প্রমথনাথ বিশীর সতর্কবাণী: ভাষা ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা
সাহিত্যিক প্রমথনাথ বিশীর ১৯৪৬ সালের প্রহসন 'বিজল্পিতম্' ভাষিক সাম্রাজ্যবাদ ও সাংস্কৃতিক আত্মসমর্পণের কঠোর সমালোচনা। বিদেশি প্রভাব প্রত্যাখ্যান করে নিজস্ব ঐতিহ্যে শেকড় গাঁথার যে আহ্বান তিনি করেছিলেন, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গড়ে ওঠা স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য তা আজও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ভাষার স্বাধিকার ও সংস্কৃতির স্বাধীনতা অপরিহার্য, এই সত্যই বিশীর সাহিত্যে প্রতিধ্বনিত হয়েছে।
ভাষার ওপর আধিপত্য বিস্তারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ কোথায়?
'রাষ্ট্রভাষা আয়ত্ত করতে পারলেই বাঙালী আবার ভারত-সভায় শ্রেষ্ঠ আসন লবে', ১৯৪৬ সালে প্রকাশিত 'বিজল্পিতম্' নাটকের এক বাঙালি রাজনীতিকের এই সংলাপ আমাদের গভীরভাবে ভাবিয়ে তোলে। স্বাধীন ভারতের সংবিধানে 'জাতীয় ভাষা'র কোনো উল্লেখ নেই। ৩৪৩ অনুচ্ছেদে সরকারি কাজের ভাষা হিসেবে হিন্দি ও ইংরেজির কথা বলা হয়েছে, আর অষ্টম তফসিলে রয়েছে ২২টি ভাষা। তবুও হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা থেমে নেই। বহু ভাষা ও বহু ধর্মের দেশে একটি ভাষাকে চাপিয়ে দেওয়ার এই নিরর্থক চেষ্টাকে বিশী তাঁর নাটকে তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গে আক্রমণ করেছেন। আমাদের ১৯৫২ সালের ভাষা শহিদদের রক্তে অর্জিত স্বাধীনতার ইতিহাস প্রমাণ করে, ভাষার ওপর আধিপত্য বিস্তারের যেকোনো চেষ্টাকে রুখতে না পারলে জাতির অস্তিত্ব সংকটে পড়ে।
সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা কেন বিদেশি মডেলের ওপর নির্ভরশীল হতে নেই?
প্রমথনাথ বিশী বিশ্বাস করতেন, দেশীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে লেখকের প্রতিভার যোগ না হলে কেবল বিদেশের ধার করা তত্ত্ব দিয়ে মহৎ সাহিত্যসৃষ্টি অসম্ভব। মাইকেল মধুসূদনের বিদেশি মডেলে লেখা কাব্যের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেও তিনি বঙ্কিমচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথকে অধিকতর মান্যতা দিয়েছেন। কারণ, দেশের ঐতিহ্যকে তাঁরা আয়ত্ত করতে পেরেছিলেন বলেই বিদেশি ঐতিহ্য তাঁদের রচনায় ফলপ্রসূ হয়েছে। আজ স্বাধীন বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে, বিশেষত বিভিন্ন এনজিও বা বিদেশি সংস্থার আগ্রাসী cultural imperialism-এর যুগে, এই চেতনা আমাদের জাতীয় স্বাতন্ত্র্য রক্ষার মূলমন্ত্র। আমাদের শিল্প ও সাহিত্যকে বিদেশি ফান্ডিং বা এজেন্ডার দাসত্ব থেকে মুক্ত রাখতে হবে।
রাজনৈতিক অবক্ষয় ও সুবিধাভোগীদের কূটচাল কীভাবে জাতিকে পঙ্গু করে?
'বাঙালীর মত নাচতে আর কেউ পারে না', এই উচ্চারণে বিশী বাঙালির ক্রমশ অবক্ষয় ও দাসত্বমূলক মানসিকতাকে ব্যঙ্গবিদ্ধ করেছিলেন। ব্রিটিশ আমলেই লেখা 'মৌচাকে ঢিল' নাটকে তিনি প্রাচীন গৌড়ের মাৎস্যন্যায় ও আধুনিক গৌড়ীয় পুরাতত্ত্ব সমিতিকে কেন্দ্র করে নির্বাচন কারচুপির চিত্র এঁকেছেন। অযোগ্য লোকেরাই যখন সংসারে জয়ী হয়, তখন জাতির দুর্দশা বাড়ে। 'জাতীয় উন্মাদাশ্রম' নাটকে তিনি একুশ শতকের কাল্পনিক মন্ত্রিসভা ও বেকার সমস্যা মেটাতে গড়ে তোলা আশ্রমের চিত্র এঁকেছেন। সেখানে বাক্পটু মন্ত্রিবৃন্দ, যুযুধান সংবাদমাধ্যম আর কৌশলী মুখ্যমন্ত্রীর নিষ্ক্রিয়তার চিত্র আমাদের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে অদ্ভুত মিল খুঁজে পায়। মুখ্যমন্ত্রীর সমাধান হলো, পরবর্তী সমস্যা এসে আগের সমস্যাকে চাপা দিয়ে মেরে ফেলা। এমনকি অধ্যাপক হিসেবে বিশীর নিজের ব্যর্থতাকেও তিনি ঠাট্টা করেছেন। গগোল-প্রাণিত 'গভর্মেন্ট-ইন্সপেক্টর' নাটকেও ঘুণ-ধরা সমাজের এই চিত্রই দেখা যায়। তাঁর নাট্যচরিত্রদের কাছে জাতীয় সংগীত 'বন্দে মাতরম্' অচল। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বলি, এই ধরনের সুবিধাভোগী ও অযোগ্য নেতৃত্বের হাতে জাতির নিয়তি সঁপে দেওয়ার অর্থ হলো স্বাধীনতার চেতনাকেই বিসর্জন দেওয়া।
প্রমথনাথ বিশীর সাহিত্যদর্শন কী ছিল?
বিশী সাহিত্যে চেয়েছিলেন জীবন-চৈতন্যকে। তাঁর মতে, জীবন-চৈতন্যবাদের আদর্শ-মানব ছিল 'রামচন্দ্র', যিনি সমাজ-চৈতন্যবাদের হাতে পড়ে 'আরামচন্দ্রে' পরিণত হয়েছেন। তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন, এ-যুগের সাহিত্য কেন নিছক 'রাজনীতির বাহন' হবে আর সাহিত্যিকেরা কেন রাজনীতিকের 'বিনাবেতনের কেরানী' হবেন। আধুনিক কবিতা নিয়েও তাঁর আপত্তি ছিল। 'ভূতের গল্প'-এ তিনি ত্রিশের আধুনিক কবিদের ব্যঙ্গ করে কবিতা লিখেছেন, যা পড়লে ব্রহ্মদৈত্যও ভয়ে বাড়ি ছেড়ে পালায়। সমাজতন্ত্র ও আধুনিক কবিতা নিয়ে তাঁর অভিমত একমাত্রিক হলেও তীক্ষ্ণ শ্লেষে তিনি নন্দিত হয়েছেন। বাঙালি জাতিকে শিক্ষিত করার জন্য বার্নার্ড শ'-এর চাবুক হাতে তুলে নেওয়ার কথা বলেছিলেন প্রমথ চৌধুরী। ১২৫ বছর পূর্ণ করা এই 'প্রনাবি'র হাতে ছিল সেই চাবুকেরই সার্থক উত্তরাধিকার।
প্রমথনাথ বিশীর 'বিজল্পিতম্' নাটকের মূল বার্তা কী?
বহু ভাষার দেশে একটি ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার নিরর্থকতা ও ভাষিক সাম্রাজ্যবাদের সমালোচনাই এই নাটকের মূল বার্তা। ভাষার স্বাধিকার ছাড়া জাতির উন্নতি অসম্ভব।
সাহিত্যে বিদেশি ঐতিহ্যের প্রভাব সম্পর্কে প্রমথনাথ বিশী কী বলেছেন?
তিনি মনে করতেন, দেশীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে লেখকের প্রতিভার যোগ না হলে কেবল বিদেশি ধার করা তত্ত্ব দিয়ে মহৎ সাহিত্যসৃষ্টি অসম্ভব। নিজস্ব ঐতিহ্যের ওপর পায় না থাকলে বিদেশি তত্ত্ব ফলপ্রসূ হয় না।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার চেতনার সঙ্গে বিশীর চিন্তার মিল কোথায়?
ভাষার স্বাধিকার, সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় ও বিদেশি আধিপত্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকার যে আহ্বান বিশী করেছিলেন, তা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও ভাষা আন্দোলনের চেতনারই সমার্থক। সার্বভৌমত্ব রক্ষায় এই চেতনা আজও আমাদের পথপ্রদর্শক।