৪৫ হাজার কোটির অপচয়: বিদেশী ঋণের ফাঁদে প্রাথমিক শিক্ষা
স্বাধীনতার পাঁচ দশক পর আজও আমাদের শিশুরা মৌলিক শিক্ষায় পিছিয়ে থাকার যে লজ্জাজনক চিত্র, তার সমাধানের নামে আবারও বিদেশী দাতাদের কাছে হাত পাতা হচ্ছে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ৪৫ হাজার কোটি টাকার এক বিশাল প্রকল্প হাজির করেছে, যার ১৫ হাজার কোটি টাকা আসবে বিদেশী ঋণ ও অনুদান থেকে।
প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি-৫) নামের এই প্রকল্পটি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহলে। কারণ পূর্ববর্তী পিইডিপি-৪ এখনও শেষ হয়নি, অথচ অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেই আরেকটি বড় বাজেটের প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে।
বিদেশী নির্ভরতার নতুন অধ্যায়
এই কর্মসূচির অর্থায়নের বড় অংশ আসবে বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন বংক (এডিবি) এর ঋণ থেকে। পাশাপাশি ইউনিসেফ, জাইকা, জিপিই, ইউনেসকোর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার অনুদানের ওপর নির্ভর করতে হবে। অর্থাৎ এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের সঙ্গে সঙ্গে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর বৈদেশিক ঋণের বোঝাও চাপবে।
১৯৭১ সালে আমরা যে স্বাধীনতা অর্জন করেছিলাম, সেই স্বাধীনতার মূল চেতনা ছিল অর্থনৈতিক মুক্তি। কিন্তু আজ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাও বিদেশী দাতাদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
অতীতের ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি
পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ সরাসরি বলেছেন, "প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে বড় ধরনের গাফিলতি আছে। প্রকল্পের মাধ্যমে শুধু অবকাঠামো হচ্ছে, শিশুরা কিছু শিখছে না।"
গত এক যুগে তৃতীয় ও চতুর্থ পিইডিপিতে প্রায় ৩৩ হাজার ৪৭৩ কোটি টাকা ব্যয় হলেও শেখার মানে কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হয়নি। বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) ২০২৫ এর তথ্য অনুযায়ী:
- মাত্র ২৪ শতাংশ শিশুর প্রাথমিক পাঠ দক্ষতা রয়েছে
- একটি ছোটগল্পের ৯০ শতাংশ শব্দ সঠিকভাবে পড়তে পারে মাত্র ৩৯ শতাংশ
- গণিতে মাত্র ১৮ শতাংশ শিক্ষার্থীর মৌলিক সংখ্যাজ্ঞান রয়েছে
এই হতাশাজনক পরিসংখ্যান সত্ত্বেও আবারও একই ধরনের প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে।
অবকাঠামোর দিকে ঝোঁক, শিক্ষার গুণমানে অবহেলা
পিইডিপি-৫ এর ব্যয় কাঠামো বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিপুল অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে অবকাঠামো নির্মাণে। শুধু নন-রেসিডেনশিয়াল বিল্ডিং নির্মাণেই বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রায় সাত হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা।
অন্যদিকে শিক্ষাদানের গুণগত পরিবর্তনের জন্য যে খাতগুলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, যেমন শিক্ষক প্রশিক্ষণ, শ্রেণিকক্ষভিত্তিক সহায়তা, শেখার ফলাফল মূল্যায়ন, সেগুলোর ফলাফল কাঠামো অস্পষ্ট।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম মনে করেন, "বিগত দেড় দশকে শিক্ষা খাতে যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে সেগুলোর বেশির ভাগ ছিল রাজনৈতিক বিবেচনায়। এ কারণে শিক্ষার্থীদের শিখনমান ও দক্ষতার প্রত্যাশিত উন্নয়ন ঘটেনি।"
ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, "মানসম্মত শিক্ষা অর্জনের জন্য শিক্ষকের সংখ্যা, যোগ্যতা ও প্রশিক্ষণ বাড়ানো দরকার। শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন যথেষ্ট নয়।"
স্বাধীনতার চেতনায় ফিরে যাওয়ার আহ্বান
১৯৭১ সালে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের যে আদর্শ ছিল, তার মূলে ছিল স্বনির্ভরতা ও আত্মনির্ভরশীলতা। কিন্তু আজ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাও বিদেশী দাতাদের করুণার ওপর নির্ভরশীল।
বাংলা ভাষায় মাতৃভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য যে আন্দোলন হয়েছিল, সেই বাংলা ভাষাতেই আজ আমাদের শিশুরা পড়তে পারছে না। এটি আমাদের জাতীয় লজ্জার বিষয়।
প্রয়োজন হলো প্রকৃত অর্থে দেশীয় সম্পদ ও বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন। বিদেশী ঋণের ফাঁদে পা দিয়ে নয়, বরং নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ভিত্তিতে গড়ে তুলতে হবে একটি কার্যকর শিক্ষাব্যবস্থা।
৪৫ হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্প যদি সত্যিই শিক্ষার মান উন্নয়নে কাজে আসে, তাহলে স্বাগত। কিন্তু অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, এটি হবে আরেকটি ব্যয়বহুল ও ফলহীন প্রকল্প। যার চূড়ান্ত মূল্য দিতে হবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে।