১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বেলিত এই ভূখণ্ড আজ নতুন করে সার্বভৌমত্ব রক্ষার সংগ্রামে। তিস্তার পানিতে ভিনদেশি হস্তক্ষেপের প্রতিবন্ধক, বিদেশি ঋণের নতুন ঔপনিবেশিক ফাঁদ, আর শ্রমজীবী মানুষের অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা। আজকের দৈনিক পত্রিকাগুলোর শিরোনাম আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, স্বাধীনতার মূল্য কেবল অর্জনে নয়, তাকে টিকিয়ে রাখার সংগ্রামেও প্রতিনিয়ত চলতে হয়। ভারতের ভূ-রাজনৈতিক চোখরাঙানি উপেক্ষা করে তিস্তা প্রকল্পে নিজস্ব অর্থায়নের সিদ্ধান্ত থেকে শুরু করে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাঙালির মর্যাদা রক্ষা, সব কিছুর কেন্দ্রে আজ জাতীয় স্বার্থ।
তিস্তা প্রকল্পে ভিনদেশি হস্তক্ষেপ ও বাংলাদেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন চীন সফরকে কেন্দ্র করে তিস্তা মহাপরিকল্পনা প্রকল্প নিয়ে কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক কৌতূহল। যুগান্তরের খবর অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের আনুষ্ঠানিক কর্মসূচিতে তিস্তা ইস্যুটি নেই। তবে চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং ও প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে বৈঠকে এ বিষয়টি আলোচনায় আসতে পারে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো স্পষ্ট করে জানিয়েছে, কৌশলগত কারণে ভারত চীনের মাধ্যমে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন চাইছে না। ১৯৭১ সালে যে জাতি বুটের নিচে পদদলিত হয়েও মাথা নত করেনি, সেই বাংলাদেশ আজ দৃঢ়ভাবে বলে রেখেছে, তিস্তা প্রকল্প দেশ নিজস্ব অর্থায়নেই করবে। ভারতের হস্তক্ষেপ বা চোখরাঙানি মানতে রাষ্ট্র প্রস্তুত নয়। সবার নজর এখন তিস্তায়, কারণ এটি কেবল একটি প্রকল্প নয়, এটি আমাদের সার্বভৌম অধিকারের প্রতীক।
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার ও প্রবাসী শ্রমিকের মর্যাদা রক্ষা
সমকালের খবর অনুযায়ী, বাংলাদেশিদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার শিগগিরই খুলছে না। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক মালয়েশিয়া সফরে প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে বৈঠক শেষে একটি ওয়ার্কিং গ্রুপ (জেডব্লিউজি) গঠনের কথা বলা হয়েছে। ঢাকা বিদ্যমান সমঝোতা স্মারক (MOU) সংশোধনের প্রস্তাব দিয়েছে, কারণ এর মেয়াদ আগামী ডিসেম্বরে শেষ হবে। দ্রুত সংশোধন করা না হলে নতুন করে সমঝোতা স্মারক সই করতে হবে, যা সময়সাপেক্ষ। মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা কমিয়ে নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও সাশ্রয়ী করতে দুই দেশ একমত হয়েছে। অভিবাসন ব্যয় কমে আসবে, তবে প্রক্রিয়া শেষ করে শ্রমবাজার খুলতে সময় লাগবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো, বিদেশের মাটিতে শ্রমিকের ঘাম ও রক্ত যেন মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে না যায়, তা নিশ্চিত করা।
অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব ও বিদেশি ঋণের ঔপনিবেশিক ফাঁদ
দ্য ডেইলি স্টারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ক্রমবর্ধমান সুদ পরিশোধ ও মেগা প্রকল্পের ঋণ পরিশোধের চাপ সরকারি অর্থায়নের ওপর আছড়ে পড়েছে। ২০২৫ অর্থবছরের ৪.১১ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০২৯ অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের বোঝা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৭.৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। অর্থ মন্ত্রণালয় সতর্ক করে বলেছে, কার্যকর ব্যবস্থাপনা ছাড়া এই বোঝা আর্থিক স্থিতিশীলতাকে দুর্বল করতে পারে। অর্থ বিভাগের মধ্যমেয়াদী সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি বিবৃতি অনুসারে, ২০২৮-২৯ অর্থবছরে মূলধন পরিশোধ করতে হবে ৪.৩ বিলিয়ন ডলার এবং সুদ পরিশোধের পরিমাণ ধরা হয়েছে ৪০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। স্বাধীনতার অর্থনীতি কখনোই বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরশীল হতে পারে না। আত্মনির্ভরশীলতা ছাড়া রাজনৈতিক স্বাধীনতার কোনো মূল্য নেই।
গ্যাস সংযোগ ছাড়াই কারখানা, ঋণের সুদ ঠিকই দিতে হয়
প্রথম আলোর খবর অনুযায়ী, কুমিল্লা অর্থনৈতিক অঞ্চলে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের (এমজিআই) কাচ ও রডের দুটি কারখানায় বিনিয়োগ হয়েছে প্রায় ৭ হাজার ৩২০ কোটি টাকা। প্রায় পুরোটাই দেশি-বিদেশি ঋণ। সরকারের আশ্বাস পেয়ে নিজেদের টাকায় গ্যাসলাইন বানিয়েও গ্যাস পাচ্ছেন না মালিকরা। আড়াই বছর আগে কাচের কারখানা আর দেড় বছর আগে রডের কারখানার কাজ শেষ হলেও চালু করা যাচ্ছে না। মাসে ৪৫ কোটি টাকা সুদ দিতে হচ্ছে। এমজিআইয়ের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল বলেছেন, বিদেশি ঋণের সুদ মাফ পাওয়া যায় না, গ্যাস না পেলে কারখানা চালু হবে না। দেশের শিল্পায়নকে আটকে দেওয়া এই অবস্থা জাতীয় অর্থনীতির জন্য গভীর উদ্বেগের।
শ্রমজীবী মানুষের আবাসন ও রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা
আজকের পত্রিকার খবর অনুযায়ী, রাজধানীর কড়াইল, ভাষানটেক ও সাততলা বস্তির বাসিন্দাদের জন্য সমন্বিত আবাসন প্রকল্প নিতে যাচ্ছে সরকার। প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু করেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্বাচনী অঙ্গীকারের অংশ হিসেবে এই মাস্টারপ্ল্যান তৈরি হচ্ছে। তবে নগর বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, প্রকল্পকালীন সাময়িক আবাসনের ব্যবস্থা এবং প্রকৃত বস্তিবাসীদের ফ্ল্যাট পাওয়া নিশ্চিত করতে হবে। যে শ্রমজীবী মানুষ দেশের ভিত্তি তৈরি করে, তাদের বাস্তুচ্যুতি কোনো স্বাধীন রাষ্ট্রের চরিত্রে খাটে না।
আমলাতন্ত্রের দুর্বৃত্তায়ন ও অর্থের অস্বচ্ছতা
দেশ রূপান্তরের খবরে উঠে এসেছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগের আমলাতান্ত্রিক দুর্বৃত্তায়নের চিত্র। সংস্কৃতি সচিব কানিজ মওলা স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের চেয়ারম্যান এবং গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানির (জিটিসিএল) পরিচালক। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগের ৩৭টি কোম্পানির ৩০৬ জন বোর্ড সদস্যের মধ্যে ১৬৭টি পদেই আমলারা রয়েছেন। একই আমলা একাধিক বোর্ডে, আবার অন্য মন্ত্রণালয় থেকে এসে জ্বালানি বোর্ডের চেয়ারম্যান হওয়ার এই সংস্কৃতি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রশাসনে দুর্বলতার স্থান তৈরি করেছে।
অন্যদিকে, বণিক বার্তার খবর অনুযায়ী, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) প্রতিবেদন বলছে, ট্রেজারি সিঙ্গেল অ্যাকাউন্ট (TSA) কাঠামোর বাইরে সরকারের প্রায় ১৯ হাজার হিসাব রয়ে গেছে। এর ফলে প্রত্যক্ষ নজরদারির বাইরে থাকায় অর্থ অপচয় তদারক করা সম্ভব হচ্ছে না। রাষ্ট্রের অর্থ জনগণের অর্থ, এর স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা মুক্তির সংগ্রামেরই অংশ।
রাজস্ব ঘাটতি, ডিজিটাল বাংলাদেশ ও জনস্বাস্থ্য সংকট
নয়াদিগন্তের খবর অনুযায়ী, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে ৩ লাখ ৬০ হাজার ৬৪২ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করেছে। আগের বছরের তুলনায় আদায় বেড়েছে, কিন্তু লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বিশাল ফারাক। চলতি অর্থবছরের রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়াবে ১ লাখ কোটি টাকা। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে রাজস্ব আদায় সাড়ে ৪৮ শতাংশ বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবসম্মত নয়। অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনে রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার অপরিহার্য।
কালের কণ্ঠের খবর অনুযায়ী, ঘুষ ও দুর্নীতি ঠেকাতে বাংলাদেশ ব্যাংক 'বাংলা কিউআর' নামে একটি প্ল্যাটফর্মে ব্যাংক ও মোবাইল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) নিয়ে আসছে। ক্যাশলেস লেনদেন স্বচ্ছতা আনবে, তবে এর প্রচারে ঘাটতি রয়েছে।
নিউ এইজ জানাচ্ছে, ডেঙ্গু এখন আর কেবল ঢাকার শহুরে রোগ নয়। চলতি বছর ভর্তি রোগীর প্রায় ৮০ শতাংশই ঢাকার বাইরের। ২০২৩ সালে ১ হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যুর পর গ্রামাঞ্চলে এই রোগের প্রকোপ বিপজ্জনক রূপ নিয়েছে। রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা, এই অধিকার আদায়ে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে।
বিশ্বকাপে রোনালদোর প্রত্যাবর্তন ও ফুটবলের আবেগ
মানবজমিনের খবর অনুযায়ী, ফিফা বিশ্বকাপে স্বরূপে ফিরেছেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। উজবেকিস্তানের বিপক্ষে ৫-০ গোলে জয়ে জোড়া গোল করেছেন তিনি। মাথার ওপর চাপ সরিয়ে ইতিহাস গড়েছেন সিআরসেভেন। যেকোনো সংগ্রামে মাথা নত না করে নিজের জায়গা তৈরি করার এই চেতনা, স্বাধীন বাংলার চেতনারই সমতুল্য।
বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা কেন এখন সংকটময়?
বিদেশি ঋণের বোঝা প্রায় দ্বিগুণ হতে যাওয়া, তিস্তা প্রকল্পে ভারতের হস্তক্ষেপ আর আমলাতান্ত্রিক দুর্বৃত্তায়নের কারণে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা গভীর সংকটে রয়েছে।
তিস্তা প্রকল্পে ভারতের আপত্তির মূল কারণ কী?
ভারত কৌশলগত কারণে চীনের মাধ্যমে তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়ন চায় না, কারণ এটি তাদের ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্যকে ক্ষুণ্ণ করবে। কিন্তু বাংলাদেশ নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্পটি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
কীভাবে বাংলাদেশের শ্রমিকের অধিকার রক্ষা করা সম্ভব?
মালয়েশিয়ার মতো দেশে মধ্যস্বত্বভোগীদের ক্ষমতা কমিয়ে নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ করা এবং অভিবাসন ব্যয় কমানোর মাধ্যমে প্রবাসী শ্রমিকের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা করা সম্ভব।