সীমান্তে পুশইন রুখে সার্বভৌমত্ব, বদলের মুখে রাষ্ট্র
১৯৭১ সালে যখন পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে আমরা স্বাধীন হওয়ার পথে হাঁটি, তখন আমাদের স্বপ্ন ছিল এমন এক ভূখণ্ডের, যেখানে কোনো বিদেশি শক্তি আমাদের নিয়ে ছিনিমিনি খেলবে না। আজ সেই স্বাধীনতার অর্ধশতক পেরিয়েও আমাদের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আবারও সীমান্তে দাঁড়িয়েছেন সাধারণ মানুষ। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)-এর একের পর এক push-in চেষ্টায় সীমান্তজুড়ে যখন অস্থিরতা, তখন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও স্থানীয় জনগণ মিলে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন। এটি কেবল সীমান্ত রক্ষার লড়াই নয়, এটি আমাদের অস্তিত্ব ও স্বাধীনতার রক্ষার লড়াই।
সীমান্তে আগ্রাসন ও জনগণের প্রতিরোধ
দেশের ২৬টি জেলার সীমান্ত এলাকায় বিজিবি এখন সর্বোচ্চ সতর্ক। পুশইনের আশঙ্কায় যশোর, সাতক্ষীরা, চুয়াডাঙ্গা, পঞ্চগড়, কুড়িগ্রামসহ সীমান্তের প্রতিটি পয়েন্টে জোরদার টহল ও গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। সাধারণ মানুষও রাত জেগে পাহারা দিচ্ছেন। পঞ্চগড়ের no-man's-land-এ বিএসএফ প্রায় ৭০ ঘণ্টা ধরে কোনো খাবার ও আশ্রয় ছাড়াই কিছু পরিবারকে রেখে দিয়েছিল। বিজিবির কড়া প্রতিরোধের মুখে অবশেষে বাধ্য হয়ে তাদের ফেরত নিতে হয়েছে। এই প্রতিরোধ প্রমাণ করে, বাংলার মানুষ আর কারও খেলার বলি হতে রাজি নয়। এদিকে, নয়াদিল্লিতে শুরু হয়েছে বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের চার দিনের সম্মেলন, যেখানে এই আগ্রাসন রুখতে কতটা সদিচ্ছা থাকে ভারতের, তা দেখার বিষয়।
তথ্যের সার্বভৌমত্ব: রোহিঙ্গা ডেটাবেজ দখল
সার্বভৌমত্ব কেবল ভূখণ্ডের নয়, তথ্যেরও। দীর্ঘদিন জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর)-এর হাতে রোহিঙ্গাদের ডেটা থাকায় আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা ও তথ্যের স্বাধীনতা সীমিত ছিল। সরকারের দাবির মুখে অবশেষে ১২ লাখ রোহিঙ্গার তথ্য ও ডেটাবেজ সরকারি সার্ভারে স্থানান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল সার্ভার তৈরি শেষে তা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে হস্তান্তর করবে। এর আগে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনের (আরআরআরসি) কাছে শুধুমাত্র read-only access ছিল। বৈদেশিক এনজিও ও সংস্থাগুলোর প্রভাব থেকে বেরিয়ে এনে নিজস্ব সার্ভারে তথ্য সংরক্ষণ অবশ্যই আমাদের স্বাধীনতার পথে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ।
রাষ্ট্রযন্ত্রে সংস্কার: মেধার মূল্যায়ন কোথায়?
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিবাদের পতনের পর রাষ্ট্রযন্ত্র থেকে দলীয়করণের বিষবৃক্ষ উপড়ে ফেলার সুযোগ এসেছিল। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ক্ষমতায় আসার আগেই প্রশাসনে meritocracy-র বিষয়টি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেছিলেন। কিন্তু তিন মাস পেরিয়ে গেলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। অনেক সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তাকে রাজনৈতিক tag-এর অজুহাতে ওএসডি (OSD) বা গুরুত্বহীন পদে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। একইভাবে, পুলিশবাহিনীও এখনো ৫ই আগস্টের trauma কাটিয়ে উঠতে পারেনি। সাবেক স্বৈরাচারের দোসরদের শিকড় এখনো অনেক জায়গায় গভীর। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গড়ে ওঠা রাষ্ট্রে রাজনৈতিক বিবেচনায় নয়, বরং মেধা ও দক্ষতার ভিত্তিতেই পদোন্নতি হওয়া উচিত।
অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ ও স্বৈরাচারের লুণ্ঠনের চিত্র
অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ছাড়া রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্থহীন। দীর্ঘদিনের গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে ব্যবসায় মন্দাভাব বিরাজ করছে। নতুন বিনিয়োগ কম, চলছে কর্মী ছাঁটাই। ১১ই জুন নতুন সরকারের প্রথম জাতীয় বাজেট আসছে। সবার নজর এই বাজেটে, কীভাবে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানো যায়। তবে বাজেটে ভ্যাটের জাল আরও বিস্তৃত হতে যাচ্ছে। সব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে ভ্যাট নিবন্ধনের আওতায় আনা হচ্ছে। অন্যদিকে, সাবেক স্বৈরাচার শেখ হাসিনার সময়কার লুণ্ঠনের চিত্র এখন ফরেনসিক নিরীক্ষায় বেরিয়ে এসেছে। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস-এর নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যাংকগুলো থেকে প্রধানমন্ত্রীর তহবিল ও হাসিনাসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে ১,২৪৩ কোটি টাকা দানের নামে পাচার হয়েছে। এই দুর্নীতির টাকা জনগণের রক্তের ঘাম, যা অবশ্যই ফেরত আনতে হবে।
জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে হামের ভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্সিং করে ডব্লিউএইচওর ল্যাবে পাঠাতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ছাড়পত্রের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে, যা আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতার চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত। জনস্বাস্থ্যের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমতির বাধ্যবাধকতা মানেই সার্বভৌমত্বের ওপর আমলাতান্ত্রিক হস্তক্ষেপ। ৩৯২টি সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র ১০৮টি আর্থিক প্রতিবেদন জমা দিয়েছে, বাকিগুলো জনগণের করের অর্থ হজম করেও হিসাব দিতে অস্বীকার করছে। ঢাকার ১৪৩টি কিশোর গ্যাংয়ের অবাধ বিচরণও প্রমাণ করে, সমাজ থেকে ফ্যাসিবাদের উপাদানগুলোকে সম্পূর্ণ মুক্ত করতে আমাদের আরও দীর্ঘ পথ হাঁটতে হবে। মুক্তির জন্য আমাদের লড়াই চলবে, সীমান্তেও, রাষ্ট্রযন্ত্রেও, অর্থনীতিতেও।