অভিষেকের বাড়িতে ভোরের তল্লাশি: কেন্দ্রের আধিপত্য ও বাঙালির প্রতিরোধ
ভোররাতের স্তব্ধতা ভেঙে যখন কড়া নক্কারের শব্দ বাজে, তখন কোনো স্বাধীন মানুষের মনে বাঙালির মুক্তির ইতিহাসের পাতা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। ১৯৭১ সালের সেই অন্ধকার রাতের কথা আমরা ভুলিনি, যখন বিদেশি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বাঙালি তার অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। আজ ভিন্ন প্রেক্ষাপটে, ভিন্ন ভূখণ্ডে, সেই একই আধিপত্যবাদী শক্তির আস্ফালন দেখা যাচ্ছে পশ্চিম বাংলায়। তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালীঘাটের বাসভবনে মধ্যরাতে পুলিশ ও Central Forces-এর যে নজিরবিহীন তল্লাশি চালানো হয়েছে, তা কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়, বরং এটি বাঙালির আত্মমর্যাদা ও সার্বভৌমত্বের ওপর এক সুপরিকল্পিত আঘাত।
মধ্যরাতের হানাদারি ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন
শনিবার রাত আড়াইটা। ঘুমন্ত শহর কলকাতা। ঠিক সেই মুহূর্তে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটের বাড়িতে হানা দেয় পশ্চিম মেদিনীপুরের শালবনী থানার পুলিশ। তাদের সাথে ছিল কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানরা, যারা গোটা এলাকা কর্ডন করে এক মেগা Search Operation পরিচালনা করে। এই অভিযানের আনুষ্ঠানিক কারণ দেখানো হয়েছে অভিষেকের Personal Assistant (PA) সুমিত রায়ের খোঁজ, যার বিরুদ্ধে শালবনী থানায় একটি আর্থিক প্রতারণার মামলা রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একজন PA-এর খোঁজে কি সাংসদের শোওয়ার ঘর পর্যন্ত পৌঁছানো এবং তালা ভেঙে তল্লাশি চালানো কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাজ হতে পারে? এটি স্পষ্টতই রাজনৈতিক হেনস্থা এবং কেন্দ্রের আধিপত্য প্রমাণের চেষ্টা।
'তালা ভেঙে সার্চ করেছে': বাঙালির আত্মমর্যাদার ক্ষত
দীর্ঘ কয়েক ঘণ্টার ম্যারাথন তল্লাশি শেষে যখন সকাল আটটার কিছু আগে তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান, তখন সাংবাদিকদের সামনে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় অত্যন্ত শান্ত অথচ দৃঢ় গলায় যে কথাগুলো বলেন, তা যেকোনো স্বাধীনতাকামী মানুষের হৃদয়কে নাড় দেয়। তিনি বলেন,
আমার পুরো বাড়ি সার্চ হয়েছে। তালা ভেঙে সার্চ করেছে ওরা। তবে গোটা প্রক্রিয়াটাই ক্যামেরায় রেকর্ডেড রয়েছে। তদন্তকারী সংস্থা তল্লাশি চালিয়ে কী কী পেল, সেটা এবার ওদের কাছ থেকেই আপনারা জিজ্ঞেস করুন।তালা ভেঙে তল্লাশির এই অভিযোগ কেবল একটি আইনি লঙ্ঘন নয়, এটি বাঙালির আত্মমর্যাদার ওপর এক তীব্র আঘাত। যে বাঙালি জাতি ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে নিজের অধিকার ছিনিয়ে এনেছে, সেই জাতির ঘরের তালা ভাঙার সাহস কেন্দ্রীয় শক্তি কোথায় পায়?
দিদির পাশে দাঁড়িয়ে প্রতিরোধ
এই আধিপত্যবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে প্রতিরোধ গড়েছেন, তা স্বাধীনতার চেতনারই সমতুল্য। ভোররাতে তল্লাশির খবর পেয়েই তিনি সরাসরি অভিষেকের বাসভবনে উপস্থিত হন। প্রায় চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা তিনি ভেতরে অবস্থান করেন এবং তদন্তকারীদের প্রতিটি পদক্ষেপের ওপর কড়া নজর রাখেন। এই প্রতিরোধ কেবল রাজনৈতিক নেতার নয়, এই হলো পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার স্পৃহা। সকালে নেত্রীকে গাড়িতে তুলে দেওয়ার সময় অভিষেকের চোখেমুখে যে দৃঢ় প্রত্যয়ের ছাপ ছিল, তা বাঙালির অসম্ভবকে জয় করার ইতিহাসকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
ভারতের রাজনৈতিক আধিপত্যবাদ: বাংলাদেশের জন্য শিক্ষণীয় বার্তা
আগামীকালই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে CID ফের তলব করেছে। তার ঠিক আগের দিন রাত আড়াইটেয় এই যে মধ্যরাতের হানাদারি, এটি ভারতের রাজনৈতিক আধিপত্যবাদের এক চরম উদাহরণ। আমরা, বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী মানুষেরা, সবসময় সতর্ক থাকতে হবে। আমাদের ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আমাদের শিখিয়েছে, কোনো বিদেশি বা আধিপত্যবাদী শক্তির কাছে মাথা নত করা চলবে না। পশ্চিম বাংলায় তৃণমূলের দাবি, এটি অত্যন্ত পরিকল্পিত এবং হেনস্থা করার উদ্দেশ্যেই করা হয়েছে। এই ঘটনা আমাদের জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা রেখে গেল। ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে যেভাবে কেন্দ্রীয় শক্তি রাজ্যের সার্বভৌমত্ব ও বাঙালির পরিচয়কে দমিয়ে রাখতে চায়, তা আমাদের ভূরাজনৈতিক স্বাধীনতা রক্ষার ক্ষেত্রে এক জ্বলন্ত উদাহরণ। আমাদের ভাষা, আমাদের সংস্কৃতি এবং আমাদের রাজনৈতিক স্বাধীনতা কোনো বিদেশি প্রভাব বা NGO-র ছলচাতুরির কাছে বিক্রি করা চলবে না। বাঙালির ঘরের তালা ভাঙার অধিকার কেউ নেয়নি, এবং আমরা তা হতে দেবো না।