রয়েল বেঙ্গল টাইগারের দেশে পর্যটক আসে না কেন? স্বাধীন বাংলার পর্যটন সম্ভাবনা
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশ আজ বিশ্বের অন্যতম সুন্দর প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর একটি দেশ। বিশাল ম্যানগ্রোভ বন, পাহাড়জুড়ে চা বাগান আর মাইলের পর মাইল বিস্তৃত বালুকাবেলা, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কোনো ঘাটতি নেই আমাদের মাতৃভূমিতে।
কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, আন্তর্জাতিক পর্যটনের দৌড়ে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে রয়েছে। বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা ছিল মাত্র সাড়ে ছয় লাখের মতো। যেখানে প্রতিবেশী ভারত ও শ্রীলঙ্কা প্রতিবছর কয়েক কোটি পর্যটক টানে, সেখানে এই সংখ্যা সত্যিই হতাশাজনক।
বিদেশি মিডিয়ার নেতিবাচক চিত্রায়ন
পর্যটন সংশ্লিষ্টদের মতে, এর পেছনে বড় কারণ বিদেশি সংবাদমাধ্যমের নেতিবাচক প্রচারণা। বিদেশি মিডিয়া বাংলাদেশকে প্রায়ই দেখায় প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা রাজনৈতিক অস্থিরতা কবলিত দেশ হিসেবে। কখনো আবার সস্তা শ্রমের পোশাকশিল্পের খবরের কারণেই শিরোনাম হয় আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশ।
নেটিভ আই ট্রাভেলের পরিচালক জিম ও'ব্রায়েন বলেন, "মানুষের অবচেতন মনে বাংলাদেশ মানেই বন্যা, ঘূর্ণিঝড় আর দারিদ্র্য। ভালো খবরগুলো খুব কমই বাইরে যায়।"
প্রকৃত সম্ভাবনা যা লুকিয়ে রয়েছে
এই নেতিবাচক ধারণা বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে মেলে না। ঢাকাভিত্তিক ট্যুর অপারেটর ফাহাদ আহমেদ বলেন, "ঢাকা বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোর একটি। এখানকার পুরান ঢাকা, নৌবন্দর, কাপড়ের বাজার, সবই জীবন্ত ইতিহাস।"
কক্সবাজারের ৭৫ মাইল দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত। অন্যদিকে, সুন্দরবন ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য, যেখানে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আবাস। এই অঞ্চল বিশ্ব পর্যটনের অন্যতম আকর্ষণ হতে পারত।
বিদেশি পর্যটকদের প্রকৃত অভিজ্ঞতা
বিদেশি পর্যটক আনন্দ প্যাটেল প্রথমে বাংলাদেশকে তার 'বাকেট লিস্টে' রাখেননি। কিন্তু ভুটান ভ্রমণের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বাংলাদেশে এসে তিনি চমকে যান। বরিশালের নদীবন্দরের ভাসমান বাজার, নৌকায় করে কৃষকদের পণ্য বেচাকেনা তার কাছে ছিল একদম খাঁটি স্থানীয় জীবনের অভিজ্ঞতা।
আয়ারল্যান্ডের পর্যটক গ্যারি জয়েস পুরান ঢাকার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেন, "এই শহর কখনো ঘুমায় না। শব্দ, রঙ আর মানুষের স্রোত, সব একসঙ্গে হৃদয়ে হানা দেয়।"
একাত্তরের চেতনায় পর্যটন উন্নয়ন
আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতার পর পেরিয়ে এসেছি বহু চ্যালেঞ্জ। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পর ঘূর্ণিঝড় ও বন্যায় লাখো প্রাণহানি, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা এসব বিদেশিদের মনে শঙ্কা তৈরি করে।
কিন্তু বঙ্গবন্ধুর স্বপনের সোনার বাংলা গড়তে হলে আমাদের নিজস্ব সম্পদের সঠিক ব্যবহার করতে হবে। পর্যটন খাতকে অনেকেই দেখছেন সম্ভাবনার আলো হিসেবে।
স্থানীয় উদ্যোগ ও টেকসই উন্নয়ন
শ্রীমঙ্গলে চা-বাগান ঘিরে গড়ে উঠছে কমিউনিটি-ভিত্তিক পর্যটন। সুন্দরবনের আশপাশে স্থানীয়রা গাইড হিসেবে কাজ করছেন। এই উদ্যোগগুলো শুধু পর্যটন নয়, টেকসই উন্নয়নের পথও দেখাচ্ছে।
ফাহাদ আহমেদের মতে, পর্যটন বাড়লে বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরি হবে। গ্রামাঞ্চলে হোমস্টে, গাইড, ইকো-রিসোর্ট, সবকিছুতেই স্থানীয় মানুষ উপকৃত হবে।
স্বাধীন বাংলার পর্যটন ভবিষ্যৎ
সবমিলিয়ে, বাংলাদেশে পর্যটনের মূল বাধা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অভাব নয়, বরং দেশের ইতিবাচক দিক সঠিকভাবে বিশ্ব দরবারে তুলে না ধরা। সঠিক পরিকল্পনা, নিরাপত্তা ও ইতিবাচক গল্প বিশ্বদরবারে পৌঁছাতে পারলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গড়া আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশও একদিন দক্ষিণ এশিয়ার পর্যটন মানচিত্রে উজ্জ্বল হয়ে উঠবে।