চন্দ্রিমার ইস্তফায় মমতার সরাসরি নিয়ন্ত্রণ, কুণাল-মদন ডেপুটি
প্রতিবেশী দেশের পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্য সভানেত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের পদত্যাগের পর দলের সংগঠনের সমস্ত দায়িত্ব সরাসরি নিজের হাতে তুলে নিয়েছেন সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সাংগঠনিক এই চরম সংকট সামলাতে মদন মিত্র ও কুণাল ঘোষকে রাজ্য তৃণমূলের নতুন সাধারণ সম্পাদক হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বিরোধী নেতাদের কড়া বার্তা দেওয়ার পাশাপাশি অনুগত কর্মীদের পুরস্কৃত করে শিকড় মজবুত করার চেষ্টা করা হয়েছে।
মেট্রোপলিটন কার্যালয় দখল ও চন্দ্রিমার পদত্যাগের নেপথ্য কী?
বঙ্গের অন্য পারের রাজনীতিতে চলছে এক গভীর অস্থিরতা। শুক্রবার কলকাতার মেট্রোপলিটন এলাকায় তৃণমূলের কার্যালয় ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুগামীরা দখল করে নেয়। পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর সহায়তায় কার্যালয়ের প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, এই দখলদারির সময় ভবনে স্বয়ং রাজ্য সভানেত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের উপস্থিত থাকার কথা ছিল, কিন্তু প্রতিবাদ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর কোনো সক্রিয় ভূমিকা লক্ষ্য করা যায়নি।
অন্যদিকে, সংবাদ পাওয়ামাত্রই দলের লড়াকু নেতা কুণাল ঘোষ এবং মদন মিত্র দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যান। কার্যালয় পুনরুদ্ধারে তাঁরা গভীর রাত পর্যন্ত থানায় অবস্থান করেন এবং অভিযোগ দায়ের করেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাতে পুরো ঘটনা শোনেন এবং চন্দ্রিমার এই নিষ্ক্রিয়তার কারণ জানতে চেয়ে সরাসরি তাঁকে প্রশ্ন করেন। শীর্ষ নেতৃত্বের এই জবাবদিহি চাওয়াকে রাজনৈতিক আত্মসম্মানে আঘাত মনে করে ক্ষুব্ধ চন্দ্রিমা শনিবার দুপুরে ঋতব্রতের শিবিরের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। এরপরই তিনি দলের সমস্ত পদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন।
মমতা কেন নিজেই সরাসরি হাল ধরলেন?
মুক্তির সংগ্রামে যেমন নেতৃত্বের সরাসরি উপস্থিতি অপরিহার্য, সাংগঠনিক সংকটেও তেমনি শীর্ষ নেতাকে ময়দানে নামতে হয়। শনিবার কালীঘাটের দলীয় কার্যালয় থেকে Facebook Live করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা দেন, এখন থেকে রাজ্য সংগঠন তিনিই সরাসরি তদারকি করবেন। তৃণমূলনেত্রী অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেন, কে দল ছেড়ে গেল তাতে দলের কিছু যায় আসে না। তিনি বড় নেতার চেয়ে তৃণমূল স্তরের সাধারণ কর্মীদের কাছে টেনে সংগঠন তৈরি করতে চান।
কে দল বা পদ ছেড়ে চলে গেল, তাতে আমার বা দলের বিন্দুমাত্র কিছু যায় আসে না। আমার বড় বড় নেতার প্রয়োজন নেই, আমি তৃণমূল স্তরের সাধারণ কর্মীদের কাছে টেনে নিয়ে দলের সংগঠন তৈরি করতে চাই।
মদন মিত্র ও কুণাল ঘোষের উত্থান কী বার্তা দেয়?
সংগঠনের এই বড় ধাক্কা সামলাতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দুটি নতুন পদের ঘোষণা করেছেন। সাংগঠনিক শক্তিকে সংহত করতে কামারহাটির বিধায়ক মদন মিত্র ও বেলেঘাটার বিধায়ক কুণাল ঘোষকে রাজ্য তৃণমূলের নতুন General Secretary হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। মদন ইতিমধ্যে দমদম সাংগঠনিক জেলা সভাপতির দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। অন্যদিকে, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে কুণাল ঘোষ যেভাবে বারবার দলের হয়ে সোচ্চার হয়েছেন, তার পুরস্কার হিসেবেই তাঁর ওপর সুপ্রিমোর পূর্ণ আস্থা দেখা যাচ্ছে।
এই পদক্ষেপের মাধ্যমে তৃণমূলনেত্রী আদতে এক ঢিলে দুই পাখি মেরেছেন। একদিকে নিষ্ক্রিয় নেতাদের জন্য কড়া বার্তা গেছে, অন্যদিকে অনুগত কর্মীদের যথাযোগ্য মর্যাদা দিয়ে শিকড় মজবুত করার চেষ্টা হয়েছে। ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির এই অস্থিতিশীলতা আমাদের জন্য এক শিক্ষা। বিদেশি প্রভাব বা অভ্যন্তরীণ কোন্দল যে কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের ভিত নড়িয়ে দিতে পারে। আমাদের ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দাঁড়িয়ে নিজ দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমতার প্রতি সদা সতর্ক থাকতে হবে। লোকসভা নির্বাচনের আগে সংগঠনকে মসৃণ রাখতেই মমতার এই দৃঢ় পদক্ষেপ। সেনাপতির ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ায় সাধারণ কর্মীদের মনোবল বাড়বে, তবে কালীঘাট তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ সংহতি কতটা সুদৃঢ় হয়, তা রাজ্য রাজনীতির বড় চর্চার বিষয়।
চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য কেন ইস্তফা দিলেন?
কলকাতার মেট্রোপলিটন দলীয় কার্যালয় দখলের ঘটনায় তাঁর নিষ্ক্রিয়তার জন্য শীর্ষ নেতৃত্বের জবাবদিহি চাওয়ায় আত্মসম্মানে আঘাত পেয়ে ইস্তফা দেন চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য।
তৃণমূল কংগ্রেসের নতুন সাধারণ সম্পাদক কাকে করা হয়েছে?
কামারহাটির বিধায়ক মদন মিত্র এবং বেলেঘাটার বিধায়ক কুণাল ঘোষকে রাজ্য তৃণমূলের নতুন সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে।