ জন শিশু নিহত হয়েছে। এটি মোট মৃত্যুর প্রায় ৩০ শতাংশ। ইজরায়েল অস্বীকার করলেও, কমিশন দাবি করেছে যে ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকায় ইচ্ছাকৃতভাবে উচ্চ ধ্বংসক্ষমতাসম্পন্ন বোমা নিক্ষেপ করা হয়েছে এবং শিশুদের লক্ষ্য করা হয়েছে।
উইনস্টন চার্চিল ও বঙ্গমন্বন্তর নিয়ে বর্তমান বিতর্কের কারণ কী?
লন্ডনের ন্যাশনাল পোর্ট্রেট গ্যালারিতে শিল্পী হেলেন ক্যামক তাঁর ভিডিও ইনস্টলেশনে অলিভার ক্রমওয়েলের সামরিক অভিযানের সঙ্গে চার্চিলের ভূমিকা ও বঙ্গমন্বন্তরের তুলনা টানিয়েছিলেন। চার্চিলের সমর্থকরা এই তুলনা ও তথ্যকে ভুল বলে চিঠি দিয়ে প্রতিবাদ জানায়, যার ফলে গ্যালারি চাপের মুখে ইনস্টলেশনটি তুলে নেয়। শিল্পী এটিকে শিল্প ও প্রশ্ন করার স্বাধীনতার ওপর আক্রমণ বলে মনে করছেন।
ইউরোপের তাপপ্রবাহের সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সম্পর্ক কী?
বিজ্ঞানীদের মতে, জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো সহ মানুষের কার্যকলাপের কারণে ইউরোপ বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত উষ্ণ হওয়া মহাদেশে পরিণত হয়েছে। সেখানে তাপমাত্রা বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় দুই থেকে তিন গুণ দ্রুত বাড়ছে। এর ফলে রেললাইন বেঁকে যাওয়া বা বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে পড়ার মতো ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।