মার্কিন অস্ত্রের পতন, ভারতের ব্রহ্মসে মোড় আরবের: সার্বভৌমতার শিক্ষা
পরাশক্তির আশ্রয়ে নিরাপত্তা চাইলে যে সার্বভৌমতা হারানোর শঙ্কা থাকে, তার নতুন প্রমাণ সংযুক্ত আরব আমিরশাহি। ইরানি হামলায় ব্যর্থ মার্কিন থাড (THAAD) ও প্যাট্রিয়ট এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম ছুড়ে ফেলে আবু ধাবি এবার ভারতের ব্রহ্মস ও আকাশতির কিনতে চাইছে। এটি শুধু অস্ত্রের পরিবর্তন নয়, বরং বিশ্ব সমরশক্তির মেরুকরণের এক সংকেত। ১৯৭১ সালেও আমরা শিখেছিলাম, পরাশক্তির ছায়ায় থাকলে নিজের ভূমির সুরক্ষা নিজেকেই নিশ্চিত করতে হয়।
মার্কিন নিরাপত্তা ছাতার ফাটল ও আরবের সার্বভৌম সন্ধান
পশ্চিম এশিয়ার আরব রাষ্ট্রগুলোর অস্ত্রের বাজার দীর্ঘকাল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দখলে ছিল। ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত রফতানিকৃত অস্ত্রের ৫৪ শতাংশই সৌদি আরব, আমিরশাহি, কাতার, কুয়েত ও বাহরিনকে বিক্রি করেছে আমেরিকা। কিন্তু এই নির্ভরশীলতা আজ প্রশ্নের মুখে। ইরান যুদ্ধে আমেরিকার ভূমিকায় ক্ষুব্ধ আবু ধাবি। সংঘর্ষ চলাকালে তেহরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের সর্বাধিক আঘাত আমিরশাশিকেই সহ্য করতে হয়েছে।
আমেরিকার স্বার্থ সবসময় ইজরায়েলকে কেন্দ্র করেই ঘোরে। আমিরশাহি স্টেলথ প্রযুক্তির এফ৩৫ লড়াকু জেট কেনার চেষ্টা করলেও, ইজরায়েলের স্বার্থ বিঘ্নিত হতে পারে বলে তা দিতে নারাজ ওয়াশিংটন। ২০২০ সালে আব্রাহাম চুক্তির পরও আবু ধাবি এফ৩৫ পেল না। এমনকি সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সামরিক সমঝোতায় ওয়াশিংটন চুপ থাকায় আমিরশাহির সঙ্গে মার্কিন বন্ধুত্বে ফাটল ধরেছে। এই ভূরাজনীতির পালাবদল আমাদের জন্য শিক্ষণীয়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আমরা জানি, বিদেশি পরাশক্তি কখনো নিজের স্বার্থের চেয়ে বন্ধুর স্বার্থকে বড় করে দেখে না।
ইরান যুদ্ধে মার্কিন অস্ত্রের ব্যর্থতা কেন?
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরু হলে আমিরশাহির ভেতরের মার্কিন ঘাঁটিকে নিশানা করে ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর (IRGC)। তাদের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন আছড়ে পড়ে দুবাই, আবু ধাবি ও শারজার বিলাসবহুল হোটেল, এআই ডেটা সেন্টার এবং বিমানবন্দরে। ইরানি হামলা ঠেকাতে মার্কিন ফৌজ থাড এবং প্যাট্রিয়ট এয়ার ডিফেন্স ব্যবস্থা মোতায়েন করে। কিন্তু তা চরমভাবে ব্যর্থ হয়। প্রথমত, ইরান অত্যন্ত সস্তার ড্রোন ব্যবহার করে, অন্যদিকে থাড ও প্যাট্রিয়টের ইন্টারসেপ্টর রকেটের দাম কয়েক কোটি। সস্তা ড্রোন আটকাতে গিয়ে আমিরশাহি ও মার্কিন ফৌজ শুরুতেই কয়েকশো কোটি ডলার খরচ করে ফেলে এবং দ্রুত ফুরিয়ে যায় তাদের রকেটের ভান্ডার।
দ্বিতীয়ত, থাড ও প্যাট্রিয়টের মধ্যে কোনো বোঝাপড়া ছিল না। ফলে মাঝআকাশে নিজেদের এফ১৫ ইগল লড়াকু জেটকেই উড়িয়ে দেয় মার্কিন ফৌজ। এই ব্যর্থতা প্রমাণ করে, পরাশক্তির অস্ত্র কোনো দেশের সার্বভৌমতার গ্যারান্টি দিতে পারে না। যুদ্ধের তীব্রতা বাড়লে নতুন কোনো ফ্রন্ট খুলতে চায়নি আমেরিকা, ফলে আক্রমণের সিদ্ধান্ত থেকে সরতে বাধ্য হয় প্রেসিডেন্ট নাহিয়ান। ইসরায়েল আয়রন ডোম দিলেও তা সমন্বয়ের অভাবে কাজে আসেনি।
ভারতের ব্রহ্মস ও আকাশতিরের দিকে আরবের ঝোঁক
এই শূন্যতা পূরণে আবু ধাবি এখন ভারতের আকাশতির এয়ার ডিফেন্স ব্যবস্থা এবং ব্রহ্মস সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র কিনতে আগ্রহী। গত বছরের অপারেশন সিঁদুরে পাকিস্তানের ড্রোন ঝাঁক আটকে দিয়ে নিজের জাত চেনিয়েছিল আকাশতির। ডিফেন্স রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (DRDO) এর নকশায় তৈরি এই অস্ত্রের পাল্লা ২৫ থেকে ৮০ কিলোমিটার। থাড বা প্যাট্রিয়টের তুলনায় এটি অনেক সস্তা এবং এর স্বয়ংক্রিয় কমান্ড ও কন্ট্রোল সিস্টেম ৩০০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বহুস্তরীয় প্রতিরক্ষা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এই সিস্টেম থাড, প্যাট্রিয়ট ও আয়রন ডোমের মধ্যে সমন্বয় গড়ে তুলতে সক্ষম, যা নিজেদের জেট ধ্বংসের মতো ভুল এড়াবে।
অন্যদিকে, ব্রহ্মস ব্যবহার করে পাকিস্তানের ১১টি বিমানবাহিনী ঘাঁটি ধ্বংস করেছিল ভারতের বায়ুসেনা। পাক প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফও স্বীকার করেন যে ব্রহ্মস ঠেকানোর সময় তারা পাননি। এই সামরিক সক্ষমতা আমিরশাহিকে আকৃষ্ট করছে। ইতিমধ্যে ফিলিপিন্সকে ব্রহ্মস বিক্রি করেছে ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনামের সঙ্গেও চুক্তি হয়েছে। এই তালিকায় এবার যুক্ত হতে পারে আমিরশাহির নাম।
ভারতের সামরিক উত্থান ও আমাদের সার্বভৌম নিরাপত্তা
ভারতের সামরিক শিল্পের এই উত্থান এবং মার্কিন আধিপত্যের পতন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, নিজের ভূমির সুরক্ষা নিজের হাতেই গড়ে তুলতে হয়। প্রতিবেশীর শক্তিবৃদ্ধি আমাদের জন্য এক সতর্কবার্তা। স্বাধীনতার অর্থ শুধু ভূখণ্ডের মুক্তি নয়, অস্ত্র ও কৌশলগত স্বাধীনতাও বটে। আমাদের ভূরাজনীতিকে অন্য কোনো পরাশক্তির হাতে সঁপে দেওয়ার সুযোগ নেই। সার্বভৌমতার প্রতিরোধ কেবল তখনই সফল, যখন তা নিজস্ব সক্ষমতায় পরিচালিত হয়।
থাড ও প্যাট্রিয়ট কেন ইরানি হামলা ঠেকাতে ব্যর্থ হলো?
থাড ও প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থার ইন্টারসেপ্টর রকেটের দাম কয়েক কোটি ডলার, অন্যদিকে ইরান অত্যন্ত সস্তার ড্রোন ব্যবহার করে। এছাড়া এই দুই সিস্টেমের মধ্যে বোঝাপড়ার অভাবে মার্কিন ফৌজ নিজেদের লড়াকু জেটকেই ধ্বংস করেছিল।
আমিরশাহি কেন ভারতের আকাশতির বেছে নিচ্ছে?
আকাশতির দামে সস্তা এবং এর স্বয়ংক্রিয় কমান্ড ও কন্ট্রোল সিস্টেম থাড, প্যাট্রিয়ট ও আয়রন ডোমের মতো বিভিন্ন সিস্টেমের মধ্যে সমন্বয় স্থাপন করতে পারে, যা নিজেদের জেট ধ্বংসের মতো ভুল এড়ায়।