কেনাবেচার হাট: এক সরকারি কর্মকর্তার অন্তর্দৃষ্টি
দীর্ঘ সরকারি চাকুরে জীবনের কতো-না অভিজ্ঞতা! চাকরির সূত্রে কতো না জায়গায় ঘুরেছি! দেশের আনাচে-কানাচে। কতো-না প্রত্যন্ত অঞ্চলে! কোনো জায়গায় স্বল্পকাল কাটিয়েছি। কোথাও বছরের পর বছর। দেখা পেয়েছি নানা জাতের, নানা বৈশিষ্ট্যের, নানা চেহারার জনগোষ্ঠীর। মানুষজনের সঙ্গেই ছিল আমার বরাবরের কারবার। সার্বক্ষণিক ওঠাবসা। এছাড়া আমার গত্যন্তর ছিল না। এটাই আমার চাকরির ধরন। এরা বেশিরভাগই আমার কাছে আসতে নিজেদের নানা ধান্দা-উছিলায়। কাজ উদ্ধারের মওকা করে নিতে। কাজ যতোক্ষণ ঝুলে থাকতো-ততোক্ষণ তাদের ভিন্ন এক চেহারা। বিনয় আর কৃতজ্ঞতার ভারে নুইয়ে থাকা। আবার যেই না ফাইলে আমার ইতিবাচক সই একবার হয়ে যায় তাদের চেহারা যায় পাল্টে। তখন এখানতক আসার আর দরকার হয় না তাদের। তত্ত্বাবধায়ক আর কেরানি মহলেই তাদের তখনকার পাঁয়তারা-মহড়া-জমায়েত। তাই বলে ব্যবসা-সংযোগ, জনসমাগম আর জনসংযোগের কি কমতি হয় কখনো? এই জনবহুল, সমস্যা জর্জরিত সমাজ দেশের সব অফিস-আদালতে মানুষ কাতার দিয়ে থাকে। তার ওপর এটা তো ব্যবসা-বাণিজ্য সংক্রান্ত দপ্তর। এখানে তো আরো ভিড়। একজন যায় তো অন্যজন আসে। জনজট খুলতে খুলতে আমি অতিষ্ঠ। ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত। চাকরির শেষ চক্করে বদলি হই ঢাকায়। হেড অফিসে। এখানকার ব্যবস্থাপনা উন্নত। লোকবল বেশি। ভাবলাম, এবার যদি একটু ফুরসত হয়? অবসর মেলে। গত কিছুদিনের অভিজ্ঞতায় দেখলাম, ব্যাপারটা অনেকটা তাই-ই। এখানে যখন-তখন লোকজন এসে ধরনা দিয়ে থাকে না। সশরীরে এসে হাজির হয় না। মনে মনে একটু নিশ্চিত স্বস্তি হওয়ার প্রস্তুতি নিতে নিতেই মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গেলাম অন্য এক সমস্যার। বাজতে আরম্ভ করল টেলিফোন। কথা-তদবির-উপরওয়ালার নির্দেশ আসা আরম্ভ হলো, ইন্টারকম, টেলিফোন, ই-মেইল, ফ্যাক্সের মাধ্যমে। এবার মানব সমাগম নয়। বিরক্তি আমার চরমে ওঠে যোগাযোগ মাধ্যমের আধুনিক প্রযুক্তির ওপর। একটা ছেড়েই আরেকটা ধরতে হয়। কোনো কোনো সময় দুই কানে দুই রিসিভার ধরতে হয়। ইন্টারকম, টেলিফোন এক সঙ্গে বাজতে থাকে। টেলিফোনের সংখ্যাও যেখানে একাধিক। আর যোগাযোগের বিষয়গুলো সবই বৈষয়িক। কাজ উদ্ধার। ফায়দা নেয়া। মালপানির যোগান ইত্যাদি ইত্যাদি।
দুপুরের খাওয়া-দাওয়ার পর একটু বিশ্রাম নেয়ার চেষ্টা করি। বয়স বাড়ছে। দেহে আজকাল ক্লান্তিও জমে। অফিসঘরের ডেস্ক-চেয়ার ছেড়ে পাশের হেলান কুশন চেয়ারে কিছুক্ষণ চোখ বুজে এলিয়ে থাকি। আজো তাই করছিলাম। তখন রিসেপশন থেকে ইন্টারকম বেজে ওঠে। একবার ভাবলাম, ধরব না। আবার ভাবলাম, যদি ওপরওয়ালার হয়? তখন তো বিপদ হতে পারে। রিসিভার ওঠাই।
-হ্যালো।
-আমি হরপ্রসাদ ভৌমিক বলছি স্যার। আমি কি আসতে পারি স্যার?
একবার যখন রিসিভার উঠিয়েছি। আমি বিরক্ত হয়েও জিজ্ঞাসা না করে পারি কী প্রয়োজন? লাঞ্চ আওয়ার তো এখনো শেষ হয়নি।
-স্যার...স্যার... প্রয়োজনটা খুবই সাধারণ। আবার গতানুগতিক নয়। একটু সেবামূলক...
বিরক্তি আমার চরমে উঠতে থাকে।
-দেখুন এটা সরকারি ব্যবসা-বাণিজ্যের অফিস। এখানে...সাধারণ... গতানুগতিক...সেবামূলক -- এসব কী বলছেন?
-সেটাই তো আমার কথা স্যার। সেটা বলতেই তো আসতে চাচ্ছি স্যার। শুধুমাত্র আপনার পাঁচটা মিনিট নেব স্যার। শুধু দুটো কথা...গ্রন্থাগার সম্পর্কিত। বেয়াদবি মাফ করবেন। আসব স্যার?
বিতৃষ্ণা চেপে অপারগ তাকে আসতে বলি। কিছুটা কৌতূহল বোধ করলাম। লোকটা একটা ব্যস্তসমস্ত সরকারি অফিসে এসে বিনয় এবং দৃঢ়তার সঙ্গে কথা বলছে। বিষয়টাও অদ্ভুত!...গ্রন্থাগার! এসব ভাবতে ভাবতে আমার বন্ধ ঘরের দরজায় টোকা পড়ল। দরজা খুলে গেল।
আসতে পারি স্যার? আমি মাথা নাড়ি। সে সরাসরি এসে আমার মুখ বরাবর চেয়ারে বসে পড়ে। তার পায়ের পাশে হাততিনেক লম্বা বড় কালো একটা হ্যান্ড-ব্যাগ রাখে সে। যত্ন সহকারে।
হরপ্রসাদ ভৌমিক বিনম্র উজ্জ্বল হাসে।
স্টুডিও থেকে এলাম। কোন স্টুডিও? এফডিসি। সিনেমার শুটিং করে এলাম। আমি কিছুটা অবাক হয়ে সোজা হই। তার মানে? তার মানে স্যার...আমি আর্টিস্ট...অভিনেতা...। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাই। তখন মনে হলো, বিরক্তিতে তাকে ভালো করে আমি দেখিনি। লক্ষ্য করিনি।
এই ঘটনা আমাদের স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের সমাজের এক গভীর চিত্র তুলে ধরে। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আমাদের শেখায়, প্রতিটি মানুষের মর্যাদা রক্ষা করা। কিন্তু সরকারি অফিসের এই কেনাবেচার হাট যেন সেই চেতনার বিপরীত। ব্যবসা-বাণিজ্যের নামে যেখানে মানবিকতা হারিয়ে যায়, সেখানে আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়া কঠিন। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত আমাদের সংগ্রাম ছিল একটি শোষণমুক্ত সমাজ গড়ার। সেই পথে আমাদের ফিরে যেতে হবে।
প্রশ্নোত্তর
এই লেখায় কী বার্তা দেওয়া হয়েছে?
লেখাটি সরকারি অফিসের কেনাবেচার মানসিকতা এবং মানবিকতার অভাব তুলে ধরে। এটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে বর্তমান সমাজের বৈপরীত্য দেখায়।
হরপ্রসাদ ভৌমিক কে?
হরপ্রসাদ ভৌমিক একজন অভিনেতা যিনি এফডিসি থেকে এসেছেন। তিনি গ্রন্থাগার সম্পর্কিত একটি সেবামূলক প্রস্তাব নিয়ে সরকারি কর্মকর্তার কাছে এসেছিলেন।
লেখাটি কেন প্রাসঙ্গিক?
এটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী সমাজের বাস্তবতা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মধ্যে ব্যবধান দেখায়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জনের জন্য মানবিক মূল্যবোধ পুনরুদ্ধার জরুরি।