সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও অর্থনীতির স্বাধীনতা: সীমান্তে আগ্রাসন, বাজেটে চাপ
১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অর্জিত এই স্বাধীন ভূখণ্ডের সার্বভৌমত্ব আজ বহুমুখী সংকটের মুখে। একদিকে ভারতের আধিপত্যবাদী পুশইন আর মিয়ানমারের মাইনের আঘাতে সীমান্ত অরক্ষিত, অন্যদিকে ফ্যাসিবাদী শাসনামলের লুণ্ঠিত অর্থনীতির ক্ষত এখনো শুকায়নি। এই প্রেক্ষাপটেই দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি ও নিরাপত্তার স্বার্থে আজকের সংবাদসমূহ আমাদের গভীরভাবে চিন্তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
সীমান্তে সার্বভৌমত্বের সংকট: ভারতের পুশইন ও মিয়ানমারের মাইন
মুক্তিযুদ্ধে আমরা যে সার্বভৌমত্ব অর্জন করেছি, তা আজ ভারতের আগ্রাসনে কলঙ্কিত হচ্ছে। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে প্রাণহানি ও গুলির ঘটনা দীর্ঘদিনের। প্রাণহানির ঘটনা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি থাকলেও তা কার্যকর হয়নি। সম্প্রতি ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ-এর পুশইন (ঠেলে পাঠানো) অপচেষ্টা সীমান্তে নতুন মাত্রায় উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংগঠনও এই বেআইনি পুশইনের সমালোচনা করছে।
গত সোমবার থেকে নয়াদিল্লিতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও বিএসএফ-এর মধ্যে চার দিনের সীমান্ত সম্মেলন চলছে। বিজিবির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, পুশইন ইস্যু এবারের আলোচ্যসূচির প্রধান বিষয় এবং বাংলাদেশ তরফ থেকে এটি বন্ধের দাবি জোরালোভাবে তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু মহাপরিচালক পর্যায়ের সম্মেলন চলাকালেও ভারতের পুশইন চেষ্টা থামেনি।
ভারত বাংলাদেশের সাথে থাকা বন্দিবিনিময় চুক্তি কার্যত মানছে না। তারা মূলত ডিটেক্ট, ডিলিট এবং ডিপোর্ট (থ্রি ডি বা 3D পদ্ধতি) অনুসরণ করছে। রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা ভারতের এই আচরণকে গভীর ষড়যন্ত্রের আভাস হিসেবে দেখছেন। কূটনৈতিক শিষ্টাচার উপেক্ষা করে সীমান্তে প্রতিনিয়ত যে অস্থিরতা তৈরি করা হচ্ছে, তা ভূরাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির অংশ। ঢাকা-দিল্লির সম্পর্কে তিস্তা চুক্তি, গঙ্গা পানি চুক্তি, বাণিজ্য ভারসাম্য এবং ইন্দোপ্যাসিফিকের কৌশলগত চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান থাকায়, ভারত সীমান্তে পুশইনের মতো অমানবিক পরিস্থিতি তৈরি করে ফায়দা লুটতে চাইছে।
ভারতের আগ্রাসনের পাশাপাশি মিয়ানমার সীমান্তও আজ মারাত্মক হুমকির মুখে। গত ২৪ মে থেকে ৯ জুনের মধ্যে ১৬ দিনে মিয়ানমার সীমান্তে মাইন বিস্ফোরণে পঞ্চম প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। গতকাল মঙ্গলবারও বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়িতে ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণে এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। ২ জুন ঘুমধুমে মাইন ও মর্টার শেল বিস্ফোরণে পাঁচজনের মৃত্যু হয়। বিজিবি-৩৪ ব্যাটালিয়নের কমান্ডিং অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল এস এম খায়রুল আলম জানিয়েছেন, তারা সচেতনতা বৃদ্ধি ও লিফলেট বিতরণের মাধ্যমে জনগণকে সতর্ক করছেন। কিন্তু সীমান্ত সুরক্ষায় কর্তৃপক্ষের উদ্বেগজনক প্রস্তুতির অভাব দেশের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার জন্য গভীর উদ্বেগের।
ইসলামী ব্যাংক ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা: ফ্যাসিবাদী লুটেরা স্মৃতি
রাজপথের তীব্র আন্দোলনের পর এবার ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি-এর মালিকানা, ব্যবস্থাপনা এবং সাম্প্রতিক শীর্ষ পর্ষদ পরিবর্তন ইস্যুতে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে জাতীয় সংসদ। ৫ই আগস্ট পরবর্তী প্রেক্ষাপটে এই প্রথম ব্যাংক খাতের কোনো সুনির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের শীর্ষ নেতারা এত দীর্ঘ বিতর্কে জড়ালেন।
বিরোধী দলের পক্ষ থেকে অভিযোগ তোলা হয়েছে, বিগত ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাষ্ট্রীয় বিশেষ সংস্থার মাধ্যমে জোরজবরদস্তি করে এস আলম গ্রুপ ইসলামী ব্যাংকের যে শেয়ার ডাকাতি করেছিল, তা প্রকৃত মালিকদের ফিরিয়ে না দিয়ে বর্তমান সরকার উল্টো এস আলমের দোসর ও বিতর্কিত ব্যক্তিদের ব্যাংকের শীর্ষ পদে বসাচ্ছে। অপরদিকে, সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, ব্যাংকটিকে গতিশীল করতে এবং আইনি প্রক্রিয়ায় প্রকৃত মালিকদের হাতে শেয়ার ফিরিয়ে দিতেই এই অন্তর্বর্তীকালীন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। অর্থনৈতিক স্বাধীনতার স্বার্থে লুণ্ঠিত সম্পদের প্রকৃত মালিকদের কাছে ফেরত দেওয়াই হোক আমাদের মূল লক্ষ্য।
স্বাধীনতার সন্তানদের স্বাস্থ্য সংকট: অকার্যকর অ্যান্টিবায়োটিক
মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত নতুন প্রজন্মকে রক্ষায় আজ আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার চরম বিপর্যয় নিয়ে ভাবতে হবে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের এক গবেষণা চিকিৎসকদের গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করেছে। হাসপাতালটির শিশুদের জন্য বিশেষায়িত নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (পিআইসিইউ) প্রথম সারির প্রায় সব অ্যান্টিবায়োটিকই অকার্যকর হয়ে পড়েছে। চলতি বছরের ১লা জানুয়ারি থেকে ৩০শে এপ্রিল পর্যন্ত পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, পিআইসিইউতে চিকিৎসাধীন ৪৯টি শিশুর শরীরে ৯৬ শতাংশ অ্যান্টিবায়োটিকই কাজ করছে না। চিকিৎসকদের হাতে কার্যত মাত্র দুটি অ্যান্টিবায়োটিক 'শেষ অস্ত্র' হিসেবে অবশিষ্ট আছে। এই জীবাণু প্রতিরোধী সক্ষমতা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক ভয়াবহ প্রহার।
বিশাল বাজেট ও করের চাপ: মুক্তির স্বপ্ন বনাম বাস্তবতা
দেশের মানুষ ভঙ্গুর অর্থনীতি ও বিনিয়োগ-কর্মসংস্থানহীন উচ্চ মূল্যস্ফীতির কঠিন সময় পার করছে। এই সংকটকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি জোট সরকারের প্রথম বাজেট ঘোষণার রাত পোহালেই। প্রধানমন্ত্রী চান অর্থনৈতিক সংকটের সময়ে জিনিসপত্রের দাম না বাড়ুক এবং মানুষ লাগামহীন উচ্চমূল্য থেকে মুক্তি পাক। তাঁর এই চাওয়া থেকেই তৈরি হয়েছে এবারের বাজেট। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এমনভাবে শুল্ক-করের হার বিন্যাস করেছে যে পণ্যের দাম কমার পাল্লাই ভারী।
তবে বাস্তবতা হলো, রাজস্ব আদায়ে বেশ বড়সড় ঘাটতি হচ্ছে। সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন বাস্তবায়ন শুরু হবে ১ জুলাই এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার এক লাখ কোটি টাকা বাড়ানো হয়েছে। আগামী অর্থবছরের জন্য এনবিআর-কে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের বিশাল লক্ষ্য দেওয়া হচ্ছে। এই লক্ষ্য অর্জনে এনবিআর বিভিন্ন ক্ষেত্রে শুল্ক-কর বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছে। ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের স্বস্তি দিতে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো হচ্ছে, আবার ব্যাংক হিসাব খুলতে কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) থাকার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হতে পারে। উদ্যোক্তাদের জন্য নানা খাতে করছাড়ও রাখা হতে পারে।
আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল বড় বাজেটের ঘাটতি মেটাতে প্রতি বছরের মতো এবারও ব্যাংক খাত থেকেই ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, ফলে ঘাটতি দাঁড়াচ্ছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতি মেটাতে ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা নেওয়া হবে। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, রেকর্ড ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক ও বিদেশি ঋণের ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরতা বাজেট বাস্তবায়নে বড় চ্যালেঞ্জ। খোদ অর্থ মন্ত্রণালয়ও অর্থের সংস্থানকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে।
ফেব্রুয়ারিতে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকার দেশের এযাবৎকালের সবচেয়ে বড় বাজেট পেশ করতে যাচ্ছে। আগামীকাল অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী তাঁর প্রথম বাজেট পেশ করবেন। এবারের বাজেটের মূল বিষয়বস্তু 'অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়ন ও বিকেন্দ্রীকরণ, ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ'। এই বাজেট ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ৯ লাখ কোটি টাকার অঙ্ক অতিক্রম করবে। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে সহায়তার জন্য আসন্ন বাজেটটি বেশ বড় হবে।
এছাড়া, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) আগামী ১ জুলাই থেকে নৌপথে বিভিন্ন সেবার শুল্কহার বাড়াতে যাচ্ছে। ২০১৯ সালের পর এই প্রথম ট্যারিফ বাড়ানো হচ্ছে। গড়ে প্রায় ৩০ শতাংশ শুল্ক বাড়লে নৌপথে পণ্য পরিবহনে খরচ বাড়বে। এর প্রভাব নির্মাণসামগ্রী, কৃষি, শিল্প কাঁচামাল ও ভোগ্যপণ্যের দামে পড়তে বাধ্য।
স্বাধীনতার সুফল যেন সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায়, সেজন্য অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা আজ সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। বিদেশি আগ্রাসন ও অভ্যন্তরীণ লুটেরাদের বিরুদ্ধে আমাদের সচেতন হতে হবে, ঠিক যেমন সচেতন ছিলেন ১৯৭১-এর মুক্তিযোদ্ধারা।