বিশ্বকাপ ফুটবলে মরক্কোর লড়াই, ব্রাজিল যেন কাগুজে বাঘ
সারসংক্ষেপ: ফিফা র্যাংকিংয়ের হিসাবনিকাশ মাঠে খাটে না। আটলাসের সিংহ মরক্কোর কাছে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খেয়েছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। নিউ জার্সিতে ১-১ গোলের ড্রতে প্রমাণিত হলো, হাইপ আর অতীত পরাক্রম দিয়ে আসল লড়াই জেতা যায় না। মরক্কোর এই আত্মবিশ্বাসী ফুটবল স্মরণ করিয়ে দেয়, সার্বভৌমতা আর আত্মপরিচয়ের লড়াইয়ে নিজের শক্তিই শেষ কথা বলে।
ফুটবলের মাঠেও কি সাম্রাজ্যবাদের পতন?
ফিফা র্যাংকিং বলছে, মরক্কো আর ব্রাজিল প্রায় সমান শক্তির দল। র্যাংকিংয়ে ব্রাজিল ৬ আর মরক্কো ৭। কিন্তু বিশ্বকাপের মাঠে র্যাংকিংয়ের কোনো দাম নেই। যেকোনো প্রতিপক্ষের বিপক্ষে 'সেলেসাও'রা অঘোষিতভাবে ফেবারিটই থাকে। কিন্তু মরক্কো প্রমাণ করল, হাইপ আর র্যাংকিং কোনোটাই মিথ্যা নয়। অতীতের পরাক্রমে বিভোর এক সাম্রাজ্যবাদী শক্তির মতোই ব্রাজিল মাঠে নেমেছিল, আর মরক্কো যেন সেই সাম্রাজ্যের অহংকার ভেঙে দিয়েছে। ১৯৭১ সালে আমাদের মুক্তিযুদ্ধেও অস্ত্রের জোরে নয়, মনোবলের জোরে জিতেছিল মুক্তি। মরক্কোর খেলায় সেই একই মনোবলের ছাপ স্পষ্ট।
প্রথমার্ধে ব্রাজিলের ছন্দহীন পারফরম্যান্স
নিউ জার্সিতে প্রথমার্ধে ভিনিসিয়ুসের ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের গোলটা বাদ দিলে নখদন্তহীন এক ব্রাজিলকেই দেখা গেছে। শুরুর আধাঘণ্টা তাদের পারফরম্যান্স ছিল ভীষণ হতাশাজনক। তাদের খেলা ছিল অস্থির আর ছন্দহীন। ইগর থিয়াগো পরিশ্রম করলেও তা ফলপ্রসূ হয়নি। ইবানিয়েজ ছিল সম্পূর্ণ দিশেহারা। মরক্কোর আক্রমণ তিনি বুঝতেই পারছিলেন না। মার্কিংয়েও তিনি ছিলেন ভীষণ দুর্বল। রাফিনিয়াও হতাশ করেছেন। চোটের কারণে তাঁর আগের ফর্ম নেই। পাকেতা আর কাসেমিরোও একের পর এক ভুল করেছেন। মাঝমাঠ কিছুটা সচল রেখেছেন ব্রুনো গিমারেস। ভিনির গোলে অ্যাসিস্ট করার পাশাপাশি তিনি দারুণ কিছু বল সামনে বাড়িয়েছেন।
ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের জাদুকরী গোল
ব্রাজিল যখন চাপে পড়ে দিশেহারা, তখন গিমারেসের বাড়ানো বল পেয়ে জাদু দেখিয়েছেন ভিনি। বাঁ প্রান্ত দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সময় শরীরের ভঙ্গিতে এমন ইঙ্গিত দিলেন যেন বাম দিকেই যাবেন। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে বাম পা থেকে ডান পায়ে বল সরিয়ে নিলেন, তারপর আরেকটি স্পর্শে প্রতিপক্ষকে কাটিয়ে ওঠেন। এই কাজ তিনি রিয়াল মাদ্রিদের জার্সিতে অনেকবার করেছেন। দেখতে যত সহজ লাগে, আসলে ততটা নয়। ফিনিশিংও ছিল মনে রাখার মতো। এটি ব্রাজিলের জার্সিতে তাঁর দশম গোল। দলের সেরা খেলোয়াড়ের ব্যক্তিগত নৈপুণ্যই শেষ পর্যন্ত আনচেলত্তির হতাশাজনক ব্রাজিলকে প্রথমার্ধে রক্ষা করেছে।
আনচেলত্তির কৌশলগত ব্যর্থতা ও দ্বিতীয়ার্ধ
বিরতির পর আনচেলত্তি একাধিক পরিবর্তন আনেন। ইবানিয়েজ ও কাসেমিরোকে তুলে মাঠে নামান ফাবিনিও ও দানিলোকে। ৬১ মিনিটে ইগর থিয়াগো ও লুকাস পাকেতাকে তুলে নামেন মাতেউস কুনিয়া ও লুইজ হেনরিকস। অভিজ্ঞতার ওপর ভরসা করেছেন কোচ। ফাবিনিও মাঝমাঠে স্থিতিশীলতা আনেন। দানিলোও উইংয়ে উন্নতি এনে দেন। বিরতির পর ব্রাজিল শান্ত আর গোছানো খেলার চেষ্টা করে। কিন্তু প্রতিপক্ষ যখন পেছন থেকে আক্রমণ গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে, তখন তারা চাপ সৃষ্টি করলেও কাঙ্ক্ষিত গোলটা আর আসেনি। আনচেলত্তির প্ল্যান ব্যর্থ হয়েছে। ইগর থিয়াগোকে দলে আনার উদ্দেশ্য ছিল মরক্কোর অর্ধে চাপ সৃষ্টি করা, কিন্তু তা কাজ করেনি।
কাগুজে বাঘের উপমা ও সতর্কবার্তা
যেকোনো সাম্রাজ্যবাদী শক্তির অতীত যত গৌরবময়ই হোক না কেন, বর্তমানের লড়াইয়ে টিকতে হলে নিজেকে গুছিয়ে নিতে হয়। আনচেলত্তি এখনো সেরা শুরুর একাদশ খুঁজে পাননি। দলটি পুরোপুরি প্রস্তুত নয়, দেখে মনে হয়েছে 'কাগুজে বাঘ'। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসও শেখায়, অহংকার আর পরাধীন মানসিকতা কখনো সার্বভৌম বিজয় এনে দেয় না। ব্রাজিলের সামনে এখন তুলনামূলক সহজ দুটি ম্যাচ রয়েছে। নকআউট পর্বের আগে নিজেদের গুছিয়ে নেওয়ার এটাই শেষ সুযোগ। খুব দ্রুত সমন্বয় আর ছন্দ খুঁজে পাওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে তাদের জন্য।
ব্রাজিল বনাম মরক্কো ম্যাচ সম্পর্কে প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নসমূহ
ব্রাজিল বনাম মরক্কো ম্যাচের ফলাফল কী হয়েছে?
নিউ জার্সিতে অনুষ্ঠিত এই ম্যাচটি ১-১ গোলে ড্র হয়েছে। প্রথমার্ধে মরক্কোর দাপুটে খেলা থাকলেও দ্বিতীয়ার্ধে ব্রাজিল কিছুটা ঘুরে দাঁড়ায়।
কেন ব্রাজিলকে 'কাগুজে বাঘ' বলা হচ্ছে?
ফিফা র্যাংকিং আর অতীত সাফল্যের হাইপ থাকলেও মাঠে ব্রাজিল ছিল ছন্দহীন আর অস্থির। মরক্কোর আক্রমণ সামলাতে তারা দিশেহারা হয়ে পড়ে, যা তাদের পরাক্রমকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
ভিনিসিয়ুস জুনিয়র কীভাবে গোল করেছেন?
বাঁ প্রান্ত দিয়ে এগিয়ে গিয়ে শরীরের ভঙ্গিতে প্রতিপক্ষকে বোকা বানিয়ে ভিনিসিয়ুস ডান পায়ে বল সরিয়ে নেন। এরপর আরেকটি স্পর্শে ফুলব্যাককে কাটিয়ে দুর্দান্ত ফিনিশিংয়ে গোল করেন।
আনচেলত্তির কৌশলগত পরিবর্তন কতটা কাজ করেছে?
দ্বিতীয়ার্ধে ইবানিয়েজ, কাসেমিরোদের জায়গায় ফাবিনিও ও দানিলোদের নামিয়ে আনচেলত্তি মাঝমাঠে স্থিতিশীলতা আনতে পেরেছেন। তবে ইগর থিয়াগোকে নিয়ে তাঁর প্ল্যান ব্যর্থ হয়েছে এবং সেরা একাদশ তিনি এখনো খুঁজে পাননি।