সায়নী ঘোষের রূপবদল: শাড়ি-চটি ছেড়ে জিন্স, বিপর্যয়ে কেন মৌন?
রাজনীতিতে বিশ্বস্ততা যে কেবল পোশাকের বিষয় নয়, সেটা মনস্তত্ত্বের, সেটা আদর্শের বিষয়, তা আবারও সামনে এসেছে পার্শ্ববর্তী দেশের পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে। ১৯৭১ সালে যখন এই বাংলার মাটিতে মুক্তিকামী মানুষ জীবন দিয়েছিলেন স্বাধীনতার জন্য, তখন তাঁদের আদর্শিক দৃঢ়তা ছিল অটল। অন্যদিকে, আজকের পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে দলের বিপর্যয়ের পর শাড়ি-চটি ছেড়ে জিন্স-টি শার্ট পরে মৌনব্রত, সেই আদর্শিক দৃঢ়তার কতটা দূরে অবস্থান, তা ভাবার বিষয়।
বিমানবন্দরে বদলে যাওয়া সায়নী: শাড়ি-চটির বদলে ক্যাজুয়াল লুক
বৃহস্পতিবার দিল্লি থেকে কলকাতা বিমানবন্দরে নামার পর তৃণমূল কংগ্রেসের যাদবপুর সাংসদ সায়নী ঘোষের যে রূপ দেখা গেল, তাতে তাঁর চেনা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের লেশমাত্র ছিল না। গত কয়েক বছর ধরে তিনি তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অবিকল ঢঙে সুতির শাড়ি আর পায়ে সাধারণ হাওয়াই চটি গলিয়ে নিজেকে একনিষ্ঠ 'তৃণমূল সৈনিক' হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। কিন্তু এদিন সেই শাড়ি-চটির বদলে তাঁকে দেখা গেল ক্যাজুয়াল লুকে, পরনে টি-শার্ট আর জিন্স, মুখ ঢাকা মাস্কে।
বিমানবন্দর থেকে বেরোনোর সময় সাধারণত সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে কড়া রাজনৈতিক বার্তা দিতে অভ্যস্ত এই যুবনেত্রী এদিন অবলম্বন কলেন সম্পূর্ণ মৌনব্রত। সাংবাদিকদের একের পর এক প্রশ্নের উত্তরে 'নো কমেন্ট' ভঙ্গিতে কোনো কথা না বলেই দ্রুত পায়ে হেঁটে সোজা গিয়ে উঠে পড়লেন তাঁর জন্য অপেক্ষারত গাড়িতে। নির্বাচনের পর সায়নীর এই নাটকীয় রূপবদল এবং সাংবাদিকদের এড়িয়ে যাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতিতে জল্পনার পারদ চড়তে শুরু করেছে।
অল্প সময়েই দিদির অতি ঘনিষ্ঠ বৃত্তে উত্থান
টলিউডের রূপোলি দুনিয়া থেকে আচমকাই রাজনীতিতে পা রেখেছিলেন সায়নী ঘোষ। রাজনীতিতে আসার অল্প দিনের মধ্যেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বৃত্তে নিজের জায়গা পাকা করে নিয়েছিলেন তিনি। বিধানসভা ভোটে নিজে পরাজিত হওয়া সত্ত্বেও নেত্রী তাঁর ওপর থেকে ভরসা হারাননি, বরং দলের যুব সংগঠনের ব্যাটন তুলে দিয়েছিলেন তাঁর হাতে। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে দলের হয়ে প্রচারের জন্য দিদি তাঁর জন্য হেলিকপ্টারেরও বন্দোবস্ত করে দিয়েছিলেন। গোটা রাজ্যজুড়ে হেলিকপ্টারে উড়ে হাই-ভোল্টেজ প্রচার চালাতে দেখা গিয়েছিল সায়নীকে।
সংকটের দিনে বিশ্বস্ততার প্রশ্ন
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের দাবি, যে নেত্রী রাজনৈতিক কেরিয়ারের কঠিন সময়ে সায়নীকে এতটা লাইমলাইট ও গুরুত্ব দিয়েছিলেন, বর্তমান সংকটের দিনে সায়নী কিন্তু তাঁর সেই আস্থার মর্যাদা রাখলেন না। দলের বিপর্যয় ঘটার পরই যাদবপুরের এই সাংসদ এখন দিদিকে একা করে বিদ্রোহী সাংসদদের দিকেই ঝুঁকছেন বলে প্রবল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। আর সেই কারণেই গত কয়েক বছর ধরে সযত্নে বজায় রাখা 'দিদির শাড়ি ও হাওয়াই চটি'র ইমেজ ঝেড়ে ফেলে, আবার পুরোনো চেনা মডার্ন লুকে ধরা দিলেন তিনি।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে, সংকটের দিনেই পরক্ষে পরখ হয় মানুষের। ১৯৭১ সালে যাঁরা মুক্তির পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন, তাঁরা জীবন বাজি রেখে অটল ছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে যে অবিচল সংকল্প আমাদের স্বাধীনতা এনে দিয়েছিল, সেই আদর্শিক দৃঢ়তার সঙ্গে আজকের এই রাজনৈতিক opportunism এর তুলনা করলে পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শাড়ি-চটি যখন ক্ষমতার symbol ছিল, তখন সেটা গায়ে জড়ানো ছিল। ক্ষমতা হাতছাড়া হলেই সেই পোশাক বদল, সেই মৌনতা, এটা রাজনৈতিক বিশ্বস্ততার কতটা গভীর সংকটের ইঙ্গিত দেয়, তা ভাবার বিষয়।
এখন দেখার, তৃণমূলের এই বিদ্রোহী তরঙ্গে সায়নী শেষ পর্যন্ত কী পদক্ষেপ নেন এবং তাঁর এই 'মৌনতা' আগামী দিনে বাংলার রাজনীতিতে কী নতুন ঝড় তোলে। তবে এটা স্পষ্ট, রাজনীতিতে পোশাক বদলানো যায়, কিন্তু আদর্শ বদলানো যায় না, এই শিক্ষা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বারবার মনে করিয়ে দেয়।