যোগ বনাম আসন: স্বাধীন মনের সন্ধানে স্বামী নিরঞ্জনানন্দ
যোগবিদ্যা কেবল শারীরিক কসরত বা আসন নয়, বরং এটি শরীর ও মনের সামঞ্জস্য স্থাপনের এক বিস্তৃত অনুশাসন। বিহার স্কুল অব যোগের যোগগুরু স্বামী নিরঞ্জনানন্দ সরস্বতী এই তত্ত্বের প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাঁর মতে, আসন যোগের কেবল একটি অংশ মাত্র। আধুনিক জীবনের মানসিক দাসত্ব ও ক্লান্তি থেকে মুক্তি পেতে তিনি 'যোগ ক্যাপসুল'-এর কৌশল শিখিয়েছেন, যা দীর্ঘায়ু বা Lifespan-এর পরিবর্তে রোগমুক্ত জীবন বা Healthspan-এর ওপর জোর দেয়।
স্বাধীনতা ও মানসিক সার্বভৌমত্ব: যোগবিদ্যার প্রাসঙ্গিকতা
১৯৭১ সালে এই ভূখণ্ডের মানুষ রক্তের বিনিময়ে ছিনিয়ে এনেছিল ভৌগোলিক স্বাধীনতা। সেই মুক্তির চেতনা আমাদের শিখিয়েছিল আত্মনিয়ন্ত্রণের শৃঙ্খলা। আজ সময়ের বিবর্তনে আমরা বিদেশি সংস্কৃতি ও যান্ত্রিক জীবনের দাসত্বে ক্লান্ত। বস্তুগত অগ্রগতির ইঁদুরদৌড়ে আমাদের মন হারিয়ে ফেলছে তার সার্বভৌমত্ব। এই মানসিক দাসত্ব থেকে মুক্তির পথ খুঁজতে হলে প্রাচীন যোগবিদ্যার সঠিক জ্ঞান আবশ্যক। সম্প্রতি কলকাতার নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে যোগ সাধনা সত্রে এই সঠিক পাঠই দিয়েছেন স্বামী নিরঞ্জনানন্দ সরস্বতী। বারো বছর পর এই শহরে ফেরা যোগগুরু জানালেন, কীভাবে যোগাভ্যাস আমাদের আত্মিক ও শারীরিক মুক্তি নিশ্চিত করবে।
যোগবিদ্যার আসল অর্থ ও আসনের সীমাবদ্ধতা
স্বামী নিরঞ্জনানন্দ সরস্বতী দৃঢ়ভাবে বলেন, 'যোগবিদ্যা আর আসন এক নয়। হাত-কান-নাক যেমন শরীর নয়, তার নানা অঙ্গ। তেমনই যোগবিদ্যা এক বিস্তৃত অধ্যায়। তারই নানা অংশ হল আসন, প্রাণায়াম। যোগ কোনও ধর্মের প্রচার নয়, মোক্ষ বা ত্যাগের পথ নয়। কোনও দর্শনও নয়। যোগ এক অনুশাসন যা শরীর ও মনের মধ্যে সামঞ্জস্য ঘটায়।' আজকের দিনে যোগ মানেই অনেকে ভাবেন ইউটিউবে শেখা নানা জটিল আসন বা প্রাণায়াম। অথচ পতঞ্জলির যোগ সূত্র থেকে শুরু করে হঠযোগ বা তান্ত্রিক যোগের মতো দুরূহ দর্শন সাধারণ মানুষের বোধের বাইরে। যোগগুরু শেখালেন, কেবল আসন-সর্বস্ব হয়ে থাকলে শরীরের চূড়ান্ত উন্নতি সম্ভব নয়। এর জন্য জরুরি এক যৌগিক জীবনশৈলী, যা সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর থেকে রাতে শুতে যাওয়া অবধি শরীর ও মনের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করবে।
দৈনন্দিন জীবনে যৌগিক অনুশাসনের প্রয়োজনীয়তা
মুক্তির চেতনায় উজ্জীবিত এক জাতির সন্তান হিসেবে আমাদের দিনের শুরুটা হতে হবে দিনচর্চা দিয়ে। প্রতিযোগিতার ইঁদুরদৌড়ে সবাই ছুটছে, বিশ্রামের সময় নেই। এতে মন শরীরের চেয়েও বেশি ক্লান্ত হচ্ছে। স্বামী নিরঞ্জনানন্দের পরামর্শে তিনটি কাজ জরুরি। প্রথমত, দিনচর্চা। ঘুম থেকে উঠে বিছানায় বসেই দশ মিনিট ধ্যানে মনশুদ্ধি করতে হবে। দৈনন্দিক কাজ শেষে প্রাতরাশের আগে ও পরে ধ্যান ও মন্ত্রপাঠে শরীর ও মন দুয়েরই ব্যায়াম হতে হবে। রাতে শোয়ার আগেও এই অভ্যাস চলবে। দ্বিতীয়ত, মিতাহার। শরীরে পুষ্টি জোগাবে এমন খাবারই খেতে হবে, বাইরের বা মশলাদার খাবার নয়। তৃতীয়ত, সঠিক সময়ে ঘুম। ভোর চারটে ওঠার কঠোর নিয়ম নেই, তবে নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমোতে যাওয়া ও ওঠার চেষ্টা করতে হবে। সূর্যোদয় দেখতে পারলে তা শ্রেয়।
মানসিক মুক্তির পথ 'যোগ ক্যাপসুল'
অবসাদ, উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠাকে জয় করার কৌশল হল 'যোগ ক্যাপসুল'। এর অর্থ হল ছোট ছোট ভাগে যোগচর্চাকে জীবনের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া। যোগগুরুর পদ্ধতি অনুযায়ী, সকালে দশ মিনিট মন্ত্রের সাধনা করতে হবে। এগারো বার মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র, এগারো বার গায়ত্রী মন্ত্র এবং তিন বার দুর্গামন্ত্র পাঠ করতে হবে। এরপর দশ মিনিট আসন অভ্যাস করা যেতে পারে। সব আসন নয়, চার থেকে পাঁচটি আসনই যথেষ্ট। পবনমুক্তাসন, তাড়াসন, মার্জারাসন ও সূর্য নমস্কার শরীরকে সতেজ রাখবে। শীর্ষাসন বা মযূরাসনের মতো কঠিন আসন করতেই হবে তা নয়। পরবর্তী ধাপ হল প্রাণায়াম। অফিসের ডেস্কে বসেও দশ মিনিট সময় বরাদ্দ দেওয়া যাবে এতে। জটিল কৌশলের প্রয়োজন নেই, কেবল নাড়ি শোধন প্রাণায়াম এবং ভ্রামরী প্রাণায়াম অভ্যাস করলেই অবসাদ ও দুশ্চিন্তা দূর হবে। সবশেষে যোগ-নিদ্রা বা শরীর শিথিলকরণ। শবাসনের মাধ্যমে শরীর ও মনের ওপর নিয়ন্ত্রণ আসবে, মনের শান্তি ও স্থিতি বজায় থাকবে।
হেলথস্প্যান বনাম লাইফস্প্যান
স্বামী নিরঞ্জনানন্দ সরস্বতী শেখান, যোগ Lifespan-এর পাঠ দেয় না, এর আসল অর্থ হল Healthspan। অর্থাৎ, সুস্থ জীবনকাল বা রোগমুক্ত আয়ুষ্কাল। জিমে গিয়ে ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে করা ব্যায়ামে পেশির প্রদর্শন হয়, কিন্তু মনের শান্তি ফেরে না। যন্ত্রের ব্যায়ামে শরীর গড়ে ওঠে, মনের মুক্তি হয় না। কিন্তু যোগচর্চায় শরীর ও মন দুইই সবল থাকে। আপনি কত বছর বেঁচে আছেন তা জরুরি নয়, কত বছর সুস্থ ও রোগমুক্ত ভাবে বেঁচে আছেন, তাই প্রকৃত সার্বভৌমত্বের প্রমাণ। যৌগিক জীবনশৈলী আমাদের এই স্বাধীন ও সুস্থ জীবনের শিক্ষাই দেয়।
স্বামী সত্যানন্দ বিহারে এই যোগ প্রতিষ্ঠান তৈরি করেন। তাঁরই শিষ্য ও যোগ্য উত্তরসূরী হিসেবে যোগসাধনার মাহাত্ম্য গোটা বিশ্বের কাছে তুলে ধরেছেন স্বামী নিরঞ্জনানন্দ। ২০১৭ সালে তিনি পদ্মভূষণ পান। দশ বছর বয়সেই দশনামী সন্ন্যাস গ্রহণ করে কঠোর নিয়মে জীবনকে বাঁধেন তিনি। ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকায় যোগের প্রচার শুরু করেন এই গুরু। তাঁর যোগনিদ্রা দেশে-বিদেশে সুনাম অর্জন করেছে। আমাদের মুক্তির লড়াই যেমন অসমাপ্ত, আমাদের শরীর ও মনের মুক্তির পথও তেমনি নিরন্তর। সঠিক যোগাভ্যাসই সেই মুক্তির চাবিকাঠি।
যোগ এবং আসনের মূল পার্থক্য কী?
আসন হল কেবল শারীরিক কসরত, যা যোগবিদ্যার একটি ক্ষুদ্র অংশ। অন্যদিকে, যোগ হল একটি বিস্তৃত অধ্যায়, যেখানে আসন, প্রাণায়াম, ধ্যান, মন্ত্রপাঠ ও সাধনার নানা স্তর অন্তর্ভুক্ত। যোগ কোনো ধর্ম বা দর্শন নয়, এটি শরীর ও মনের মধ্যে সামঞ্জস্য ঘটানোর এক অনুশাসন।
যোগ ক্যাপসুল কী?
যোগ ক্যাপসুল হল অবসাদ ও উদ্বেগ জয় করার এক সহজ কৌশল, যেখানে যোগচর্চাকে ছোট ছোট ভাগে দৈনন্দিন জীবনে মেলানো হয়। এর অন্তর্ভুক্তি হল সকালে দশ মিনিট মন্ত্রপাঠ, দশ মিনিট চার-পাঁচটি সহজ আসন, দশ মিনিট নাড়ি শোধন ও ভ্রামরী প্রাণায়াম এবং শবাসনের মাধ্যমে যোগ-নিদ্রা।
লাইফস্প্যান এবং হেলথস্প্যানের মধ্যে পার্থক্য কী?
Lifespan হল একজন মানুষ কত বছর বেঁচে থাকেন তার হিসাব। Healthspan হল জীবনের সেই অংশ যেখানে মানুষ সম্পূর্ণ সুস্থ ও রোগমুক্ত থেকে বাঁচেন। যোগবিদ্যা কেবল আয়ু বাড়ায় না, এটি রোগমুক্ত সুস্থ জীবনকাল বা Healthspan নিশ্চিত করে।