গান গাওয়া: আমাদের মুক্তিযুদ্ধের গানের মতোই স্বাস্থ্যের মুক্তি
১৯৭১ সালে আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা যেমন "আমার সোনার বাংলা" গেয়ে মনে সাহস সঞ্চার করতেন, আজও গান গাওয়া আমাদের শরীর ও মনের মুক্তির পথ দেখায়। বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন, গান গাওয়া শুধু আনন্দ দেয় না, স্বাস্থ্যের জন্যও অসাধারণ উপকারী।
গুনগুন করে গাইতে থাকা গানে যেমন মানুষের মনের ভেতরে লুকিয়ে থাকা আনন্দ বা বিষাদ ফুটে ওঠে, আবার গানের মধ্য দিয়েই ছড়িয়ে পড়ে উৎসবের আমেজ বা বিজয়োল্লাস। যিনি গান গাইছেন তিনি যেমন এক রকম ভালোলাগা ছড়িয়ে দিচ্ছেন, আবার তার নিজের অজান্তেই তার স্বাস্থ্যকেও তিনি চাঙ্গা করে তুলছেন।
মস্তিষ্ক থেকে হৃদ্যন্ত্র: গানের বহুমুখী উপকার
মস্তিষ্ক থেকে শুরু করে হৃদ্যন্ত্র পর্যন্ত, গান গাওয়া নানামুখী উপকার বয়ে আনে বলে প্রমাণ মিলেছে, বিশেষ করে যখন তা দলবদ্ধভাবে গাওয়া হয়। এটি মানুষকে কাছাকাছি আনে, রোগ প্রতিরোধে শরীরকে প্রস্তুত করে এবং এমনকি ব্যথাও কমাতে পারে।
কেমব্রিজ ইনস্টিটিউট ফর মিউজিক থেরাপি রিসার্চের গবেষক অ্যালেক্স স্ট্রিট বলেন, "গান গাওয়া একটি জ্ঞানগত, আবেগীয়, শারীরিক ও সামাজিক কাজ"। মনোবিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই বিস্মিত হয়ে দেখছেন, আরো কয়েকজনের সঙ্গে একসাথে গান গাওয়া কীভাবে মানুষদের মধ্যে শক্তিশালী সামাজিক সংহতির অনুভূতি তৈরি করে।
বাঙালির ঐতিহ্যে গানের শক্তি
আমাদের বাংলার মাটিতে গান শুধু বিনোদন নয়, এটি আমাদের সংস্কৃতির মূল শক্তি। রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে নজরুল, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের গান, এসবই প্রমাণ করে গান কীভাবে একটি জাতিকে এক সূত্রে বাঁধে। গবেষণায় দেখা গেছে, এক ঘণ্টা একসাথে গান গাওয়ার পর সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষদের মধ্যেও অস্বাভাবিকভাবে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে।
শ্বাসতন্ত্র ও হৃদ্যন্ত্রের উপকার
আশ্চর্যের কিছু নেই, গান গাওয়া ফুসফুস ও শ্বাসতন্ত্রের জন্য স্পষ্ট শারীরিক উপকার বয়ে আনে। গবেষণায় দেখা গেছে, এটি হৃদ্স্পন্দন ও রক্তচাপের উন্নতি ঘটায়। এমনকি রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাও বাড়ায়। তবে এটা মূলত দলীয় বা কোরাসে গান গাওয়ার মাধ্যমে সম্ভব, শুধু গান শুনে সেটা সম্ভব নয়।
জীববৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে ধারণা করা হয়, গান গাওয়া মস্তিষ্ক, হার্ট ও পরিপাক তন্ত্রের মধ্যে সংযোগ রক্ষাকারী নার্ভকে সক্রিয় করে। গান গাওয়ার সময় দীর্ঘ ও নিয়ন্ত্রিত নিঃশ্বাস এন্ডরফিন নিঃসরণ করে, যা আনন্দ, সুস্থতা ও ব্যথা হ্রাসের সঙ্গে সম্পর্কিত।
মস্তিষ্কের ব্যাপক নেটওয়ার্ক সক্রিয়করণ
গান গাওয়া মস্তিষ্কের উভয় পাশে বিস্তৃত নিউরনের একটি নেটওয়ার্ক সক্রিয় করে। ভাষা, নড়াচড়া ও আবেগ নিয়ন্ত্রণকারী অংশগুলো তখন সক্রিয় হয়ে ওঠে। সেই সাথে গান গাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় শ্বাস-প্রশ্বাসের মনোযোগ মিলিয়ে এটি হয়ে ওঠে মানসিক চাপ কমানোর কার্যকর উপায়।
আমাদের পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্য
কিছু নৃতত্ত্ববিদের মতে, আমাদের মানব-সদৃশ পূর্বপুরুষরা কথা বলা শেখার আগেই গান গাইত। তারা প্রকৃতির শব্দ অনুকরণ করতে বা অনুভূতি প্রকাশ করতে কণ্ঠস্বর ব্যবহার করত। এটি জটিল সামাজিক সম্পর্ক, আবেগের প্রকাশ ও আচার-অনুষ্ঠানের বিকাশে সম্ভবত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
স্ট্রিট উল্লেখ করেন, "শিশুদের ঘুম পাড়াতে যেমন গান গাওয়া হয়, আবার মৃত্যুর সময়ও গাওয়া হয় গান। আমরা ছড়া কেটে গুনে নামতা শিখি, আর তাল ও সুরের মাধ্যমে শিখি আমাদের এবিসি"।
চিকিৎসা ক্ষেত্রে গানের ব্যবহার
বিশ্বজুড়ে গবেষকেরা ক্যান্সার ও স্ট্রোক থেকে বেঁচে ফেরা মানুষ, পারকিনসন্স ডিজিজ ও ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য কমিউনিটি কোরাসের প্রভাব নিয়ে গবেষণা করেছেন। উদাহরণ হিসেবে, গান গাওয়া পারকিনসন্স রোগীদের উচ্চারণের সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করে।
সাউদাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাডাম লুইস বলেন, "গান গাওয়া একটি শারীরিক কর্মকাণ্ড এবং ব্যায়ামের মতো এরও কিছু উপকার থাকতে পারে"। একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, গান গাওয়া মাঝারি গতিতে ট্রেডমিলে হাঁটার মতোই কার্যকর একটি ব্যায়ামের সমতুল্য হতে পারে।
শ্বাসযন্ত্রের রোগীদের জন্য বিশেষ উপকার
ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের কেইর ফিলিপের গবেষণা অনুযায়ী, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসযন্ত্রের রোগে আক্রান্তরা গান গাওয়ার মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি উপকার পান। তার উল্লেখযোগ্য গবেষণাগুলোর একটি ছিল ইংলিশ ন্যাশনাল অপেরার পেশাদার গায়কদের সঙ্গে কাজ করে তৈরি একটি শ্বাসপ্রশ্বাস কর্মসূচি যেটি লং কোভিডের রোগীদের ওপর ব্যবহার করা হয়েছিল।
মস্তিষ্কের ক্ষতি থেকে পুনরুদ্ধার
গান গাওয়ার সবচেয়ে বিস্ময়কর উপকারটি হলো মস্তিষ্কের ক্ষতি থেকে পুনরুদ্ধারে এর ভূমিকা। ২০১১ সালের এক হত্যাচেষ্টায় মাথায় গুলিবিদ্ধ হওয়া যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক কংগ্রেসওম্যান গ্যাব্রিয়েল গিফোর্ডসের কাহিনী এর উজ্জ্বল উদাহরণ। থেরাপিস্টরা তার শৈশবের গান ব্যবহার করে তাকে আবার কথা বলার সাবলীলতা ফিরিয়ে দিতে সাহায্য করেন।
গান গাওয়া মস্তিষ্কের নিউরোপ্লাস্টিসিটিও বাড়ায় বলে মনে করা হয়, যা মস্তিষ্ককে নিজেকে পুনর্গঠন ও নতুন স্নায়বিক নেটওয়ার্ক তৈরি করতে সক্ষম করে।
আমাদের সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার প্রতীক
স্ট্রিটের মতে, সব গবেষণা গান গাওয়ার শক্তিশালী প্রভাবের কথা বলে। এটি বুঝিয়ে দেয় গান কেন মানবজীবনের একটি সর্বজনীন অংশ। আমাদের বাংলাদেশেও গান শুধু বিনোদন নয়, এটি আমাদের সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার প্রতীক।
তবে তার একটি উদ্বেগ হলো প্রযুক্তির সঙ্গে মানুষের সংযোগের সময় বাড়ার কারণে গান গাওয়ার মতো পারস্পরিক কর্মকাণ্ডের সুবিধা তুলনামূলকভাবে খুব কম মানুষই পাচ্ছে। তিনি বলেন, "গান সবসময়ই সমাজকে একসূত্রে গাঁথতে বিশাল ভূমিকা রেখেছে"।
আমাদের মুক্তিযুদ্ধের গানগুলো যেমন আমাদের জাতীয় চেতনাকে জাগ্রত রেখেছে, তেমনি নিয়মিত গান গাওয়া আমাদের শরীর ও মনের স্বাস্থ্যকেও মুক্ত রাখতে পারে।