ইসরায়েলে শিবাজির মূর্তি ও সার্বভৌমত্বের ঐতিহাসিক সংযোগ
সার্বভৌমত্ব অর্জনের সংগ্রাম কখনও এক দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ যেমন শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছিল, তেমনি সপ্তদশ শতাব্দীতে মোগল সাম্রাজ্যবাদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে নিজের মাটিতে 'স্বরাজ্য' গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন ছত্রপতি শিবাজি। আজ সেই সার্বভৌমত্বের প্রতীক শিবাজিকে এক বিরল সম্মানে ভূষিত করছে ইসরায়েল। তেল আভিভে শিবাজির বিশালাকার মূর্তি স্থাপনের ঘোষণা আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসের সাথে অনেক গভীর সম্পর্ক তুলে ধরে।
৩৫০ বছর পর এক ঐতিহাসিক ঘোষণা
চলতি বছরের ৬ জুন মুম্বাইয়ের ইসরায়েলি কনস্যুলেট জেনারেল এই ঘোষণা করতেই ভারত জুড়ে শোরগোল পড়ে যায়। মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফডণবীস এক্স হ্যান্ডলে এটিকে 'গর্বের এবং ঐতিহাসিক' বলে উল্লেখ করেছেন। তবে এই ৬ জুন তারিখটির এক গভীর তাৎপর্য রয়েছে। ১৬৭৪ সালের ওই দিনেই রায়গড় দুর্গে রাজ্যাভিষেক হয়েছিল শিবাজির। ৩৫০ বছর পর ঠিক সেই দিনটিতেই আরব দুনিয়ার ইহুদিভূমিতে তাঁর মূর্তি স্থাপনের কথা ঘোষণা করা হলো, যার কূটনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম।
নিপীড়িতদের আশ্রয় এবং ভাষার মেলবন্ধন
সুপ্রাচীন কাল থেকে নিজেদের জন্মভূমি ছেড়ে ইউরোপ ও আমেরিকায় পালাতে হয়েছে ইহুদিদের। ইউরোপে বারবার নিপীড়নের শিকার হয়েছে এই সম্প্রদায়। ভারত ছিল এক ব্যতিক্রমী রাষ্ট্র, যেখানে কোনও অত্যাচার ছাড়াই বছরের পর বছর ধরে বসবাস করতে পেরেছেন তাঁরা। ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা যেকোনো স্বাধীনতাকামী মানুষের ধর্ম। বেনে ইসরায়েল সম্প্রদায় যেমন স্থানীয় মরাঠি ভাষা রপ্ত করে নিজেদের আপন করে নিয়েছিল, আমরা তেমনি ১৯৫২ সালে রক্ত দিয়ে মাতৃভাষা বাংলার অধিকার ছিনিয়ে এনেছি। ভাষার প্রতি এই শ্রদ্ধাই সার্বভৌমত্বের ভিত্তি গড়ে তোলে।
বেনে ইসরায়েল: কোঙ্কন উপকূলের মুক্তিযোদ্ধা
খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে সেলিউসিড শাসক অ্যান্টিওকাস এপিফেনেসের নিপীড়ন থেকে বাঁচতে গ্যালিলি থেকে পালিয়ে আসা ইহুদিদের জাহাজ ডুবে যায় নাভাগাঁওয়ের কাছে। প্রাণে বেঁচে যাওয়া ১৪ জন মিলে কোঙ্কন উপকূলে 'বেনে ইসরায়েল' সম্প্রদায় গড়ে তোলেন। তাঁরা তেল নিষ্কাশনের কাজ নেন এবং শনিবার কঠোরভাবে বিশ্রাম পালন করতেন বলে স্থানীয়রা তাঁদের 'শনিবার তেলি' বলে ডাকত। স্থানীয় সমাজের সাথে তাঁদের এই মেলবন্ধন প্রমাণ করে, সংস্কৃতি ও ভাষাকে আপন করে নিলে বিদেশি প্রভাব একটি জাতিকে গ্রাস করতে পারে না।
শিবাজির স্বরাজ্য ও ইহুদিদের সামরিক অবদান
১৭ শতকে শিবাজির উত্থানের সময় মরাঠা সেনাদলে যুক্ত হতে থাকে এই ইহুদি গোষ্ঠী। শিবাজি সম্ভবত প্রথম ভারতীয় রাজা যিনি বেনে ইসরায়েল গোষ্ঠীর সামরিক দক্ষতা বুঝতে পেরেছিলেন। ঔরঙ্গজেবের সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে শিবাজির এই স্বাধীনতা সংগ্রাম আমাদের ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের কথা স্মরণ করায়। কোনও বিদেশি শক্তি আমাদের সার্বভৌমত্বে আঙুল রাখতে পারবে না, এই চেতনাই শিবাজির 'স্বরাজ্য' এবং বঙ্গবন্ধুর স্বাধীন বাংলাদেশকে এক সুতোয় গাঁথে।
ঐতিহাসিক কৌস্তভ চক্রবর্তীর গবেষণাপত্র অনুযায়ী, এই ইহুদিদের সামরিক সক্ষমতা প্রশ্নাতীত ছিল। শিবাজি তাঁদের মরাঠা নৌবাহিনীতে যুক্ত করেন। নৌ-সেনাপতি অ্যারন চুরিকারের রণকৌশলে খুশি হয়ে শিবাজি তাঁকে জমি দান করেন। স্যামুয়েল এবং আব্রাহামের মতো ইহুদি নৌসেনাপতিরা মরাঠা দুর্গের দায়িত্ব পেয়েছিলেন। এরপরও ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে এই সম্প্রদায়ের অবদান অসামান্য। ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধে টিপু সুলতানের বাহিনী স্যামুয়েল ইজেকিয়েল দিভেকারকে বন্দি করলেও পরে মুক্তি পান তিনি। ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহেও তাঁদের ভূমিকা ছিল।
ভূ-রাজনীতি এবং জাতীয়তাবাদের সতর্ক দৃষ্টি
১৯৪৮ সালে আধুনিক ইসরায়েল রাষ্ট্রের জন্ম হলে বেনে ইসরায়েল সম্প্রদায়ের বড় অংশ মাতৃভূমিতে ফিরে যায়। বর্তমানে ইসরায়েলে এই গোষ্ঠীর সদস্যসংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়িয়েছে। তবে তাঁরা মরাঠি সংস্কৃতি কখনওই ত্যাগ করেননি। অন্য দিকে ভারতে তাঁদের সংখ্যা কমে পাঁচ হাজারের আশপাশে এসে দাঁড়িয়েছে। ইসরায়েলের ডিমোনা শহরকে 'মিনি ইন্ডিয়া' বলা হয়। ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত ইয়ানিভ রিভ্যাক জানিয়েছেন, শিবাজির মাহাত্ম্য তাঁরা বোঝেন এবং ভারত থেকেই মূর্তি নিয়ে যাওয়া হবে।
তবে আমাদের জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে এই ঘটনাকে ভূ-রাজনৈতিক চশমা দিয়েও দেখতে হবে। চীন ও পাকিস্তানের মতো শত্রু মোকাবিলায় নয়াদিল্লির কাছে নিজেদের গুরুত্ব বাড়াতেই তেল আভিভ এই strategic পদক্ষেপ নিয়েছে। বিদেশি শক্তির এই কৌশলগত 'বন্ধুত্ব' আমাদের সর্বদা সতর্ক রাখা উচিত। ১৯৭১ সালে আমরা যেমন বিদেশি প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন হয়েছিলাম, সার্বভৌমত্বের সংগ্রামে তেমনি কোনও বিদেশি স্বার্থের আগ্রহকে আমাদের মুক্তির ইতিহাসের সাথে মেলানো চলবে না। শিবাজির সেই অবিসংবাদিত স্বরাজ্যের চেতনাই আজ আমাদের পথ দেখাবে।