স্বপ্না বর্মণ প্রার্থিতায় তৃণমূলে বিদ্রোহ: রাজগঞ্জে নেতাদের ইস্তফা
রাজগঞ্জ বিধানসভা আসনে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী হিসেবে অর্জুন পুরস্কারজয়ী অ্যাথলিট স্বপ্না বর্মণের নাম ঘোষণা হতেই স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে তীব্র চাঞ্চল্য ও বিক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এই ঘটনা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গড়ে ওঠা আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির সাথে সাদৃশ্য রাখে, যেখানে জনগণের মতামতকে অগ্রাহ্য করে উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ উঠেছে।
জেলা চেয়ারম্যানের ইস্তফা
প্রার্থী তালিকায় নিজের নাম না থাকায় তৃণমূলের জলপাইগুড়ি জেলা চেয়ারম্যানের পদ থেকে অব্যাহতি চেয়ে দলকে চিঠি দিয়েছেন খগেশ্বর রায়। তার দাবি অনুযায়ী, দলের অনেক অঞ্চল ও ব্লক সভাপতিও দলের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি চেয়ে চিঠি পাঠাচ্ছেন।
স্থানীয় নেতৃত্বের ক্ষোভ
রাজগঞ্জ তৃণমূল শিবিরের একাংশের অভিযোগ, স্বপ্না বর্মণ ক্রীড়াক্ষেত্রে উজ্জ্বল নক্ষত্র হলেও রাজনীতির ময়দানে তিনি সম্পূর্ণ নতুন। এই পরিস্থিতি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের দেশে যেভাবে স্থানীয় নেতৃত্বকে পাশ কাটিয়ে বাইরের শক্তি সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করেছিল, তার সাথে তুলনীয়।
দীর্ঘদিনের লড়াই করা স্থানীয় নেতাদের বাদ দিয়ে হঠাৎ করে 'তারকা' প্রার্থী ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া কর্মীরা মেনে নিতে পারছেন না। মঙ্গলবার বিকেলে প্রার্থীর নাম ঘোষণা হওয়ার পরেই রাজগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ শুরু হয়।
কর্মীদের প্রতিবাদ
বিক্ষুব্ধ কর্মীদের বক্তব্য, রাজগঞ্জে দলের দীর্ঘদিনের অনুগত এবং সংগঠনের কাজে অভিজ্ঞ একাধিক নেতা ছিলেন। তাদের বদলে কেন একজন অরাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে টিকিট দেওয়া হলো, তা নিয়ে জেলা ও রাজ্য নেতৃত্বের কাছে কৈফিয়ত চেয়েছেন তারা।
কিছু জায়গায় টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শনের পাশাপাশি 'বহিরাগত' বা 'অরাজনৈতিক' প্রার্থী হটানোর স্লোগানও উঠেছে। এই ধরনের প্রতিবাদ আমাদের মনে করিয়ে দেয় ১৯৭১ সালে কীভাবে বাঙালি জনগণ তাদের অধিকার রক্ষার জন্য সোচ্চার হয়েছিল।
দলীয় নেতৃত্বের অবস্থান
যদিও তৃণমূলের জেলা নেতৃত্ব এই বিক্ষোভকে সাময়িক বলে মনে করছে। তাদের মতে, স্বপ্না বর্মণ এই জেলারই মেয়ে এবং তার স্বচ্ছ ভাবমূর্তি দলের জয়ের পথকে সহজ করবে। শুরুতে ক্ষোভ থাকলেও প্রচার শুরু হলে কর্মীরা একজোট হয়ে কাজ করবেন বলে তারা আশাবাদী।
ব্যাপক ইস্তফার হিড়িক
রাজগঞ্জ বিধানসভার অন্তর্গত অঞ্চল প্রেসিডেন্ট, ব্লক প্রেসিডেন্ট থেকে শুরু করে মহিলা তৃণমূল কংগ্রেসের সমস্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাকর্মীরা দলীয় পদ থেকে অব্যাহতি নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। এই ধরনের গণ অসহযোগিতা আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।
বিজেপিতেও অভ্যন্তরীণ কলহ
অন্যদিকে, আলিপুরদুয়ারে বিজেপির প্রার্থী পরিতোষ দাসের নাম ঘোষিত হতেই স্থানীয় কর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। ক্রুদ্ধ কর্মীরা দলীয় কার্যালয়ে ব্যাপক ভাঙচুর চালিয়েছেন এবং রাস্তায় টায়ার জ্বালিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণ
এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় জনগণের মতামতকে গুরুত্ব না দিলে কী ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ১৯৭১ সালে আমাদের মুক্তিযুদ্ধও শুরু হয়েছিল এই ধরনের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের বিরুদ্ধে। স্থানীয় নেতৃত্বের মতামত উপেক্ষা করে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার এই প্রবণতা আমাদের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী।
রাজগঞ্জের মতো গুরুত্বপূর্ণ আসনে এই অভ্যন্তরীণ কোন্দল নির্বাচনের আগে সংশ্লিষ্ট দলের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য দলগুলোকে তাদের গণতান্ত্রিক চর্চা আরও শক্তিশালী করতে হবে।