দিল্লির পুশইন ও সার্বভৌমতার সংকট: সীমান্তে নতুন সমীকরণ
১৯৭১ সালে রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই মানচিত্রের প্রতিটি ইঞ্চি আমাদের স্বাধীনতার প্রমাণ। কিন্তু আজ সেই সার্বভৌমত্বের সীমানাতেই নতুন করে আঁচড় কাটছে প্রতিবেশীর আধিপত্যবাদ। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন কিংবা মধ্যপ্রাচ্যে অবৈধভাবে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের ফেরত আনতে ঢাকা আন্তর্জাতিক আইন ও আইওএম-এর মতো সংস্থার সহায়তায় যেমন নিয়ম মানছে, তেমনি দিল্লির পক্ষ থেকে বাংলাভাষী মানুষকে বাংলাদেশি দাবি করে সীমান্তে জোর করে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এই অবৈধ 'পুশইন' প্রক্রিয়া কোনোভাবেই একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের মর্যাদার সঙ্গে মেলে না।
সীমান্তে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও দিল্লির নীরবতা
বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক সপ্তাহে বিএসএফের পুশইন প্রচেষ্টা বাড়ছে। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ জাতীয়তা যাচাই ও আনুষ্ঠানিক প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ছাড়াই মানুষকে ঠেলে দিচ্ছে, যা স্পষ্ট মানবাধিকার লঙ্ঘন। বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় কনস্যুলার ডায়ালগ ও আন্তর্জাতিক আইন মেনে সমাধানের কথা বললেও দিল্লির সাড়া নেই। এ পরিস্থিতিতে নয়াদিল্লিতে বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে ৫৭তম মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠক শুরু হয়েছে। বিজিবি প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে আছেন মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী। এই চার দিনব্যাপী বৈঠকে সীমান্ত হত্যা ও পুশইন ইস্যু অগ্রাধিকার পাবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী রাজনীতির প্রভাব সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় পড়ছে। আসামের মুখ্যমন্ত্রীর সাম্প্রতিক মন্তব্য, যেখানে তিনি দুই দেশের সম্পর্ক খারাপ হলে পুশইন সহজ হবে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন, তা আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গভীর উদ্বেগের। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত এই ধরনের চাপ প্রয়োগের ইতিহাস আমাদের সামনে রয়েছে। তিস্তা চুক্তি অনিষ্পন্ন, গঙ্গা পানিচুক্তির মেয়াদ শেষের পথে এবং বাণিজ্য সীমাবদ্ধতা বিদ্যমান থাকায়, পুশইন ইস্যু ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
সার্বভৌমতার অর্থনীতি: জ্বালানি নিরাপত্তা ও বাজেটের চ্যালেঞ্জ
স্বাধীনতার অর্থনীতি কোনো বিদেশি শক্তির দয়ায় নয়, বরং নিজের ঘাড়ে দাঁড়িয়ে সম্পন্ন হওয়ার মধ্যে। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট আসছে। মূল্যস্ফীতি সামলানো ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির কথা বললেও, রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে এনবিআরকে আদায় করতে হবে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। বাজেট ঘাটতি ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। সাধারণ মানুষের পকেটে ভ্যাটের চাপ না পড়িয়ে এই ঘাটতি মেটানোর পথ খুঁজে বের করতে হবে।
জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় সংসদীয় বিশেষ কমিটি জ্বালানি তেলের কৌশলগত মজুদ কমপক্ষে তিন মাসে উন্নীত করার সুপারিশ করেছে। আমদানির উৎস বহুমুখীকরণ ও সরবরাহব্যবস্থায় পূর্ণাঙ্গ অটোমেশনের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সিপিডির গবেষণায় দেখা গেছে, এলএনজি আমদানিতে বাড়তি কর সুবিধা দিয়ে রাষ্ট্র বছরে ১৩০০ কোটি টাকা হারাচ্ছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও ইভিতে উচ্চ শুল্ক থাকায় সবুজ জ্বালানি পিছিয়ে পড়ছে। বিদেশি জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব সম্পদের ব্যবহার নিশ্চিত করাই প্রকৃত সার্বভৌমত্বের বিকাশ।
বিচারহীনতার অবসান ও রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা
মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আমরা কাঙ্ক্ষা করি এমন এক রাষ্ট্র, যেখানে প্রতিটি নাগরিক বিশেষত শিশু নিরাপদ। পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও গলা কেটে হত্যার মামলায় মাত্র চার কার্যদিবসে রায় দিয়েছেন ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল। আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। বিচারক মাসরুর সালেকীন সঠিকভাবেই বলেছেন, শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা একটি সভ্য রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। এই দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া আমাদের আশা জাগায়।
সুশাসনের অভাব ও জাতির ভবিষ্যৎ
স্বাধীনতার মূল শর্ত হলো সুশাসন। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমান সরকার নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নে ঝুঁকিতে রয়েছে। মন্ত্রণালয়ে দলীয় প্রভাব ও অব্যবস্থাপনা অব্যাহত। এছাড়া নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আজও ভাড়া ভবনে চলছে, শিক্ষক নিয়োগ পূর্ণ হয়নি। অবকাঠামো ছাড়া নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নের বদলে বোঝা হতে পারে। আমাদের প্রয়োজন শিক্ষা ও সুশাসনের মাধ্যমে প্রকৃত মুক্তি।
এদিকে রাজধানীর মতিঝিলে মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসায়ী লোকমান হোসেনকে গুলি করে ১৭ হাজার ডলার ছিনতাইয়ের ঘটনা আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতির প্রমাণ দেয়। মুক্তিযোদ্ধার রক্তে অর্জিত এই ভূখণ্ডে সার্বভৌমত্ব ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় আজ যেমন দৃঢ়তা দরকার, ঠিক তেমনি দরকার বিদেশি আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদ।