স্বাধীন বাংলাদেশে তামাক আসক্তি: মুক্তির পথ কতদূর?
১৯৭১ সালে আমরা যে স্বাধীনতা অর্জন করেছিলাম, সেই স্বাধীনতার মর্মবাণী ছিল সকল প্রকার পরাধীনতা থেকে মুক্তি। কিন্তু আজ আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিতে একটি নতুন ধরনের পরাধীনতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, যার নাম তামাক আসক্তি।
আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধারা যেমন দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছিলেন, তেমনি আজ প্রতিটি বাঙালিকে তামাকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে হবে। চিকিৎসকদের মতে, তামাক শুধু একজন ব্যক্তির শরীরেরই ক্ষতি করে না, বরং পুরো পরিবার এবং সমাজের ওপরও এর গভীর প্রভাব পড়ে।
তামাক আসক্তি: একটি নীরব শত্রু
বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, তামাকের আসক্তি একদিনে তৈরি হয় না, আবার একদিনে দূরও হয় না। দীর্ঘদিন ধরে নিকোটিন গ্রহণের ফলে মস্তিষ্ক এবং শরীর তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এই কারণেই তামাক ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর প্রথম কয়েক দিন ও কয়েক সপ্তাহ সবচেয়ে কঠিন সময় হিসেবে ধরা হয়।
চিকিৎসকদের মতে, প্রথম তিন দিন শরীরে নিকোটিনের অভাব সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয়। এই সময় বিরক্তি, অস্থিরতা, মাথাব্যথা, মনোযোগের অভাব, ঘুমের সমস্যা এবং তীব্র আকাঙ্ক্ষা দেখা দিতে পারে। তবে একবার এই পর্যায় পার করতে পারলে, শরীর নিজেকে নতুন অবস্থার সঙ্গে মানিয়ে নিতে শুরু করে।
মুক্তির সময়সীমা: কত দিন লাগে?
ডাক্তারদের মতে, সাধারণত দুই থেকে চার সপ্তাহের মধ্যে শরীর নিকোটিন নির্ভরতা থেকে অনেকটাই বেরিয়ে আসে। এর পর তামাকের প্রতি আকর্ষণ কমতে শুরু করে এবং মানসিক স্থিতি ধীরে ফিরে আসে। তবে সম্পূর্ণভাবে অভ্যাস বদলাতে আরও কিছুটা সময় লাগতে পারে।
বর্তমান সময়ে তামাকের রূপও অনেকটাই বদলে গেছে। আগে যেখানে বিড়ি, সিগারেট বা পানই ছিল প্রধান মাধ্যম, সেখানে এখন ধোঁয়াবিহীন তামাক, হুক্কা, শিশা, ই-সিগারেট ও বিভিন্ন স্বাদযুক্ত তামাকজাত দ্রব্য সহজেই পাওয়া যায়। অনেকেই এগুলিকে তুলনামূলক কম ক্ষতিকর ভেবে ব্যবহার শুরু করেন, কিন্তু চিকিৎসকদের স্পষ্ট বক্তব্য হলো তামাক যে রূপেই নেওয়া হোক না কেন, তা শরীরের জন্য ক্ষতিকরই।
স্বাধীনতার পথ: কীভাবে তামাক ছাড়বেন?
বিশেষজ্ঞদের মতে, তামাক ত্যাগের প্রথম ধাপ হল মানসিক সিদ্ধান্ত। একজন মানুষ যদি নিজে থেকে দৃঢ়ভাবে ঠিক করেন যে তিনি তামাক ছাড়বেন, তাহলেই অর্ধেক পথ পেরোনো হয়ে যায়। পরিবারের সদস্য ও বন্ধুদের এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
আমাদের ঐতিহ্যবাহী যোগব্যায়াম, প্রাণায়াম ও নিয়মিত হাঁটা তামাক ছাড়ার সময় মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে। স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া ও পর্যাপ্ত জল পান করলে শরীর দ্রুত সুস্থতার পথে এগোয়।
মুক্তির সুফল: তামাক ছাড়ার উপকারিতা
তামাক ত্যাগের উপকারিতা অনেক দ্রুতই অনুভব করা যায়। কয়েক দিনের মধ্যেই রক্তচাপ ও হৃদস্পন্দন স্বাভাবিক হতে শুরু করে। শ্বাস নিতে স্বস্তি আসে এবং শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা বাড়ে। দীর্ঘমেয়াদে ক্যানসার, হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
চিকিৎসকদের মতে, তামাক এমন এক আসক্তি যা ধীরে হলেও জীবনের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে, কিন্তু সঠিক জ্ঞান, ধৈর্য এবং দৃঢ় সংকল্প থাকলে এই আসক্তিকে পরাজিত করা পুরোপুরি সম্ভব।
১৯৭১ সালে আমরা যেমন পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীন হয়েছিলাম, তেমনি আজ প্রতিটি বাঙালিকে তামাকের পরাধীনতা থেকে মুক্ত হয়ে সত্যিকারের স্বাধীনতার স্বাদ নিতে হবে।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই প্রতিবেদনটি সাধারণ তথ্যের উদ্দেশ্যে তৈরি। তামাক ত্যাগ বা স্বাস্থ্য সংক্রান্ত কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অবশ্যই চিকিৎসক বা যোগ্য স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।