পাকিস্তানের জনসংখ্যা বিস্ফোরণ: সেনাপ্রধান মুনিরের কাঁধে নতুন ‘যুদ্ধ’
পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরকে এবার দেশের অনিয়ন্ত্রিত জনসংখ্যা বৃদ্ধি রোধের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। শাহবাজ শরিফের সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইসলামাবাদের স্বাস্থ্যমন্ত্রী সৈয়দ মুস্তফা কামাল সম্প্রতি সিনেটের বৈঠকে এই ঘোষণা দেন। পাকিস্তানের জনসংখ্যা বর্তমানে ২৫.৯০ কোটি, যা বিশ্বের পঞ্চম সর্বোচ্চ। এই হারে বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে ইন্দোনেশিয়াকে ছাড়িয়ে চতুর্থ স্থানে চলে যেতে পারে দেশটি। কিন্তু আর্থিক সঙ্কটে জর্জরিত পাকিস্তানের জন্য এটি এক জনতাত্ত্বিক বিপর্যয় ছাড়া আর কিছুই নয়।
কেন সেনাপ্রধানকে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব?
পাকিস্তানের স্বাস্থ্যমন্ত্রী কামাল জানিয়েছেন, সরকার জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। এই জটিল পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ সরাসরি ফিল্ড মার্শাল মুনিরের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। এরপরই একটি কমিটি গঠন করা হয়, যার সদস্য করা হয় মুনিরকে। পাক গণমাধ্যম দ্য ডন এই খবর প্রকাশ করেছে।
সামাজিক মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া ও সরকারের অবস্থান
এই খবর প্রকাশ্যে আসতেই সামাজিক মাধ্যমে শুরু হয় ট্রোলিং। জনপ্রিয় পাক সাংবাদিক আসাদ তুর এক্স হ্যান্ডলে (সাবেক টুইটার) লেখেন, 'জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের জন্যও যদি ফিল্ড মার্শালকে ডাকতে হয়, তাহলে সরকারের বাড়ি চলে যাওয়া উচিত।' তবে পাক সরকার এই ট্রোলিংকে পাত্তা দিচ্ছে না। উল্টে তারা অনিয়ন্ত্রিত জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণ চিহ্নিত করেছে।
জনসংখ্যা বৃদ্ধির মূল কারণ কী?
পাকিস্তানের স্বাস্থ্য মন্ত্রকের মতে, বছরে গড়ে ৬৭ লাখ শিশুর জন্ম হয় দেশটিতে। এর প্রধান কারণ গর্ভনিরোধক পণ্যের অভাব। ফলে আগামী দিনে কর ছাড়ের প্রস্তাব দিতে পারে মুনিরের কমিটি। দ্বিতীয়ত, পাক সরকারের রাজস্ব বণ্টন নীতির সঙ্গেও জনসংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়টি জড়িত। বর্তমানে জনসংখ্যার ভিত্তিতেই ৮০ শতাংশ সম্পদ প্রদেশগুলির মধ্যে বিলি করা হয়। এই নিয়ম বদলে ৫০ শতাংশের নিচে রাজস্ব বণ্টনের প্রস্তাব দিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী কামাল।
পাক পঞ্জাবের রাজনৈতিক গুরুত্ব ও চ্যালেঞ্জ
বিশ্লেষকদের মতে, রাজস্ব বণ্টনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া মুনিরের জন্য সহজ নয়। কারণ চার প্রদেশের মধ্যে পাক পঞ্জাব সর্বাধিক জনবহুল। এই এলাকাটি প্রধানমন্ত্রী শাহবাজের দল পাকিস্তান মুসলিম লিগ-নওয়াজের শক্ত ঘাঁটি। সেখানকার মুখ্যমন্ত্রী মরিয়ম নওয়াজ, যিনি শাহবাজের ভাইঝি এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের মেয়ে। পাক পঞ্জাবে লাহোর, ইসলামাবাদ এবং রাওয়ালপিন্ডির মতো গুরুত্বপূর্ণ শহর অবস্থিত। রাওয়ালপিন্ডি পাক সামরিক বাহিনীর প্রাণকেন্দ্র। সেখানকার রাজস্ব হ্রাসের ফল হিতে বিপরীত হতে পারে।
মুনিরের ক্ষমতার উত্থান ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক
গত বছরের মে মাসে জম্মু-কাশ্মীরের পহেলগাঁওতে জঙ্গি হামলার বদলা নিতে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে 'অপারেশন সিঁদুর' নামে সেনা অভিযান চালায় ভারত। চার দিনের এই 'যুদ্ধে' পাকিস্তানের ১১টি বিমানঘাঁটি ধ্বংস হয়। সংঘর্ষবিরতির কয়েক দিনের মাথায় জেনারেল থেকে ফিল্ড মার্শালে পদোন্নতি পান মুনির। ২০২৫ সালের ২০ মে ইসলামাবাদের দ্বিতীয় সেনাপ্রধান হিসাবে এই পদ অর্জন করেন তিনি। এরপর দেশের বিদেশনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা নেন মুনির। তাঁর হাত ধরেই আমেরিকার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে পাকিস্তানের। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বহুবার প্রকাশ্যে তাঁর প্রশংসা করেছেন।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে পাকিস্তানের চিফ অফ ডিফেন্স ফোর্সেস (সিডিএফ) হিসাবে মুনিরকে নিয়োগ দেওয়া হয়। ফলে পাঁচ বছরের জন্য ফৌজের তিন শাখার নিয়ন্ত্রণ পান তিনি। বাহিনীর পরমাণু অস্ত্রও তাঁর হাতে। অর্থাৎ সব দিক থেকে ফিল্ড মার্শালই ইসলামাবাদের সর্বাধিক ক্ষমতাশালী ব্যক্তি।
সৌদি আরব ও গাজা সংকটে মুনিরের ভূমিকা
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরবের সঙ্গে 'কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি' করে পাকিস্তান। এই চুক্তির নেপথ্যে মুনিরের হাত রয়েছে। অক্টোবরে গাজায় শান্তি ফেরাতে মিশরের শার্ম আল শেখে হওয়া সম্মেলনেও অংশ নেন তিনি। প্যালেস্টাইনের ওই এলাকায় সেনা পাঠানোর কথাও বলেন মুনির। ইজরায়েল আপত্তি তোলায় পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত না হলেও এর জেরে ট্রাম্পের সঙ্গে আরও দৃঢ় হয় তাঁর সম্পর্ক।
ইরান-ইজরায়েল যুদ্ধে মধ্যস্থতা
এ বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইজরায়েল এবং আমেরিকা যৌথভাবে ইরানে হামলা চালালে পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ বেধে যায়। এই লড়াই থামাতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালনের চেষ্টা করে পাকিস্তান। দুপক্ষের মধ্যে আলোচনার ব্যবস্থা হয় ইসলামাবাদে। এর মূল কারিগর ছিলেন ফিল্ড মার্শাল মুনির। যদিও তাতে সংঘাত থামেনি।
অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ: সীমান্ত সংঘর্ষ ও বিচ্ছিন্নতাবাদ
গত দেড় বছর ধরে আফগানিস্তানের সঙ্গে সীমান্ত সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছে পাক ফৌজ। খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশে তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান (টিটিপি) নামের একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠী ঘন ঘন হামলা চালাচ্ছে। বালোচিস্তান প্রদেশে তীব্র আকার ধারণ করেছে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন। সেখানেও বালোচ লিবারেশন আর্মির হামলায় প্রাণ হারাচ্ছে পাক ফৌজ। সম্প্রতি উত্তাল হয়েছে পাক অধিকৃত কাশ্মীর (পিওকে)। সেখানকার জনতা সরাসরি ভারতের সাহায্য চেয়ে সুর চড়িয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে আর্থিকভাবেও বেহাল ইসলামাবাদ।
এই কঠিন সময়ে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের মতো গুরুদায়িত্ব পেলেন ফিল্ড মার্শাল মুনির। পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ এখন তাঁর হাতে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, এই 'যুদ্ধে' কি তিনি সফল হবেন?
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
পাকিস্তানের জনসংখ্যা কত?
পাকিস্তানের বর্তমান জনসংখ্যা ২৫.৯০ কোটি। এটি বিশ্বের পঞ্চম জনবহুল দেশ।
কেন সেনাপ্রধানকে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে?
পাক সরকার জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এই জটিল পরিস্থিতিতে সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল মুনিরকে একটি কমিটির সদস্য করা হয়েছে।
পাকিস্তানের জনসংখ্যা বৃদ্ধির মূল কারণ কী?
প্রতি বছর গড়ে ৬৭ লাখ শিশুর জন্ম হয় পাকিস্তানে। গর্ভনিরোধক পণ্যের অভাব এবং রাজস্ব বণ্টন নীতি জনসংখ্যা বৃদ্ধির মূল কারণ বলে মনে করে পাক সরকার।
পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জগুলি কী কী?
পাকিস্তান আফগানিস্তানের সঙ্গে সীমান্ত সংঘর্ষ, টিটিপির হামলা, বালোচিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন এবং পাক অধিকৃত কাশ্মীরে অস্থিরতার মতো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।