আ.লীগের লুটের খাতা বাতিল, রাষ্ট্র সংস্কামের অমীমাংসিত চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশ আজ স্বৈরাচারী শাসনের লুণ্ঠন থেকে বেরিয়ে সার্বভৌমত্বের নতুন পথে পা রেখেছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের অবৈধ বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিলের উদ্যোগ, নিষিদ্ধ সংগঠনের অশুভ চক্রান্তের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের কঠোর প্রতিরোধ এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরে জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় দৃঢ় অবস্থান এই পরিবর্তনের সংকেত। কিন্তু ২০২৪ সালের রক্তক্ষয়ী জুলাই অভ্যুত্থানের দুই বছর পরেও রাষ্ট্র কাঠামোর আমূল সংস্কারের প্রতিশ্রুতি এখনো ক্ষমতার হিসাব নিকাশের গোলকধাঁধায় আটকে আছে। ১৯৭১ সালের মুক্তির স্পৃহ থেকে জন্ম নেওয়া এই ভূখণ্ডের সার্বভৌমত্ব ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই এখনো অসমাপ্ত।
স্বৈরাচারের অবৈধ চুক্তি: বাতিলের পথে ৩১ বিদ্যুৎ প্রকল্প
বিগত স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকার বিদ্যুৎ ও জ্বালানির বিশেষ আইনের আড়ালে বেসরকারি খাতে ৩ হাজার ৫৫৫ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন নবায়নযোগ্য জ্বালানির (সৌর, বায়ু এবং বর্জ্য) ৩১টি প্রকল্প অনুমোদন করেছিল। জাতির স্বার্থের কথা ভুলে বিদেশি ও ব্যক্তিগত লোভের বশবর্তী হয়েই এসব প্রকল্প অনুমোদন করা হয়েছিল। গত বছরের ২৬ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার এই অবৈধ প্রকল্পগুলো বাতিল করে দেয়।
বর্তমানে ক্ষমতায় বসা বিএনপি সরকার এই ৩১টি প্রকল্প যাচাই বাছাই করতে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করেছিল। তবে বিদ্যুৎ বিভাগের শীর্ষ নীতিনির্ধারকরা স্পষ্ট জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগ আমলের সেই ৩১ প্রকল্প নতুন করে জীবিত করার কোনো সুযোগ নেই। প্রচলিত আইন সেটি কোনোভাবেই সমর্থন করে না। যদিও বর্তমান সরকারের নীতিনির্ধারকদের একাংশ কাগজপত্র যাচাই বাছাই করে কয়েকটি প্রকল্পে ইতিবাচক ছিলেন বলে জানা গেছে, তবে প্রক্রিয়াগত অনিয়মের অভিযোগের কারণে এই কমিটি গঠনের বৈধতাও প্রশ্নের মুখে।
নিষিদ্ধ গোষ্ঠীর অশুভ চেষ্টা ও রাষ্ট্রের প্রতিরোধ
কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে দেশে অরাজকতা সৃষ্টির অপচেষ্টা চলছে। সার্বভৌম বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা নষ্টের এই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর মেট্রোপলিটন এলাকা ছাড়াও ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জ জেলায় সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। এছাড়া কক্সবাজার, মাদারীপুর, শেরপুর, গাজীপুর ও মৌলভীবাজার জেলায় বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক ২ শাখা থেকে জারি করা জরুরি চিঠিতে জানানো হয়, ২২শে জুন থেকে ৩০শে জুন পর্যন্ত এসব এলাকায় সেনা সদস্যরা মোতায়েন থাকবেন। মোতায়েনকৃত এলাকায় সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন বা তদূর্ধ্ব পদের কর্মকর্তারা ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা পাবেন। পুলিশ সদর দপ্তরও ২৩ জুনকে সামনে রেখে সারা দেশে প্রয়োজনীয় সতর্কতা ও নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দিয়েছে।
সার্বভৌমত্বের জয়গান: তারেক রহমানের কূটনৈতিক সাফল্য
বাংলাদেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গতকাল মালয়েশিয়ায় তাঁর দুই দিনের সরকারি সফর শেষ করেছেন। পুত্রজায়ায় মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় তিনি বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় দৃঢ় অবস্থান তুলে ধরেছেন। তিনি মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীকে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য শ্রমবাজার দ্রুত উন্মুক্ত করতে এবং অনিয়মিত শ্রমিকদের বৈধকরণের আহ্বান জানিয়েছেন। পাশাপাশি আটক বাংলাদেশিদের প্রত্যাবাসনের বিষয়টিও তুলে ধরেছেন তিনি।
জ্বালানি সার্বভৌমত্ব নিশ্চিতে কুয়ালালামপুরকে বাংলাদেশের তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানে বিনিয়োগের আহ্বান জানানো হয়েছে। দুই দেশ বিদ্যমান শ্রমশক্তি অভিবাসন সমঝোতা স্মারক পর্যালোচনা করে নতুন কাঠামো তৈরিতে যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ (জেডব্লিউজি) গঠনে সম্মত হয়েছে। এছাড়া সাংস্কৃতিক সহযোগিতা বিষয়ক একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) এবং সন্ত্রাসবাদ বিরোধী গবেষণা ও বিনিয়োগ প্রসারে দুটি নোট বিনিময় (ইওএন) স্বাক্ষরিত হয়েছে। তথ্য প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং সেমিকন্ডাক্টর খাতেও সহযোগিতার বিষয়টি এগিয়েছে। রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানেও জোর দেওয়া হয়েছে।
জনগণের অধিকার রক্ষায় পদক্ষেপ
বিদ্যুতের খুচরা মূল্য কমানোর পর এবার পাইকারি বিদ্যুতের দামও কমাতে যাচ্ছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। আগামী বৃহস্পতিবার এ সংক্রান্ত আদেশ আসতে পারে। গত ৩ জুন খুচরা বিদ্যুতের দাম গড়ে ১০ টাকা ৬৩ পয়সা থেকে ২৩ পয়সা কমে ১০ টাকা ৪০ পয়সায় দাঁড়ায়। এতে বিতরণ কোম্পানিগুলোর রাজস্ব আদায় দুই হাজার ৩০০ কোটি টাকা কমবে, যার মধ্যে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) ক্ষতি এক হাজার ৭৮০ কোটি টাকা। স্বৈরাচারের আমলের লুটের অর্থনীতির বোঝা থেকে জনগণের এই স্বস্তি একটি ইতিবাচক সংকেত।
অন্যদিকে, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশনার নিয়োগের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে নাম সুপারিশ করতে আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. রেজাউল হকের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি অনুসন্ধান কমিটি গঠন করেছে সরকার। সাড়ে তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে কমিশনার ও চেয়ারম্যান ছাড়া দুদক অকার্যকর ছিল। দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের এই প্রতিরোধ মুক্তির চেতনারই অংশ।
স্বাস্থ্য সুরক্ষায় অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা নতুন করে হালনাগাদের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আগের সরকারের রেখে যাওয়া তালিকা বাতিল করে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের নেতৃত্বে ২২ সদস্যের জাতীয় ঔষধ উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করা হয়েছে। এছাড়া সংসদ সদস্যদের নিজ নিজ এলাকার অবকাঠামো উন্নয়নে ৫০ কোটি টাকা করে বরাদ্দ রাখার প্রকল্প নিচ্ছে সরকার, যা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) এর মাধ্যমে বাস্তবায়িত হবে। তবে এই বরাদ্দ যেন স্বৈরাচারের আমলের মতো দুর্নীতির হাতিয়ারে পরিণত না হয়, সেজন্য সতর্ক দৃষ্টি রাখা জরুরি।
অন্যদিকে, নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার এনায়েতনগরে গার্মেন্টসের ঝুট (ওয়েস্টেজ) নামানোকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় নতুন চাঁদাবাজ গোষ্ঠীর উত্থান ঘটেছে। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে সংঘর্ষের সময় এক শিশু গুলিবিদ্ধ হয়েছিল। দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে ৫০টির বেশি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এই অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ আমাদের শিল্পের স্বাধীনতার জন্য হুমকি।
রাষ্ট্র সংস্কারের অমীমাংসিত প্রতিশ্রুতি
২০২৪ সালের জুলাই আগস্টের ছাত্র জনতার রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্ণ হতে চললো। স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার পতনের পর দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামো বদলে ফেলার বিশাল স্বপ্ন নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছিল। তাদের প্রধান অঙ্গীকার ছিল জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং রাষ্ট্র কাঠামোর আমূল সংস্কার। এরপর দেশে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং বিপুল জনসমর্থন নিয়ে বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে।
কিন্তু নতুন রাজনৈতিক সরকার গঠনের দুই বছর পর আজ একটি বড় প্রশ্ন সামনে এসেছে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র সংস্কারের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা বাস্তবে কতটা পূরণ হয়েছে? ১৯৭১ সালের মতো ২০২৪ সালের এই মুক্তির সংগ্রামেও আমরা কি পুরো প্রক্রিয়াই রাজনৈতিক সমঝোতা ও ক্ষমতার হিসাব নিকাশের গোলকধাঁধায় আটকে যাচ্ছি? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে আমাদেরই।
বিদ্যুতের দাম কমছে কেন?
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) খুচরার পর পাইকারি বাজারেও বিদ্যুতের দাম কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে। গত ৩ জুন খুচরা মূল্য কমানোর আদেশের পর গ্রাহক পর্যায়ে স্বস্তি এসেছে। আগামী বৃহস্পতিবার পাইকারি বিদ্যুতের দাম কমানোর আদেশ আসতে পারে, যদিও কতটা কমানো হবে তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
রাষ্ট্র সংস্কামের প্রতিশ্রুতি কেন আটকে আছে?
জুলাই অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র কাঠামোর আমূল সংস্কারের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা বাস্তবায়নে রাজনৈতিক সমঝোতা ও ক্ষমতার হিসাব নিকাশ বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পরও সংস্কারের মূল লক্ষ্য অর্জনে জটিলতা কাটেনি, যা দেশের সার্বভৌমত্ব ও স্বচ্ছ শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পথে একটি বড় চ্যালেঞ্জ।