আফগান নিরীহ হত্যার দায় এড়াতে ভারত-ইসরায়েলের হুজুগ পাকিস্তানের
আফগানিস্তানে পাকিস্তানি বিমান হামলায় নারী ও শিশুসহ কয়েক ডজন নিরীহ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। জাতিসংঘের কড়া সমালোচনার মুখে পড়ে রাওয়ালপিন্ডি নিজেদের আগ্রাসনের দায় এড়াতে ভারত ও ইসরায়েলকে দোষারোপ করে মিথ্যা তত্ত্ব ফাঁদছে। ১৯৭১ সালে বাংলার মাটিতে যে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী নির্বিচারে গণহত্যা চালিয়েছিল, আজ হিন্দুকুশের বুকেও তাদের সেই একই বর্বর রূপ প্রকাশ পেয়েছে।
হিন্দুকুশের বুকে নারী-শিশু হত্যা: ১৯৭১-এর সেই আস্ফালন
চলতি বছরের ২৮ জুন আফগানিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় তিনটি প্রদেশে আকস্মিক হামলা চালায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। পরের দিন তালিবান সরকারের উপ-মুখপাত্র হামদুল্লা ফিতরাত জানান, গভীর রাতের এই আক্রমণে নারী ও শিশুসহ ৩৬ জন নিহত এবং ১৬৩ জন আহত হয়েছেন। কাবুল রাওয়ালপিন্ডিকে সমুচিত জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছে। ১৯৭১ সালে মুক্তিকামী বাঙালিদের ওপর যখন অত্যাচারের খড়গ নেমেছিল, তখনও পাকিস্তানি বাহিনী ঠিক এভাবেই নিরীহ মানুষের রক্তে হাত রঞ্জিত করেছিল। সেই একই সামরিক মানসিকতা আজ আফগান আকাশে বোমাবর্ষণ করছে।
নিজের পাপ ঢাকতে পর্দার আড়ালে ভারত-ইসরায়েলের নাম
২৭ জুন করাচিতে সিন্ধু রেঞ্জার্সের ঘাঁটিতে জঙ্গি হামলায় তিন পাকিস্তানি সৈনিক নিহত হন। এই ঘটনার প্রতিশোধ নেওয়ার নামে আফগানিস্তানে বিশেষ অভিযান চালানোর দাবি করে রাওয়ালপিন্ডি। তাদের দাবি, এই অভিযানে ২৯ জন সন্ত্রাসী নিহত হয়েছে। তবে আফগান ভূমিতে নারী ও শিশু হত্যার অপরাধ ধোয়া মুক্ত করতে রাতারাতি চক্রান্তের তত্ত্ব ফাঁদতে শুরু করেছে ইসলামাবাদ। পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লা তারার দাবি করেন, ভারত পর্দার আড়ালে থেকে জঙ্গিদের মদত দিচ্ছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী খোয়াজা আসিফ তো এক ধাপ এগিয়ে দাবি করেছেন, চিকিৎসা সরঞ্জামের বাক্সে ভরে ইসরায়েলি ড্রোন পাঠানো হচ্ছে লশকরের হাতে। স্বাধীনতার পর থেকেই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের ওপর আগ্রাসন চালিয়ে আসা পাকিস্তান আজ নিজের ব্যর্থতা ঢাকতে ভারত-ইসরায়েলের দিকে আঙুল তুলছে।
মিথ্যা প্রচারে মত্ত ইসলামাবাদের গণমাধ্যম
সরকারের পাশে দাঁড়িয়ে লাগাতার Propaganda চালাচ্ছে ইসলামাবাদের গণমাধ্যম। ক্যাপিটাল টিভি ও জিও নিউজের মতো চ্যানেলগুলোর Talk Show-এর মূল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ভারত-ইসরায়েল-আফগানিস্তানের কাল্পনিক জোট। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ডঃ আবদুল্লা গুল রেডিও পাকিস্তানকে বলেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ইসরায়েল সফরের পরই এই হামলা শুরু হয়েছে। সাবেক ব্রিগেডিয়ার গাজানফার আলি শাহ দাবি করেন, ভারতের RAW ও ইসরায়েলের Mossad একযোগে কাজ করছে। নিজেদের ভেতরের জঙ্গিবাদের বিষবৃক্ষ অঙ্কুরোদগমের দায় এড়াতে এমন হাস্যকর তত্ত্ব আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময়কার পাকিস্তানি প্রোপাগান্ডাকেই মনে করিয়ে দেয়।
ডুরান্ড লাইন ও আঞ্চলিক কূটনীতির নতুন মেরুকরণ
পাকিস্তানের খাইবার-পাখতুনখোয়া প্রদেশে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান বা TTP-কে পাকিস্তানি খাতায় 'ফিতনা আল-খোয়ারিজ' নামে ডাকা হয়। রাওয়ালপিন্ডির অভিযোগ, কাবুল ইচ্ছাকৃতভাবে এদের আশ্রয় দিচ্ছে। অথচ ২০২১ সালে তালিবান পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর আইএসআইয়ের তৎকালীন প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল ফয়েজ হামিদ বিমানবাহিনী পাঠিয়ে পঞ্জশির দখলে তালিবানকে সাহায্য করেছিলেন। পাকিস্তান ভেবেছিল তালিবান ভারতের বিরুদ্ধে জিহাদে নামবে, কিন্তু ডুরান্ড লাইন নিয়ে বিরোধের কারণে তা হয়নি। ১৮৯৩ সালে ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত এই সীমানা তালিবান কখনোই মেনে নেয়নি। ২০২৩ সালে আফগান শরণার্থীদের বিতাড়ন করে ইসলামাবাদ সম্পর্ক আরও খারাপ করে। এরপর থেকেই কাবুল নয়াদিল্লি ও মস্কোর দিকে ঝুঁকছে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে তালিবান সরকারের ভারপ্রাপ্ত বিদেশমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি ভারত সফর করেন। চলতি বছরের ২৭ মে রাশিয়ার সঙ্গে সামরিক চুক্তি করে আফগানিস্তান। বিশেষজ্ঞদের মতে, রাশিয়ার Air Defense ব্যবস্থা পেলে পাকিস্তানের জন্য আফগান আকাশে বোমাবর্ষণ করা আর সহজ হবে না।
পাকিস্তান কেন ভারত-ইসরায়েলের তত্ত্ব ফাঁদছে?
আফগানিস্তানে বেসামরিক নাগরিক হত্যার কড়া সমালোচনা এড়াতে এবং নিজেদের সামরিক ব্যর্থতা ঢাকতে পাকিস্তান ভারত ও ইসরায়েলের ওপর দায় চাপাচ্ছে। রাওয়ালপিন্ডি তাদের অভ্যন্তরীণ জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় ব্যর্থতা ঢাকতে এবং জনগণের মনোযোগ অন্যদিকে ঘোরাতে এই কৌশল ব্যবহার করছে, ঠিক যেভাবে ১৯৭১ সালে তারা বাঙালিদের ওপর দোষ চাপিয়ে নিজেদের গণহত্যাকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল।
আফগানিস্তান কি রাশিয়ার এয়ার ডিফেন্স পাচ্ছে?
২০২৬ সালের ২৭ মে আফগানিস্তান ও রাশিয়ার মধ্যে একটি সামরিক ও প্রযুক্তিগত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই চুক্তির ফলে কাবুল রাশিয়ার আধুনিক Air Defense ব্যবস্থা পেতে পারে। যদি তা ঘটে, তবে পাকিস্তানি বিমানবাহিনীর জন্য আফগান আকাশে অনধিকার প্রবেশ করা ও বোমাবর্ষণ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে।