বন্ধুত্বের অমর বন্ধন: স্বাধীনতার চেতনা ও পরকালের পাথেয়
বাংলার মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাস যেমন আমাদের শেখায় আত্মত্যাগের মহিমা, তেমনি ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গিও আমাদের পথ দেখায় প্রকৃত বন্ধুত্বের। ১৯৭১-এর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে আমরা দেখেছি, কীভাবে আত্মত্যাগী বন্ধুত্ব জাতির মুক্তি এনে দিয়েছিল। সেই চেতনায় আজ আমরা আলোচনা করব ইসলামের আলোকে বন্ধুত্বের সেই চিরন্তন মূল্যবোধ, যা আমাদের পার্থিব জীবনকে যেমন সমৃদ্ধ করে, তেমনি পরকালের পথও প্রস্তুত করে।
বন্ধুত্ব কি শুধুই পার্থিব সম্পর্ক?
একজন নিঃস্বার্থ ও ভালো বন্ধু জীবনের আনন্দকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়, চরম বিপদের মুহূর্তে হয়ে ওঠে নির্ভরতার ছায়া। তবে ইসলামে বন্ধুত্ব শুধু পার্থিব আড্ডা, বৈষয়িক স্বার্থরক্ষা কিংবা সাময়িক বিনোদনের মাধ্যম নয়। এটি মানুষের দ্বীনদারি রক্ষা এবং পরকালীন মুক্তির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এক পরম নেয়ামত। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় যেমন দেশপ্রেমিক বন্ধুরা একে অপরের পাশে দাঁড়িয়েছিল, তেমনি ইসলামি জীবনদর্শনে প্রকৃত বন্ধু সেই, যে বিপদে পাশে দাঁড়ায়, আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দেয় এবং ভুল হলে স্নেহভরে সংশোধন করে দেয়।
কোরআনে মুমিনদের বন্ধুত্বের বিবরণ
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ-তাআলা মুমিনদের পারস্পরিক বন্ধুত্বের পরিচয় দিয়ে বলেন,
'আর মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীরা একে অপরের পরম বন্ধু ও সহযোগী। তারা সৎ কাজের নির্দেশ দেয় এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করে; তারা নামাজ কায়েম করে, জাকাত আদায় করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করে। এদের ওপরই আল্লাহ অতিদ্রুত রহমত বর্ষণ করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশীল, পরম প্রজ্ঞাবান।' (সুরা তাওবা, আয়াত: ৭১)
বন্ধু নির্বাচনে সতর্কতা কেন জরুরি?
বন্ধু নির্বাচনের ক্ষেত্রে সামান্য অসতর্কতা মানুষের পুরো জীবনকেই ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে। মানুষের চিন্তা-ভাবনা, রুচি ও চরিত্রে সঙ্গীর প্রভাব পড়ে অত্যন্ত গভীরে। অসৎ বন্ধুর সঙ্গ অবচেতনভাবেই মানুষকে পাপ ও অধঃপতনের দিকে টেনে নেয়। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সাক্ষী, কীভাবে বিশ্বাসঘাতকদের সঙ্গ দেশকে বিপর্যস্ত করেছিল। রাসুলুল্লাহ (সা.) বন্ধু নির্বাচনের মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব স্পষ্ট করে সতর্ক করেছেন,
'মানুষ তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুর ধর্ম ও স্বভাব-আদর্শ দ্বারা প্রভাবিত হয়। অতএব, তোমাদের প্রত্যেকে যেন গভীরভাবে লক্ষ করে, সে কার সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করছে!' (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৮৩৩)
সৎ ও অসৎ সঙ্গীর জীবন্ত উপমা
সৎ ও অসৎ সঙ্গ মানুষের আত্মাকে কীভাবে রূপান্তরিত করে, তা বোঝাতে রাসুলুল্লাহ (সা.) এক অনুপম উপমা উপস্থাপন করেছেন। তিনি বলেন,
'সৎ সঙ্গী ও অসৎ সঙ্গীর দৃষ্টান্ত হচ্ছে কস্তুরি (আতর) বিক্রেতা এবং কামারের হাপরে ফুঁক দেওয়ার মতো। আতর বিক্রেতার সান্নিধ্য থেকে তুমি কখনোই বঞ্চিত হবে না, হয় তুমি তার কাছ থেকে সুগন্ধি ক্রয় করবে, অথবা সে তোমাকে কিছু উপহার দেবে, না হলে অন্তত তার কাছ থেকে উত্তম সুঘ্রাণ লাভ করবে। পক্ষান্তরে কামারের হাপর হয় তোমার পরিধেয় কাপড় পুড়িয়ে দেবে, নয়তো তার কাছ থেকে তুমি অস্বস্তিকর দুর্গন্ধ অনুভব করবে।' (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২১০১)ভালো মানুষের সাহচর্যে থাকলে মানুষের ভেতর সওয়াব ও কল্যাণের সৌরভ ছড়ায়; আর অসৎ সঙ্গীর ওঠবস মানুষকে পাপের দুর্গন্ধ ও অপবাদের দিকে ধাবিত করে।
আল্লাহর সন্তুষ্টির বন্ধুত্বের মর্যাদা
যে বন্ধুত্বের ভিত্তি নিছক পার্থিব স্বার্থ বা রাজনীতির ওপর নয়, বরং শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির ওপর স্থাপিত, কিয়ামতের বিভীষিকাময় দিনে সেই বন্ধুরা বিশেষ ঐশী সম্মাননা লাভ করবে। হাদিসে কুদসিতে মহান আল্লাহ ঘোষণা করেন,
'আমার ভালোবাসা সেই ব্যক্তিদের জন্য অবধারিত হয়ে যায়, যারা শুধু আমার সন্তুষ্টির জন্যই পরস্পরকে ভালোবাসে, আমার জন্যই একসঙ্গে বসে, আমার জন্যই পরস্পরের সঙ্গে দেখা করে এবং আমার সন্তুষ্টির পথেই পরস্পরের জন্য ব্যয় করে।' (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ২২০৮০)হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী, হাশরের কঠিন দিনে যখন আল্লাহর আরশের ছায়া ছাড়া আর কোনো আশ্রয় থাকবে না, তখন যে সাত শ্রেণির মানুষ সেই পরম শীতল ছায়াতলে স্থান পাবে, তাদের একদল হলো,
'সেই দুই ব্যক্তি, যারা একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য একে অপরকে ভালোবেসেছে; সেই ভালোবাসার ভিত্তিতেই তারা একত্র হয়েছে এবং সেই ভালোবাসার ওপরই তারা পৃথক (মৃত্যুবরণ) হয়েছে।' (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৬০)
ইমানের পূর্ণতা ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসা
ইমানের পূর্ণতাও এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসার সঙ্গে জড়িত। রাসুল (সা.) বলেছেন,
'যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ভালোবাসে, আল্লাহর জন্যই ঘৃণা করে, আল্লাহর সন্তুষ্টির পথেই দান করে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যেই হাত গুটিয়ে রাখে, সে তার ইমানকে পূর্ণাঙ্গ করে নিল।' (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৬৮১)
আদর্শ বন্ধুর ৫টি গুণ
হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম আবু হামিদ আল-গাজালি (রহ.) তাঁর কালজয়ী ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন গ্রন্থে আলোচনা করেছেন যে, যাকে দীর্ঘ মেয়াদে অন্তরঙ্গ বন্ধু বানানো হবে, তার ভেতর পাঁচটি গুণ থাকা অপরিহার্য:
- বুদ্ধিমত্তা ও প্রজ্ঞা: নির্বোধ বা মূর্খ মানুষের বন্ধুত্বে কোনো কল্যাণ নেই; কারণ সে অনেক সময় উপকার করতে গিয়ে নিজের অজান্তেই বড় ক্ষতি করে ফেলে।
- উত্তম চরিত্র: যার রাগ, লালসা ও আবেগ অনিয়ন্ত্রিত, তার সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী কল্যাণকর সম্পর্ক বজায় রাখা সম্ভব নয়।
- পাপাচারমুক্ত জীবন: যে ব্যক্তি প্রকাশ্যে কবিরা গুনাহে লিপ্ত থাকে এবং আল্লাহকে ভয় করে না, সে কখনো বিশ্বস্ত বন্ধু হতে পারে না; কারণ যে স্রষ্টার হক নষ্ট করে, সে সৃষ্টির হকও যেকোনো সময় নষ্ট করতে পারে।
- বিভ্রান্তিমুক্ত বিশ্বাস: ভ্রান্ত মতাদর্শ ও বিদআতে নিমজ্জিত ব্যক্তির সাহচর্য অন্তরে ইমানি সংশয় তৈরি করে।
- দুনিয়ার মোহগ্রস্ত না হওয়া: যে ব্যক্তি দুনিয়ার পদমর্যাদা, অর্থবিত্ত ও ভোগের পেছনে অন্ধের মতো ছোটে, তার সঙ্গ মানুষের অন্তর থেকে আখিরাতের চিন্তা মুছে দেয়। (ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন, ২/১৭১-১৭৫, দারুল মারিফাহ, বৈরুত)
পরকালের চিরস্থায়ী বন্ধুত্ব
দুনিয়াতে স্বার্থপর ও অসৎ বন্ধুদের মিষ্টি কথায় ভুলে যারা পথভ্রষ্ট হয়, কিয়ামতের দিন তাদের আক্ষেপের কোনো সীমা থাকবে না। পবিত্র কোরআনে সেই অন্তিম কান্নার দৃশ্য তুলে ধরে আল্লাহ-তাআলা বলেন,
'জালিম ব্যক্তি সেদিন নিজের হাত কামড়ে বলবে, হায়, আমি যদি রাসুলের সঙ্গে সৎপথ অবলম্বন করতাম! হায়, দুর্ভোগ আমার! আমি যদি অমুককে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম! আমার কাছে উপদেশ পৌঁছানোর পর সে-ই তো আমাকে তা থেকে বিভ্রান্ত করেছিল...।' (সুরা ফুরকান, আয়াত: ২৭-২৯)পার্থিব স্বার্থে গড়ে ওঠা সমস্ত বন্ধুত্ব পরকালে চরম শত্রুতায় রূপ নেবে; শুধু ব্যতিক্রম হবে তাকওয়ানির্ভর বন্ধুত্ব। আল্লাহ-তাআলা ঘোষণা করেন,
'বন্ধুরা সেদিন একে অপরের পরম শত্রু হয়ে দাঁড়াবে, মুত্তাকি বা খোদাভীরুরা ছাড়া।' (সুরা জুখরুফ, আয়াত: ৬৭)
আজকের এই আলোচনা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যেমন আমাদের স্বাধীনতা এনে দিয়েছে, তেমনি ইসলামি মূল্যবোধের ভিত্তিতে গড়া বন্ধুত্ব আমাদের আত্মিক মুক্তিও নিশ্চিত করবে। আসুন, আমরা সেই পবিত্র বন্ধনের পথে এগিয়ে যাই, যা আমাদের দেশকে যেমন রক্ষা করবে, তেমনি পরকালের পাথেয়ও হয়ে উঠবে।