মহেঞ্জোদারোর ডান্সিং গার্ল: ইতিহাস বিকৃতির নতুন মোড়
সিন্ধু সভ্যতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন, চার হাজার বছরের পুরনো মহেঞ্জোদারোর 'ডান্সিং গার্ল' মূর্তিকে কেন্দ্র করে নতুন করে সেন্সরশিপ ও ইতিহাস বিকৃতির বিতর্ক শুরু হয়েছে। ভারতের এনসিইআরটি-এর পাঠ্যবইয়ে মূর্তিটির নগ্নতা ঢেকে দেওয়া হয়েছে, যা মূলত ঔপনিবেশিক ভিক্টোরিয়ান নৈতিকতা ও ধর্মীয় গোঁড়ামির বহিঃপ্রকাশ। প্রত্নতাত্ত্বিক সত্যকে আড়াল করে সিন্ধু সভ্যতাকে বৈদিক ছাঁচে ফেলার যে চেষ্টা চলছে, তা আমাদের প্রাচীন সভ্যতার স্বাধীন ও ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রকে কলঙ্কিত করছে।
ঔপনিবেশিক নৈতিকতা ও সংস্কৃতির উপর সেন্সরশিপ
ভারতের ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ এডুকেশনাল রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং (NCERT) প্রণীত ক্লাস সিক্সের সমাজবিজ্ঞান বইয়ে ডান্সিং গার্লের ছবি সেন্সর করা হয়েছে। মূর্তিটির বুক থেকে নিচের বেশকিছু অংশ পর্যন্ত ঢেকে দেওয়া হয়েছে। এই বইয়ে 'সেন্সর' করা ছবি প্রকাশ্যে আসতেই ভারতজুড়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। কারো মতে, ডান্সিং গার্ল একটি শিল্পকর্ম এবং এটিকে শ্লীল-অশ্লীলের চশমা পরে বিচার করা উচিত নয়।
সোশ্যাল মিডিয়ায় উঠে আসা এই বক্তব্যগুলোকে সমর্থন করেছেন এনসিইআরটি-এর টেক্সটবুক ডেভেলপমেন্ট কমিটির প্রধান মাইকেল ড্যানিও। সংবাদ সংস্থা পিটিআইকে তিনি বলেন,
নগ্নতা মানেই অশ্লীল, এই ভাবনা ভিক্টোরিয়ান নৈতিকতার অংশ। আমরা ঔপনিবেশিকতার থেকে ভারতীয় শিক্ষাকে মুক্ত করার কথা বলেও এই মূর্তিকে যদি যথাযথভাবে উপস্থাপন না করি, তাহলে বুঝতে হবে কোথাও একটা বড় সমস্যা রয়েছে।
মি. ড্যানিও জানান, ক্লাস সিক্সের শিক্ষকদের কেউ এই মূর্তিকে অশ্লীল মনে করেননি। তবু তাকে বলা হয়েছিল এই মূর্তি বাচ্চাদের জন্য উপযুক্ত নয়। তবে কে বা কারা এই নির্দেশ দিয়েছিল, তা স্পষ্ট করেননি তিনি। স্বাধীনতা ও মুক্তির চেতনায় বিশ্বাসী মানুষের জন্য এই সাংস্কৃতিক সেন্সরশিপ চরমভাবে দুঃখজনক। ঔপনিবেশিক মানসিকতা থেকে মুক্তির দাবি তুলেও, প্রকৃত ইতিহাসকে আড়াল করার এই চেষ্টা স্বাধীন চিন্তার ওপর প্রচ্ছন্ন আঘাত।
দেশভাগের সময় ধর্মীয় নৈতিকতার চশমায় হেরে যাওয়া ঐতিহ্য
এই বিতর্কই প্রথম নয়। ১৯২৬ সালে মহেঞ্জোদারোর এইচআর অঞ্চল থেকে উদ্ধার করা মূর্তিটি ভারতের স্বাধীনতার শুরুর দিক থেকেই বার বার বিতর্কের মধ্যে জড়িয়েছে। ইতিহাসবিদ আশীষ কুমারের গবেষণাপত্র অনুযায়ী, ১৯৪৪ সাল নাগাদ তৎকালীন ডিরেক্টর জেনারেল মর্টিমার হুইলার মহেঞ্জোদারো থেকে পাওয়া ১২ হাজারের বেশি পুরাকীর্তি দিল্লিতে নিয়ে আসেন। এর কিছু বছর পরেই দেশভাগের সিদ্ধান্ত হয়।
মহেঞ্জোদারোর মতো বৃহৎ অঞ্চলটি পাকিস্তানের অংশে পড়ায়, পাকিস্তান প্রথমে সব পুরাকীর্তি ফেরানোর দাবি তোলে। প্রথমে পাকিস্তান দুটি গুরুত্বপূর্ণ মূর্তি, 'ডান্সিং গার্ল' ও 'প্রিস্ট কিং', দুটিই দাবি করেছিল। কিন্তু ভারত যে কোনো একটি দিতে রাজি হয়। মি. কুমার বলেন,
পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের মনে হয়েছিল যে এই নগ্ন ডান্সিং গার্ল সেই দেশের ধর্মীয় নৈতিকতার সঙ্গে খাপ খায় না এবং এর ফলে মানুষের ধর্মীয় আবেগে আঘাত লাগতে পারে।
ফলে 'প্রিস্ট কিং' পাকিস্তানে চলে গেলেও 'ডান্সিং গার্ল' রয়ে যায় দিল্লির ন্যাশনাল মিউজিয়ামে। ধর্মীয় গোঁড়ামির কাছে প্রাচীন ঐতিহ্য ও নারী স্বাধীনতা কতটা অসহায়, এটি তারই প্রমাণ। যদিও ডান্সিং গার্লকে পাকিস্তানে ফেরানোর দাবি করে ২০১৬ সালে লাহোর হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন দাখিল করেছেন জাভেদ ইকবাল জাফরি নামক এক ব্যক্তি।
ইতিহাস বিকৃতি ও বৈদিকীকরণের চেষ্টা
২০২৩ সালে আন্তর্জাতিক মিউজিয়াম মেলার আসর বসে ভারতে। ওই মেলার ম্যাসকট ঠিক করা হয় ড্যান্সিং গার্লকে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ওই মূর্তির একটি রেপ্লিকা উদ্বোধন করলে তা নিয়ে বিতর্ক দানা বাঁধে। ওই মূর্তির রেপ্লিকাটিকে পরানো হয়েছিল গোলাপী রংয়ের ব্লাউজ জাতীয় পোশাক এবং নিম্নাঙ্গে ছিল গুজরাতি ঐতিহ্যবাহী নকশা সম্বলিত একটি হলুদ ধুতির মতো পোশাক। ডান্সিং গার্লকে 'শালীন' করে তোলার এই প্রচেষ্টা সমালোচিত হয়েছিল সমাজমাধ্যমে। ভারত সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় তখন বলেছিল, আসল মূর্তিকে নয়, বরং ম্যাসকট হওয়ার জন্য রেপ্লিকাটিকে উপযুক্ত করে তোলার জন্য এই পোশাক পরানো হয়েছে।
এ ছাড়াও ২০১৭ সালে বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত একটি হিন্দি প্রবন্ধ ঘিরে তৈরি হয় বিতর্ক। ওই প্রবন্ধে অবসরপাপ্ত গবেষক এই মূর্তিটিকে 'দেবী পার্বতীর রূপ' বলে দাবি করেন। এটি ছিল সিন্ধু সভ্যতাকে বৈদিক সভ্যতায় পরিণত করার সুপরিকল্পিত চেষ্টা। বস্তুত, আজ পর্যন্ত কোনো গবেষক ও ঐতিহাসিক এই মূর্তিকে বৈদিক সভ্যতা বা কোনো হিন্দু দেবদেবীর সঙ্গে যুক্ত বলে মনে করেননি। আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতির মতো প্রাচীন ইতিহাসকেও বিদেশি ও আঞ্চলিক আগ্রাসন থেকে রক্ষা করা আমাদের জাতীয় দায়িত্ব।
নামকরণের ঔপনিবেশিক চরিত্র ও সিন্ধু সভ্যতার প্রকৃত রূপ
ডান্সিং গার্ল বা প্রিস্ট কিং, এই নামগুলো ঔপনিবেশিক মানসিকতারই দান। ব্রিটিশ কর্মচারীরা ভারতীয় নারী নর্তকীদের সঙ্গে সময় কাটাতে ভালোবাসতেন। এই নারীদের তারা 'নচ গার্লস' (Nautch Girls) বলতেন। আশীষ কুমার বলেন, স্যার জন মার্শালও এই মূর্তিটিকে দেবদাসী প্রথার সঙ্গে যুক্ত করে বিচার করেছিলেন। এই 'নচ' কথাটি সম্ভবত ভারতীয় ভাষার 'নাচ' শব্দ থেকে এসেছে।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত ড. সাঙ্গারালিঙ্গম রমেশ বিবিসিকে বলেছেন,
প্রত্নতাত্বিক ও নৃতত্ববিদরা এখনো রাজত্ব ব্যবস্থার কোনো চিহ্ন খুঁজে পাননি। মনে করা হয়, নগরসমিতির মাধ্যমেই যাবতীয় গুরুত্বপূর্ণ সব সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো। রাজপ্রাসাদ ও অভিজাত্যের কোনো চিহ্ন নেই।
ঐতিহাসিক গ্রেগরি এল পোসেহল তার বইয়ে প্রথম সন্দেহ প্রকাশ করেন এই মূর্তিটি আদৌ নৃত্যরত কি না। ঐতিহাসিক উপিন্দর সিং তার বইয়ে লিখেছেন, মেয়েটি সম্ভবত নাচ করছে না। যদি বা করে, সে মোটেও একজন পেশাদার নৃত্যশিল্পীর মতো দেখতে না। ডেকান কলেজের উপাচার্য বসন্ত শিন্দে দাবি করেছেন, হরপ্পার পুরাকীর্তি কোনো একটি দেশের নয়, বরং সমগ্র দক্ষিণ এশিয়া এই সভ্যতার শরিক। আমাদের মুক্তির লড়াইয়ের মতো এই সভ্যতার চরিত্রও ছিল সাম্যের ও স্বাধীনতার। এই স্বাধীন চেতনাকে আজ ধর্ম ও রাষ্ট্রের সংকীর্ণ চশমায় বিচার করা চরম অসামঞ্জস্য।
ডান্সিং গার্ল মূর্তিটিকে ঘিরে নতুন বিতর্ক কেন শুরু হয়েছে?
ভারতের এনসিইআরটি-এর নতুন ক্লাস সিক্সের সমাজবিজ্ঞান বইয়ে চার হাজার বছরের পুরনো ডান্সিং গার্ল মূর্তির নগ্ন অংশ ঢেকে দেওয়া হয়েছে। এই সেন্সরশিপের বিরোধিতা করে কমিটির প্রধান মাইকেল ড্যানিও বলেছেন, নগ্নতাকে অশ্লীল ভাবার প্রবণতা ঔপনিবেশিক ভিক্টোরিয়ান নৈতিকতার অংশ, যা থেকে মুক্ত হওয়া প্রয়োজন।
দেশভাগের সময় পাকিস্তান ডান্সিং গার্ল মূর্তিটি কেন নিল না?
দেশভাগের সময় মহেঞ্জোদারো পাকিস্তানের অংশে পড়ায় তারা এই মূর্তি ফেরত চেয়েছিল। কিন্তু পাকিস্তানি কর্মকর্তারা মনে করেছিলেন, এই নগ্ন মূর্তি তাদের দেশের ধর্মীয় নৈতিকতার সঙ্গে খাপ খায় না এবং এটি মানুষের ধর্মীয় আবেগে আঘাত লাগাতে পারে। ফলে তারা প্রিস্ট কিং মূর্তিটি নেয় এবং ডান্সিং গার্ল ভারতের দিল্লিতে থেকে যায়।
সিন্ধু সভ্যতার শাসনব্যবস্থা কেমন ছিল?
সিন্ধু সভ্যতায় কোনো কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থা, রাজা বা প্রশাসকের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, নগরসমিতির মাধ্যমেই যাবতীয় গুরুত্বপূর্ণ সব সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো। রাজপ্রাসাদ ও অভিজাত্যের কোনো চিহ্ন এই সভ্যতায় নেই, বরং এটি ছিল সাম্যভিত্তিক ও স্বাধীন চেতনার এক অনন্য নিদর্শন।