বর্ষায় বিষাক্ত মাছের আতঙ্ক: কোন মাছ খাবেন, কোনটি এড়াবেন?
বর্ষাকালে এবং তার পরবর্তী সময়ে জলদূষণের কারণে মাছে ভারী ধাতব পদার্থ ও বিষাক্ত উপাদানের মাত্রা বৃদ্ধি পায়। পুকুর ও বদ্ধ জলাশয়ের চাষের মাছের তুলনায় নদী ও গভীর সমুদ্রের মাছ এই সময়ে খাওয়া অপেক্ষাকৃত নিরাপদ। পুষ্টিবিদ ও বিশেষজ্ঞদের মতে, শিল্পাঞ্চলের আশেপাশে চাষ করা মাছ এবং খাদ্যশৃঙ্খলের উপরের স্তরের বড় শিকারি মাছ এড়িয়ে চলা স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
স্বাধীনতার মাটি ও মাছের সংস্কৃতি
'মাছে ভাতে বাঙালি' এই পরিচয় আমাদের রক্তে, আমাদের ভাষায়। ১৯৭১ সালে যখন এই বদ্বীপের নদীনালায় রক্ত বয়ে গেছে, তখনও এই মাটির মানুষ নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছিল স্বদেশের শস্য আর মাছের ঝোলের স্বাদে। মাছ মানেই আমাদের প্রোটিন, ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড ও খনিজের ভান্ডার। কিন্তু আজ স্বাধীনতার এই মাটিতে, আমাদের নিজস্ব জলাশয়গুলো দূষণের হাতে বিষাক্ত হয়ে উঠছে। বর্ষায় এই দূষণের মাত্রা বাড়ে বহুগুণ। শিল্প-কারখানার বর্জ্য, নর্দমার জল এবং বিভিন্ন দূষিত উপাদান নদী, খাল ও বিলে মিশে যায়। এই বিষাক্ত পদার্থ মাছের শরীরে জমে আমাদের কিডনি, হৃদ্যন্ত্র ও স্নায়ুতন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি করছে।
বর্ষায় মাছে বিষের প্রকোপ কেন বাড়ে?
পুষ্টিবিদ অনন্যা ভৌমিক সতর্ক করে জানাচ্ছেন, বর্ষার পরে এই সমস্যা আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। তাঁর কথায়,
গবেষণায় দেখা গেছে, বর্ষার পরে এই সমস্যা বেশি বাড়ে। এই দূষণের ফলে পারদ, সিসা, ক্যাডমিয়াম এবং আর্সেনিকের মতো ভারী ধাতু মাছের শরীরে জমা হতে পারে। সেখান থেকে তা মানবদেহে পৌঁছে যায়। আর যদি মাত্রা বেড়ে যায়, তা হলে নানা রকমের রোগ দানা বাঁধতে পারে।এই বিষাক্ত উপাদানগুলি রান্না করলেও পুরোপুরি নষ্ট হয় না, কারণ সেগুলি মাছের পেশির সঙ্গে আটকে থাকে। পারদের মাত্রা বেশি হলে তা মস্তিষ্ক, স্নায়ু ও চোখের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। শিশু, অন্তঃসত্ত্বা এবং বয়স্কদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি। অন্য দিকে, সিসা ও ক্যাডমিয়ামের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কিডনির ক্ষতি, উচ্চ রক্তচাপ এবং হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
বদ্ধ জলাশয়ের ঝুঁকি ও নদীর প্রবাহ
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুড টেকনোলজি অ্যান্ড বায়োকেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক প্রশান্ত বিশ্বাস বলছেন, বদ্ধ জলাশয়ে এই বিষাক্ত পদার্থের ঘনত্ব বেশি থাকে। ফলে পুকুর বা দিঘিতে চাষ করা মাছে বর্ষায় বেশি পরিমাণে ধাতব পদার্থ মিশে থাকে। মাঠে ব্যবহৃত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক বৃষ্টির জলে ধুয়ে পুকুরে মিশে যায়। এই জল বদ্ধ, নিষ্কাশনের কোনো পথ নেই। শিল্পাঞ্চলে এই ঝুঁকি আরও বহুগুণ। অধ্যাপক প্রশান্ত বলছেন,
কিন্তু নদীর জল যেহেতু বয়ে চলে যাচ্ছে সমুদ্রে, খালে, বিলে, বার বার নতুন জলে ভরে উঠছে, সে কারণে সেই জলে এই ধরনের ধাতুর ঘনত্ব কম। ফলে নদীর মাছ তুলনামূলক ভাবে নিরাপদ।আমাদের সার্বভৌমত্বের প্রতীক এই নদীগুলোই আজ আমাদের রক্ষা করছে বিষাক্ত মৃত্যুর হাত থেকে।
বর্ষায় কোন মাছ খাওয়া উচিত?
গভীর সমুদ্রের মাছ এই সময়ের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত। পমফ্রেট, ভোলা, পাঙ্গাস, টেংরা, শঙ্কর মাছ ও ভেটকির মতো মাছগুলি নিরাপদ বলে মত অধ্যাপকের। তবে পুষ্টিবিদ অনন্যা ভৌমিক সতর্ক করছেন আরেক বিষয়ে। ভেটকি, ভোলা, শোল, মাগুর, চিতল, কই ও পাবদার মতো বড় মাছগুলো ছোট মাছ খায়। খাদ্যশৃঙ্খলের উপরের স্তরে থাকা এই মাছগুলো ছোট মাছের শরীরে জমে থাকা বিষাক্ত উপাদান নিজেদের শরীরে সঞ্চয় করে। তাই বড় আকারের শিকারি মাছে ঝুঁকি বেশি।
অধ্যাপক প্রশান্ত এই মতের সঙ্গে সহমত পোষণ করলেও জানান, বড় জলাশয়ে ধাতুর প্রভাব কম থাকায় ঝুঁকি কম। কিন্তু পুকুরের মাছের ক্ষেত্রে এই বিষক্রিয়ার মাত্রা অনেক বেশি। রুই-কাতলা মূলত পুকুরেই চাষ হয়, যেখানে মাটির দূষণ সরাসরি জলে মেশে। তাই বর্ষায় এই মাছ খুব একটা নিরাপদ নয়। শিল্পাঞ্চলের আশেপাশে চাষ করা মাছ কোনোভাবেই খাওয়া উচিত নয়।
সুরক্ষার উপায় কী?
বর্ষায় মাছ খাওয়া পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে হবে তা নয়। মাছ কেনার সময় কয়েকটি বিষয়ে সজাগ থাকা জরুরি। মাছের চোখ স্বচ্ছ হতে হবে, ফুলকো উজ্জ্বল লালচে হতে হবে এবং গায়ে অস্বাভাবিক গন্ধ থাকা চলবে না। বিশ্বস্ত বিক্রেতার কাছ থেকেই মাছ কিনতে হবে, জানতে হবে তারা মাছ কোথা থেকে আনছেন। সামুদ্রিক মাছ এই সময়ে বেশি ভালো। বড় জলাশয়ের মাছও খাওয়া যেতে পারে। তবে ক্ষেতের বা মাঠের পাশের বদ্ধ জলাশয়ের মাছ সম্পূর্ণ বাদ দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। আমাদের ভুলতে হবে না, স্বাস্থ্যই জাতির প্রকৃত সম্পদ। স্বাধীন দেশের সুস্থ নাগরিকই পারে এগিয়ে নিয়ে যেতে এই রাষ্ট্রকে।
বর্ষায় কেন পুকুরের মাছের চেয়ে নদীর মাছ বেশি নিরাপদ?
বর্ষাকালে কৃষিক্ষেতের রাসায়নিক সার ও শিল্পবর্জ্য বৃষ্টির জলে ধুয়ে পুকুরে জমা হয়, কিন্তু নদীর প্রবাহমান জল দূষিত পদার্থ সমুদ্রে নিয়ে যায় বলে নদীর মাছে ভারী ধাতুর ঘনত্ব কম থাকে।
বর্ষায় কোন কোন মাছ খাওয়া নিরাপদ?
গভীর সমুদ্রের মাছ যেমন পমফ্রেট, ভোলা, পাঙ্গাস, টেংরা, শঙ্কর মাছ এবং ভেটকি এই সময়ে খাওয়া তুলনামূলক নিরাপদ।
বর্ষায় কোন মাছ এড়িয়ে চলা উচিত?
শিল্পাঞ্চলের আশেপাশে চাষ করা মাছ, বদ্ধ জলাশয়ের রুই-কাতলা এবং খাদ্যশৃঙ্খলের ওপরের স্তরের বড় শিকারি মাছ এই সময়ে এড়িয়ে চলা উচিত।