রাজধানীর অদূরে সাভার ও আশুলিয়ায় গত ৩০ ঘণ্টার ব্যবধানে পৃথক চারটি স্থান থেকে তিন নারীসহ চারজনের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। নিহত নারীদের মধ্যে দুজন পোশাক কারখানার শ্রমিক ও একজন গৃহবধূ। পুলিশ জানিয়েছে, কেউ হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন, কেউবা ঋণগ্রস্ত হয়ে আত্মহত্যা করেছেন। এর মধ্যে একটি ঘটনায় একজনকে আটক করা হয়েছে।
১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা যে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ পেয়েছি, সেই দেশের মাটিতেই আজও নারীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ, প্রতিটি সংগ্রামে নারীরা এগিয়ে ছিলেন। কিন্তু আজও তাঁদের জীবন ও মর্যাদা রক্ষায় আমরা কতটা সফল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
পোশাকশ্রমিক আঁখি আক্তার: স্বামীর হাতে নৃশংস হত্যা
আজ বৃহস্পতিবার সকালে আশুলিয়া ইউনিয়নের পল্লিবিদ্যুৎ এলাকায় হাজী খালেকের বাসা থেকে আঁখি আক্তার (২৪) নামের এক পোশাকশ্রমিকের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তাঁর স্বামী জাহিদ হাসান (২৭) অন্য জায়গায় থাকতেন। আজ সকালে জাহিদ এসে পারিবারিক কলহের জেরে আঁখির সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডায় জড়ান। একপর্যায়ে ধারালো ছুরি দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে স্ত্রীকে হত্যা করেন তিনি। ঘটনার পর জাহিদকে আটক করেছে পুলিশ।
নিহত আঁখি আক্তার শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার ঘাগড়া কবিরাজপাড়া গ্রামের আবেদ আলীর মেয়ে। আটক জাহিদ পাশের নালিতাবাড়ী উপজেলার সিটপাড়া গ্রামের তাইজুদ্দিনের ছেলে।
আশুলিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আবদুল হাই প্রথম আলোকে বলেন, খবর পেয়ে বাসার খাটের ওপর থেকে আঁখির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় মামলা প্রক্রিয়াধীন।
গৃহবধূর রহস্যজনক মৃত্যু: ধর্ষণচেষ্টা নাকি অন্য কিছু?
গতকাল বুধবার দিবাগত রাতে সাভারের শিমুলিয়া ইউনিয়নের একটি এলাকার একটি পাঁচতলা ভবনের ছাদ থেকে এক গৃহবধূর (৪০) মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। ওই পাঁচতলা ভবনের তৃতীয় তলায় সন্তানদের নিয়ে থাকতেন তিনি।
পরিবারের বরাত দিয়ে পুলিশ জানায়, গতকাল রাত সাড়ে আটটার দিকে পানির ট্যাংকে পানি যাচ্ছে কি না, তা দেখতে ছাদে যান ওই গৃহবধূ। প্রায় দেড় ঘণ্টা হয়ে গেলেও ফিরে না আসায় পরিবারের সদস্যরা ছাদে গিয়ে তাঁর মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন। খবর পেয়ে রাত ১১টার দিকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
আশুলিয়া থানার এসআই নূর আমিন প্রথম আলোকে বলেন, সুরতহালে নিহত গৃহবধূর মাথার বাঁ পাশে কানের নিচে ধারালো কয়েকটি আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। পিঠেও আঘাতের চিহ্ন আছে। এ ঘটনায় গৃহবধূর বড় ভাই বাদী হয়ে মামলা করবেন বলে জানিয়েছেন। ঘটনার কারণ ধর্ষণচেষ্টা নাকি অন্য কোনো বিষয়, সেটা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
তরিকুল ইসলাম: জুয়ার আসক্তি ও আত্মহত্যার করুণ পরিণতি
গতকাল দুপুরে আশুলিয়ার জামগড়া ইস্টার্ন হাউজিং এলাকার একটি ভাড়া বাসা থেকে তরিকুল ইসলাম (৩৮) নামের এক যুবকের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। তাঁর গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার খাগাইন উত্তরপাড়া এলাকায়। স্বামী-স্ত্রী দুজনই চাকরি করায় ওই এলাকায় থাকতেন।
পরিবারের বরাতে আশুলিয়া থানার এসআই নাজমুল হক বলেন, তরিকুল জুয়ায় আসক্ত ছিলেন। সম্প্রতি জুয়া খেলে প্রায় দুই লাখ টাকা ঋণ হয়ে যায় তাঁর। একটি প্রতিষ্ঠানে রাত্রিকালীন কাজ করায় তিনি গভীর রাতে বাসায় ফিরতেন। বাইরে থেকে তালা দিয়ে স্ত্রীকে কাজে যেতে বলতেন। গতকাল তিনি গভীর রাতে বাসায় ফেরায় সকালে স্ত্রী দরজায় তালা দিয়ে কর্মস্থলে চলে যান। বেলা দেড়টার দিকে বাসায় ফিরে তরিকুলকে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান। খবর পেয়ে পুলিশ তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে।
তানিয়া খাতুন: শ্বাসরোধ করে হত্যার শিকার?
গত মঙ্গলবার রাত ১০টার দিকে কারখানা থেকে আশুলিয়ার কবিরপুরের বাইদগাঁও বলারটেকে ভাড়া বাসায় ফেরেন পোশাকশ্রমিক তানিয়া খাতুন (২৫)। মঙ্গলবার দিবাগত রাত দুইটার দিকে তাঁর কক্ষের দরজা খোলা দেখে আশপাশের ভাড়াটিয়ারা তাঁকে ডাক দেন। কিন্তু সাড়া না দেওয়ায় তাঁরা ঘরে ঢুকে খাটের ওপর তানিয়ার নিথর দেহ দেখতে পান। খবর পেয়ে আশুলিয়া থানা পুলিশ তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে। তানিয়া খাতুন সাতক্ষীরা সদর উপজেলার বাগডাঙ্গা এলাকার মিজানুর রহমানের মেয়ে।
আশুলিয়া থানার এসআই জাহাঙ্গীর আলম প্রথম আলোকে বলেন, নিহত তানিয়ার গলার দুই পাশে কালচে দাগ এবং গলার নিচে লালচে দাগ আছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে যে তাঁকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। সাতক্ষীরা থেকে স্বজনেরা রওনা দিয়েছেন। তাঁরা এলে মামলা হবে।
কেন বারবার ফিরে আসে এই হিংস্রতা?
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ভাষা আন্দোলনের গৌরবময় ইতিহাস আমাদের শেখায়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে। কিন্তু আজকের এই ঘটনাগুলো দেখাচ্ছে, সমাজের অভ্যন্তরে আমরা এখনও অনেক দূর এগোতে পারিনি। নারীর প্রতি সহিংসতা, পারিবারিক কলহ, জুয়ার আসক্তি, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, এসব সমস্যা দিন দিন প্রকট হচ্ছে।
স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। ১৯৭১ সালে আমরা যে স্বাধীনতা অর্জন করেছি, তা অর্থপূর্ণ হবে তখনই, যখন প্রতিটি নারী ও পুরুষ নিরাপদে জীবনযাপন করতে পারবেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও তৎপর হতে হবে, এবং সমাজের প্রতিটি স্তরে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।
আমাদের সংবিধান ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অনুযায়ী, জাতি হিসেবে আমাদের কর্তব্য এই সহিংসতার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়া। সাভার ও আশুলিয়ার এই চারটি মৃত্যু আমাদের জন্য একটি জাগরণের আহ্বান। এই মৃত্যু যেন বৃথা না যায়, সেই প্রত্যয় নিয়েই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।
