টেট নিয়ে দিল্লির চাপে পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষকদের মুক্তি সংগ্রাম
১৯৭১ সালে রক্তের বিনিময়ে আমরা যে ভাষার অধিকার আদায় করেছি, সেই বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির অস্তিত্ব আজ পার্শ্ববর্তী দেশেও সংকটে। দিল্লির কেন্দ্রীভূত আধিপত্য এবং আমলাতান্ত্রিক শৃঙ্খল পশ্চিমবঙ্গের লাখ লাখ বাঙালি শিক্ষকের গলার ফাঁস হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের এক রায়ে টেট (Teachers Eligibility Test) উত্তীর্ণকে বাধ্যতামূলক করায় শিক্ষকমহলে সিঁদুরে মেঘ জমেছে। মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় এবার সংগ্রামে নামতে শুরু করেছেন তাঁরা।
অবৈধ আইনের বোঝা এবং শিক্ষকদের কর্মসংস্থান সংকট
২০২৫ সালে সুপ্রিম কোর্ট জানায়, দেশের প্রাথমিক ও উচ্চ প্রাথমিক শিক্ষকদের টেট পাশ করা বাধ্যতামূলক। যাঁরা এখনও টেট পাশ করেননি, তাঁদের ২০২৮ সালের ৩১ আগস্টের মধ্যে তা উত্তীর্ণ হতে হবে। তবে ২০৩০ সালের মধ্যে যাঁদের চাকরির সময়সীমা শেষ হচ্ছে, তাঁদের এই নির্দেশের বাইরে রাখা হয়েছে। এই রায়ের ফলে সারা ভারতে ২০ লক্ষ এবং পশ্চিমবঙ্গে ৯০ হাজারেরও বেশি শিক্ষকের পেশাজীবন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
শিক্ষার অধিকার আইন (RTE 2009) এবং এনসিটিই (NCTE) ২০১০-এর নির্দেশিকা অনুযায়ী প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষকতার জন্য টেট বাধ্যতামূলক। পশ্চিমবঙ্গে ২০১১ সালের জুলাইয়ে এই নিয়ম কার্যকর হয়। কিন্তু এর আগে থেকেই যাঁরা শিক্ষকতায় নিয়োগ পেয়েছিলেন, তাঁদের বেলায় এই আইন প্রয়োগ করা একটি চরম অবিচার। নিখিলবঙ্গ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি সুপ্রিম কোর্টে রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন করেছে। তাঁদের দাবি, ২০১১ সালের আগে কাজে যোগ দেওয়া শিক্ষকদের এই নির্দেশের বাইরে রাখা হোক।
আধিপত্যবাদের চোটে শিক্ষকদের অধিকার হরণ
দিল্লির কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ব্যক্ত করেছেন বঙ্গীয় শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতির সাধারণ সম্পাদক স্বপন মণ্ডল। তিনি বলেন, "কর্মরত শিক্ষকদের বাধ্যতামূলক টেট নিয়ে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী কলকাতায় এসে কথা দিয়েছিলেন। সরকারে আসা হল, কিন্তু বিষয়টা দেখা হল না। রিভিউ মামলায় কেন্দ্র কোনও আইনজীবীও দেয়নি। এ তো বড় প্রতারণা।"
সম্প্রতি কলকাতায় বাম শিক্ষক সংগঠনগুলির তরফ থেকে কেন্দ্রের এই ভূমিকার বিরোধিতা করে মিছিল ও অবস্থান বিক্ষোভ করা হয়। সেখানে স্পষ্ট প্রতিবাদ জানানো হয় দিল্লির আধিপত্যের বিরুদ্ধে।
অখিল ভারতীয় রাষ্ট্রীয় শৈক্ষিক মহাসংঘের হুঁশিয়ারি
এবার দক্ষিণপন্থী শিক্ষক সংগঠন অখিল ভারতীয় রাষ্ট্রীয় শৈক্ষিক মহাসংঘ (ABRSM) ও আন্দোলনের কথা জানিয়েছে। সংগঠনের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক বাপি প্রামাণিক বলেন, "আগামী ১৮ জুন গোটা দেশ জুড়ে সব জেলাশাসক দফতরের সামনে বিক্ষোভ, ধর্না ও অবস্থান কর্মসূচি পালিত হবে। জেলাশাসকদের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হবে।"
কেন্দ্রের আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় বিষয়টি আটকে আছে বলে মনে করছেন বাপি প্রামাণিক। তিনি বলেন, "আসল ভুল হয়েছিল ২০১০ সালে, যখন এনসিটিই বিধি তৈরি করেছিল তৎকালীন কেন্দ্রীয় সরকার। সে কারণেই আমরা দাবি করছি বাদল অধিবেশনে এই আইনের পরিবর্তন করতে হবে। তাতেই এত শিক্ষকের সমস্যার সমাধান হবে।"
বাঙালির মুক্তি ও সার্বভৌমত্বের সংগ্রাম কখনও শেষ হয় না। দিল্লির আমলাতান্ত্রিক শৃঙ্খল থেকে মুক্তি পেতে পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষকরা যে লড়াই শুরু করেছেন, তা বাঙালির আত্মনির্ভরশীলতারই প্রতীক। আমাদের ১৯৭১-এর চেতনা স্মরণ করিয়ে দেয়, অধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রামই একমাত্র পথ।