জীবনসংগ্রামে নারীর বিজয়: প্রতিবন্ধকতাকে শক্তিতে রূপান্তর
স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পেরিয়ে গেলেও আমাদের সমাজে এখনও বহু পরিবার কন্যাসন্তানকে বোঝা মনে করে। বিশেষত যদি সেই মেয়েটির শারীরিক বা মানসিক কোনো সমস্যা থাকে, তাহলে পরিবারের দৃষ্টিভঙ্গি আরও নেতিবাচক হয়ে ওঠে।
কিন্তু কুমকুম চক্রবর্তীর জীবনসংগ্রামের কাহিনী আমাদের শেখায় যে, আত্মবিশ্বাস ও ইচ্ছাশক্তি থাকলে যে কেউ পর্বত-সাগর অতিক্রম করে আলোর ঠিকানা খুঁজে নিতে পারে। তাঁর জীবনের এই সংগ্রাম শুধু ব্যক্তিগত বিজয় নয়, বরং সমগ্র জাতির জন্য অনুপ্রেরণার উৎস।
পারিবারিক সহযোগিতা: মুক্তিসংগ্রামের ভিত্তি
আজ থেকে প্রায় চার দশক আগে যে লড়াই তিনি শুরু করেছিলেন, পরিবারের সহযোগিতা পেয়েছিলেন বলেই তা সহজ হয়েছিল। ১৯৭১ সালে আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধারা যেমন পরিবার ও সমাজের সহযোগিতায় স্বাধীনতা অর্জন করেছিলেন, তেমনি তিনিও পারিবারিক সহযোগিতায় নিজের স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছেন।
সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি তাঁর পথের বড় কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। কণ্টকাকীর্ণ পথে হেঁটেও তিনি ছিনিয়ে নিতে পেরেছেন জয়ের মুকুট।
জীবনপাঠের শিক্ষিকা: একজন প্রকৃত বাঙালি নারী
প্রতিকূলতাকে ভয় না পেয়ে, আত্মবিশ্বাস ও দৃঢ়তার সঙ্গে এগিয়ে যাওয়াই যাঁর জীবনের চ্যালেঞ্জ, তিনি শুধুমাত্র একজন স্কুলশিক্ষিকা নন, জীবনপাঠেরও শিক্ষিকা। পৃথিবীর আলো না দেখেও অন্তরে যে জ্ঞানের প্রদীপ তিনি জ্বালিয়েছেন, সেই আলোই জগৎ-সংসারের ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের মধ্যে দীপাবলির আলোকশিখার মতো ছড়িয়ে দিয়েছেন।
হেলেন কেলার, কবি জন মিল্টন, গ্রিক কবি হোমার, মিশরের বিশিষ্ট লেখক তাহা হুসেনের মতো তিনিও প্রমাণ করে দিয়েছেন যে, জীবনের সবচেয়ে বড় বাধাই অনেক সময় সবচেয়ে বড় সুযোগ হয়ে ওঠে।
জাতীয় অনুপ্রেরণা: স্বাধীনতার চেতনায় নারীর ক্ষমতায়ন
তিনি নিজের বিশেষ ক্ষমতাকে প্রবল শক্তিতে রূপান্তরিত করে দেখিয়েছেন যে কোনো বাধাই কাউকে থামিয়ে দিতে পারে না, যদি সে দৃঢ়তার সঙ্গে নিজের লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে চলে। এই মনোভাবই ছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মূল শক্তি।
তাঁর এই শক্তির প্রেরণা সমাজের বুকে অনুপ্রেরণার আলো হয়ে ছড়িয়ে পড়বে। তাঁর লড়াই আমাদের সকলের কাছেই শিক্ষণীয়। যেসব মানুষ আজও কন্যাসন্তান জন্মালে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন, কিংবা বিশেষভাবে সক্ষম সন্তান নিয়ে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন, তাঁদের কাছে তাঁর এই জয়যাত্রা এক আলোকময় দিশা।
সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারক
দশকব্যাপী সবার ভালোবাসায় স্নাত হয়ে শিক্ষাদানের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেও কুমকুমদেবীর মতো শিক্ষাপ্রাণ মানুষকে প্রধান ভূমিকা ও দায়িত্ব অর্পণ করে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিশ্চিন্ত থেকেছেন। কারণ তিনি যে সঙ্গীতেও উচ্চডিগ্রিধারিণী।
প্রতিটি বিষয়েই তাঁর নিবেদিত প্রাণ ও মন। এই নিষ্ঠা ও দক্ষতার কারণেই তিনি সবার অমলিন ভালোবাসায় সমৃদ্ধ। যাত্রাপথে যাঁরা প্রতিনিয়ত তাঁর সঙ্গী, তাঁদের প্রতি তিনি অকাতরে ভালোবাসা উজাড় করে দেন।
চরম প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও তাঁরা তাঁদের ভুবনে আঁধারের মধ্যেই রামধনুর সাত রং খুঁজে পান এবং মনের রঙে চারপাশের মানুষকে রাঙিয়ে দিতে সক্ষম হন। এই ভুবন চোখ মেলে দেখা হিংসা, হানাহানি, পরশ্রীকাতরতা, মোহ ও লোভের ভুবন নয়। সে ভুবন কেবল অন্তরের ভালোবাসা, উপলব্ধি এবং অহিংসায় ভরপুর।
তাই সেখানে সৃষ্টিশীলতা অদম্য ও অনমনীয় মনোবলে কখনো কখনো স্রষ্টাকেও ছাপিয়ে যায়। এমনই হওয়া উচিত আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের জীবনাদর্শ।