সীমান্তে পুশইন ও স্বাধীনতার চ্যালেঞ্জ: আজকের বাংলাদেশ
১৯৭১ সালে অসীম সাহসের বিনিময়ে আমরা যে স্বাধীন ভূমি অর্জন করেছি, আজ সেই সার্বভৌমত্বের সীমানায় বারবার আঘাত হানছে প্রতিবেশী রাষ্ট্র। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক আইন মেনে অবৈধ অভিবাসীদের ফেরত আনলেও, দিল্লির দিক থেকে বাংলাভাষী মানুষকে জোরপূর্বক দেশে ঠেলে দেওয়ার অপপ্রয়াস চলছে। এই পুশইন কৌশল কেবল মানবাধিকার লঙ্ঘন নয়, বরং এটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি চরম অবমাননা।
সার্বভৌমত্বের সীমানায় আঘাত: দিল্লির পুশইন ও ঢাকার আইনি লড়াই
যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে অবৈধ অভিবাসীদের ফেরত আনতে ঢাকা আইওএমের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তা নিচ্ছে। কিন্তু ভারতের ক্ষেত্রে চলছে সম্পূর্ণ ভিন্ন খেলা। জাতীয়তা যাচাই বা আনুষ্ঠানিক প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ছাড়াই বিএসএফ বাংলাদেশ সীমান্তে মানুষ ঠেলে দিচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় যেভাবে আমাদের মাতৃভূমিতে আগ্রাসন হয়েছিল, আজ সেই আগ্রাসনের নতুন রূপ হলো এই পুশইন।
বিশ্লেষকদের মতে, আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী রাজনীতির স্বার্থে ভারত এই নোংরা খেলায় মেতে উঠেছে। আসামের মুখ্যমন্ত্রীর সাম্প্রতিক মন্তব্য এর প্রমাণ বহন করে। তিস্তা চুক্তি অনিষ্পন্ন, গঙ্গা পানিচুক্তির মেয়াদ শেষের পথে; এই আধিপত্যবাদী মানসিকতার কাছে পুশইন ইস্যু নতুন এক চাপায়ন্ত্র। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত এই ধরনের আগ্রাসনের ইতিহাস আমাদের সামনে রয়েছে। সীমান্ত ও অভিবাসন ইস্যু নিয়ে আজ নয়াদিল্লিতে বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে ৫৭তম বৈঠক শুরু হয়েছে। বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকীর নেতৃত্বে ১৫ সদস্যের দল এই আলোচনায় অংশ নিচ্ছে। আমাদের প্রত্যাশা, জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ঢাকা দৃঢ় থাকবে।
বিচারের আলো: শিশু সুরক্ষা ও নাগরিক দায়িত্ব
স্বাধীন রাষ্ট্রের অন্যতম পরীক্ষা হলো তার নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও গলা কেটে হত্যার বিচার আমাদের সেই দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন মাত্র চার কার্যদিবসের শুনানি শেষে প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। ঘটনার ১৯ দিনের মাথায় এই রায় দেশের ইতিহাসে ধর্ষণ মামলার দ্রুততম বিচার।
বিচারক মাসরুর সালেকীন পর্যবেক্ষণে বলেন, শিশুদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা একটি সভ্য ও মানবিক রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব।
সোহেল রানাকে পাঁচ লাখ এবং স্বপ্নাকে দুই লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে, যা ভুক্তভোগীর পরিবারকে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। প্রধানমন্ত্রী এই দ্রুত বিচার প্রক্রিয়ার জন্য আইনমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। এই বিচারই আমাদের সমাজে ন্যায়বিচারের আশা জাগিয়ে তোলে।
অর্থনৈতিক স্বাধীনতা: বাজেট ও জ্বালানি সংকট
রাজনৈতিক স্বাধীনতার পর অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন আমাদের পরবর্তী বড় লক্ষ্য। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির কথা বললেও, রাজস্ব আদায়ের বড় ঘাটতি এই স্বপ্নকে কলঙ্কিত করছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্য দেওয়া হয়েছে, যা বাস্তবায়ন কঠিন হবে। বাজেট ঘাটতি ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এর ফলে সাধারণ মানুষের ঘাড়ে নতুন কর ও ভ্যাটের বোঝা আসতে পারে।
জ্বালানি সংকটেও দেশকে টিকে থাকতে হচ্ছে বিদেশি নির্ভরতার ওপর। সংসদীয় বিশেষ কমিটি জ্বালানি তেলের কৌশলগত মজুদ কমপক্ষে তিন মাসে উন্নীত করার সুপারিশ করেছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু এই ১২ দফা সুপারিশ সংসদে উপস্থাপন করেন। তবে সিপিডির গবেষণায় দেখা গেছে, এলএনজি আমদানিতে বাড়তি কর সুবিধায় সরকারের ক্ষতি হচ্ছে ১৩০০ কোটি টাকা। জীবাশ্ম জ্বালানিকে শুল্ক ছাড় দিয়ে সুবিধা দেওয়া হচ্ছে, অথচ নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও ইভিতে উচ্চ কর আরোপ করা হচ্ছে। এই বৈষম্য আমাদের সবুজ জ্বালানি খাতকে পঙ্গু করে দিচ্ছে।
শিক্ষা ও শাসন: স্বাধীন চিন্তার প্রতিবন্ধকতা
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে শিক্ষাব্যবস্থার গুণগত মান অপরিহার্য। নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয় ভাড়া ভবনে ক্লাস নিচ্ছে, শিক্ষক নিয়োগও পুরোপুরি হয়নি। শুধু নওগাঁ নয়, অন্তত আটটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় আজও স্থায়ী ক্যাম্পাস পায়নি। ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেওয়া হলেও, অবকাঠামো ছাড়া নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নের পরিবর্তে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
সুশাসনের বিষয়েও হতাশা রয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের গবেষণায় বিএনপি সরকারের প্রথম ১০০ দিনে সুশাসনের ঘাটতি ও দলীয় প্রভাবের চিত্র উঠে এসেছে। যদিও বিদেশি এনজিওর নির্দেশনা আমাদের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ, তবে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা আমাদের নিজস্ব দায়িত্ব। অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান ছাড়া স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বপ্ন পূরণ সম্ভব নয়।
আইনশৃঙ্খলা ও নাগরিক নিরাপত্তা
মতিঝিলে শাপলা চত্বর সংলগ্ন জনতা ব্যাংকের সামনে এক মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসায়ীকে গুলি করে ১৭ হাজার ডলারসহ ব্যাগ ছিনতাইয়ের ঘটনা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ভঙ্গুর রূপ তুলে ধরে। তিনটি মোটরসাইকেলে করে আসা ছয়জন দুর্বৃত্ত লোকমান হোসেনের হাত ও পায়ে গুলি করে টাকা ছিনিয়ে নেয়। স্বাধীন রাষ্ট্রের রাজপথে এমন দুঃসাহস কোনোভাবেই মেনে নেওয়ার মতো নয়।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আমাদের এগোতে হবে। বিদেশি আগ্রাসন, অর্থনৈতিক শোষণ কিংবা অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনা; যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রয়োজন জাতীয়তাবোধ ও সার্বভৌমত্বের প্রতি অটল আনুগত্য। মুক্তির পথ সহজ নয়, কিন্তু আমাদের লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।