চা পানের সঠিক নিয়ম: স্বাস্থ্য রক্ষায় বাঙালির ঐতিহ্যবাহী পানীয়
বাংলার ঘরে ঘরে চা শুধু একটি পানীয় নয়, এটি আমাদের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত বাঙালির জীবনে চায়ের স্থান অটুট রয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের আড্ডা থেকে শুরু করে আজকের প্রজন্মের দৈনন্দিন জীবন, সর্বত্রই চায়ের উপস্থিতি।
কিন্তু এই প্রিয় পানীয়টি কি সত্যিই স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর? নাকি আমরা চা বানানোর সময় কিছু ভুল করছি বলেই সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন ক্যান্সার সার্জন ডা. জয়েশ শর্মা।
চা বানানোর মূল ভুলগুলো
চিকিৎসকদের মতে, চা নিজে ক্ষতিকর নয়। বরং ভুল পদ্ধতিতে চা তৈরি করা এবং অতিরিক্ত পরিমাণে পান করাই শরীরের জন্য সমস্যা ডেকে আনে। সবচেয়ে বড় ভুল হল চা পাতাকে দীর্ঘ সময় ধরে ফুটিয়ে নেওয়া।
এতে চায়ের মধ্যে অতিরিক্ত ট্যানিন ও ক্যাফেইন নিঃসৃত হয়, যা গ্যাস্ট্রিক সমস্যা, অ্যাসিডিটি, বুকজ্বালা এবং মাথাব্যথার কারণ হতে পারে। বিশেষ করে খালি পেটে এই ধরনের চা পান করলে সমস্যা আরও বেড়ে যায়।
চায়ের উপকারিতা ও বাঙালি ঐতিহ্য
আমাদের পূর্বপুরুষরা চায়ের গুণাবলী সম্পর্কে জানতেন। চায়ে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট গুণের কথা বিজ্ঞানও স্বীকার করে। ব্ল্যাক টিতে থাকে ফ্ল্যাভোনয়েড, যা শরীরের কোষকে ফ্রি-র্যাডিক্যালের ক্ষতি থেকে রক্ষা করে।
নিয়মিত কিন্তু সীমিত পরিমাণে চা পান করলে হৃদযন্ত্র সুস্থ থাকে, রক্ত সঞ্চালন ভালো হয় এবং মানসিক সতেজতাও বাড়ে। তবে এই উপকার তখনই মিলবে, যখন চা বানানোর সঠিক নিয়ম মানা হবে।
সঠিক চা বানানোর পদ্ধতি
ডা. জয়েশ শর্মার মতে, চা বানানোর সময় জল ফুটে ওঠার পর তাতে চা পাতা দিয়ে ২-৩ মিনিটের বেশি রাখা উচিত নয়। বেশি সময় রাখলে তাতে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।
দুধ চায়ের ব্যাপারে সতর্কতা: অনেকেই দুধ চা বেশি পছন্দ করেন। কিন্তু অতিরিক্ত দুধ এবং চিনি চায়ের স্বাভাবিক উপকারিতা কমিয়ে দেয় এবং ওজন বৃদ্ধি, ডায়াবেটিস ও হজমের সমস্যার ঝুঁকি বাড়ায়।
দৈনিক চা পানের সীমা
স্বাস্থ্যকর চা পানের অভ্যাস অনুযায়ী, দিনে ২-৩ কাপ চা পানই যথেষ্ট। এর বেশি হলে শরীরে অতিরিক্ত ক্যাফেইন জমে অনিদ্রা, অস্থিরতা ও হৃদস্পন্দন বাড়ার মতো সমস্যা হতে পারে।
বিশেষ করে সন্ধ্যার পর চা পান করলে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে। তাই চা পানের সঠিক সময় হল সকাল বা বিকেলের প্রথম ভাগ।
খালি পেটে চা পানের ক্ষতি
বাঙালিদের মধ্যে একটি প্রচলিত অভ্যাস হলো খালি পেটে চা পান করা। কিন্তু এটি স্বাস্থ্যের জন্য মোটেও ভালো নয়। খালি পেটে চা পান করলে পাকস্থলীর অ্যাসিডের মাত্রা বেড়ে যায়, যার ফলে গ্যাস্ট্রিক, আলসার বা বমিভাব হতে পারে।
তাই চা খাওয়ার আগে হালকা কিছু খাওয়া বা বিস্কুটের সঙ্গে চা পান করাই ভালো।
বিশেষ সতর্কতা
চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী, যারা উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ বা উদ্বেগজনিত সমস্যায় ভুগছেন, তাদের চা পান সীমিত করা উচিত। এই ধরনের ব্যক্তিদের হালকা চা বা গ্রিন টি বেছে নেওয়াই বেশি নিরাপদ।
সব মিলিয়ে বলা যায়, চা পুরোপুরি বর্জন করার প্রয়োজন নেই। বরং সঠিক নিয়মে তৈরি করা ও পরিমিত পরিমাণে পান করাই সুস্থ থাকার মূল চাবিকাঠি। চা আপনার দৈনন্দিন জীবনের আনন্দ হতে পারে, অসুখের কারণ নয়।