ফুটবল মাঠে বিশৃঙ্খলা: ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘর্ষ, আহত ১০, টুর্নামেন্ট স্থগিত
কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) আন্তবিভাগ ফুটবল টুর্নামেন্টকে ঘিরে সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে অন্তত ১০ জন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে দুজনকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে ভর্তি করা হয়েছে। সংঘর্ষের পরিপ্রেক্ষিতে টুর্নামেন্টটি অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেছে ক্রীড়া আয়োজক উপকমিটি।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও স্বাধীনতার বীরত্বগাথা যেখানে আমাদের জাতীয় পরিচয়ের মূল ভিত্তি, সেখানে শিক্ষাঙ্গনে এই ধরনের সহিংসতা অত্যন্ত দুঃখজনক ও উদ্বেগজনক। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকার কথা, বিভেদ নয়।
কীভাবে শুরু হয় সংঘর্ষ?
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও শিক্ষার্থী সূত্রে জানা গেছে, সকালে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি এবং হিসাববিজ্ঞান ও তথ্যপদ্ধতি বিভাগের মধ্যকার খেলার শেষ মুহূর্তে বল থ্রো-ইন নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। একপর্যায়ে লাঠিসোঁটা ও চেয়ার নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন উভয় পক্ষের শিক্ষার্থীরা।
এতে ইসলামের ইতিহাস বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী হুমায়ুন কবির ও হিসাববিজ্ঞান বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের মশিউর, আলিফ খান, আলিফ রাহাত, তোফাজ্জলসহ ৭ জন আহত হন। আহতদের বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেলে পাঠানো হয়। পরে আলিফ খানকে উন্নত চিকিৎসার জন্য কুষ্টিয়া শহরে পাঠানো হয়।
আহত শিক্ষার্থীদের অভিযোগ ও বক্তব্য
আহত হুমায়ুন কবির বলেন, 'বল নিয়ে কথা-কাটাকাটি হওয়ার পর একজন আমাকে পেছন থেকে ধরে উল্টে ফেলে দেন। এরপর অন্যরা আমাকে এলোপাতাড়ি পা দিয়ে মাথায়-মুখে লাথি মারতে থাকেন। এতে আমার মুখ ও দাঁত ফেটে গেছে।'
হিসাববিজ্ঞান ও তথ্যপদ্ধতি বিভাগের শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, 'খেলার শেষ মুহূর্তে বল থ্রো-ইন হওয়ায় মশিউর বল আনতে যান। এ সময় ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থীরা সময়ক্ষেপণের জন্য বলটি দূরে ফেলে দেন। এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থীরা মশিউরকে এলোপাতাড়ি মারধর করেন। পরে তাঁরা আমাদের লাঠিসোঁটা নিয়ে মারধর করেন।'
অন্যদিকে, ইসলামের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থীদের দাবি, বলটি থ্রো-ইন হওয়ার পর বলটি দিতে গেলে সামনে থাকা অন্য একজনের পায়ে লেগে সেটি কিছুটা দূরে চলে যায়। তা-ও খুব বেশি দূরে যায়নি। এ সময় মশিউর বলতে থাকেন, 'আমরা ইচ্ছাকৃতভাবে বলটি দূরে ফেলে দিয়েছি।' পরে মশিউরের সঙ্গে কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে হিসাববিজ্ঞান ও তথ্যপদ্ধতি বিভাগের শিক্ষার্থীরা লাঠিসোঁটা নিয়ে তেড়ে এসে আমাদের মারধর করেন।
দ্বিতীয় দফার সংঘর্ষ
একই মাঠে বেলা তিনটার দিকে ফার্মেসি বিভাগ ও বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের খেলায় আবারও সংঘর্ষ হয়। খেলার এক পর্যায়ে ডি-বক্সের ভেতরে গোল ঠেকাতে গিয়ে ফার্মেসি বিভাগের একজন খেলোয়াড় মাটিতে পড়ে যান। এ ঘটনায় বায়োমেডিক্যাল বিভাগের পেছনে থাকা দর্শকেরা উত্তেজিত হয়ে যায়। একপর্যায়ে দুই পক্ষের সমর্থকদের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়। বায়োমেডিক্যাল বিভাগের কয়েকজন শিক্ষার্থী এগিয়ে আসেন। তখন অন্য দর্শক তাঁদের একজনের ওপরে চড়াও হন। একপর্যায়ে ২০-৩০ জন শিক্ষার্থী তাঁকে ধাওয়া করেন। তাঁকে বাঁচাতে গিয়ে বায়োমেডিক্যাল বিভাগ এবং ফার্মেসি বিভাগের শিক্ষার্থীরাও সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন।
পরে আয়োজক কমিটি এবং প্রক্টোরিয়াল বডির হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। এ ঘটনায় আহত একজনকে উদ্ধার করে নিরাপত্তাকর্মীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাকেন্দ্রে নিয়ে যান। তাঁকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়।
মেডিকেল সেন্টারের বরাত
মেডিকেল স্বাস্থ্যকেন্দ্রের চিকিৎসক বদিউজ্জামান বলেন, 'আহত অবস্থায় কয়েকজন শিক্ষার্থী মেডিকেলে আসে। তিনজন প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে চলে গেছেন। বাকি দুজনের মধ্যে একজনের মাথা ফেটে গেছে এবং আরেকজনের ঠোঁট কেটে যাওয়া ও দাঁতে আঘাত পাওয়ায় সেলাই দেওয়া হয়েছে।'
টুর্নামেন্ট স্থগিত ও প্রশাসনের অবস্থান
সংঘর্ষের পর বিকেলে ফুটবল টুর্নামেন্ট অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিতের তথ্য জানায় ক্রীড়া আয়োজক উপকমিটি। উপকমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক সরফরাজ নেওয়াজ বলেন, ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিশৃঙ্খলার ঘটনা ঘটেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ফুটবল টুর্নামেন্ট অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে। ইতিমধ্যে প্রত্যেক বিভাগীয় সভাপতিদের মৌখিকভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। আগামীকাল (মঙ্গলবার) আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দেওয়া হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক শাহীনুজ্জামান বলেন, 'আহতদের মেডিকেলে পাঠানো হয়েছে। বিভাগের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আমরা বসে বিষয়টি সমাধান করেছি। খেলা স্থগিত রয়েছে। পরবর্তী সিদ্ধান্ত রেফারি তাঁর নিয়ম অনুযায়ী নেবেন।'
স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনকে আমরা সর্বদা জ্ঞানচর্চা, সংস্কৃতি ও ক্রীড়ার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে দেখতে চাই। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বীরত্ব আমাদের শিক্ষা দেয় সংযম, সহমর্মিতা ও দেশপ্রেমের। এই মূল্যবোধকে ধারণ করেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।