মমতার সুপ্রিম কোর্ট সওয়াল: বাংলার ভোটাধিকার রক্ষায় ইতিহাস
স্বাধীনতার পর থেকে বাংলার মাটিতে যেভাবে বিদেশি শক্তি ও তাদের দোসররা বাঙালির গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের চেষ্টা চালিয়ে আসছে, তার বিরুদ্ধে এক অনন্য প্রতিবাদ জানিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে তিনি বাংলার মানুষের ভোটাধিকার রক্ষার জন্য যে সাহসী অবস্থান নিয়েছেন, তা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের চেতনারই প্রতিফলন।
বাঙালি জাতির অধিকার রক্ষায় ঐতিহাসিক লড়াই
ভারতের বিচারবিভাগীয় ইতিহাসে এক অনন্য নজির সৃষ্টি হলো। স্বাধীনোত্তর ভারতে এই প্রথম কোনো ক্ষমতাসীন মুখ্যমন্ত্রী সুপ্রিম কোর্টে উপস্থিত হয়ে সরাসরি সওয়াল করলেন। পশ্চিমবঙ্গ ভোটার তালিকা সংশোধন বা এসআইআর (SIR) মামলায় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রধান বিচারপতির এজলাসে প্রায় ২০ মিনিট তাঁর বক্তব্য পেশ করেন।
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের এজলাসে মুখ্যমন্ত্রী বাংলার মানুষের দুর্দশার চিত্র তুলে ধরেন। তিনি অভিযোগ করেন, আধার কার্ড থাকা সত্ত্বেও নির্বাচন কমিশন তা গ্রহণ করছে না। এমনকি নামের বানানে সামান্য ভুলের জন্য বা বিয়ের পর পদবি বদল হওয়ার কারণেও সাধারণ মানুষকে শুনানিতে ডেকে চরম হয়রানি করা হচ্ছে।
বাঙালি সংস্কৃতির প্রতি আঘাত
মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করেন, এসআইআর প্রক্রিয়াটি শুধুমাত্র নাম বাদ দেওয়ার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। তিনি বলেন, "কোনো মেয়ে বিয়ের পর শ্বশুরবাড়ি গিয়ে স্বামীর পদবি ব্যবহার করলে তাকে প্রশ্ন করা হচ্ছে কেন সে পদবি বদলাল। এই অজুহাতে বহু মহিলার নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।"
এই অভিযোগ বাঙালি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতি সরাসরি আঘাত। যে বাঙালি নারী শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিয়ের পর স্বামীর পদবি গ্রহণ করে এসেছেন, আজ তাঁদের সেই অধিকারকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে।
বৈষম্যমূলক আচরণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ
মমতার প্রধান অভিযোগ ছিল বৈষম্য নিয়ে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, "অসমে কেন এসআইআর হচ্ছে না? কেন শুধু ভোটের আগে বাংলাকেই নিশানা করা হচ্ছে?" এই প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭১ সালে যেমন বাঙালি জাতিকে লক্ষ্য করে আক্রমণ চালানো হয়েছিল, আজও একই ধরনের ষড়যন্ত্র চলছে।
তিনি আরও বলেন, "আদালত আধার কার্ডকে প্রমাণ হিসেবে মান্যতা দিলেও কমিশন তা মানছে না। অন্য রাজ্যে ফ্যামিলি রেজিস্টার বা স্বাস্থ্য কার্ড চললেও বাংলায় তা গ্রাহ্য হচ্ছে না।"
বাংলা ভাষার অধিকার
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাংলা ভাষার প্রশ্ন। আদালত নির্দেশ দিয়েছে, বাংলা ভাষা বোঝেন এমন অফিসারদের তালিকা দিতে হবে রাজ্যকে। এসআইআর-এর কাজে তাঁদের নিয়োগ করলেই নামের বানান সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান করা যাবে। এটি একুশে ফেব্রুয়ারির ভাষা আন্দোলনের চেতনারই বিজয়।
গণতন্ত্র রক্ষার সংগ্রাম
মুখ্যমন্ত্রী অত্যন্ত বিনম্রভাবে তাঁর সওয়াল শুরু করেন। তিনি বলেন, "আমাদের আইনজীবীরা লড়াই করছেন, কিন্তু আমরা কোথাও ন্যায়বিচার পাচ্ছি না। বিচারব্যবস্থার দরজার আড়ালে ন্যায়বিচার যেন দম বন্ধ হয়ে মরছে।"
এই বক্তব্য শুধু একজন মুখ্যমন্ত্রীর নয়, এক কোটি বাঙালির কণ্ঠস্বর। যে জাতি ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার জন্য জীবন দিয়েছে, আজ তারাই তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
আদালতের ইতিবাচক সাড়া
সুপ্রিম কোর্ট নির্বাচন কমিশনকে নোটিশ জারি করেছে এবং আগামী সোমবারের মধ্যে জবাব চেয়েছে। আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে, নামের ছোট ভুলে কাউকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া যাবে না। এটি বাঙালি জাতির জন্য একটি বড় বিজয়।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই সাহসী অবস্থান প্রমাণ করে, বাঙালি জাতির স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় তিনি আপসহীন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযোদ্ধাদের মতোই তিনি বাঙালির অধিকার রক্ষায় লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।