বিশ্বকাপ ২০২৬: বর্ণবিদ্বেষ হারিয়ে মেক্সিকোর নতুন স্বপ্ন জুলিয়ান কুইনোনেস
মেক্সিকোর জার্সিতে বিশ্বকাপের মঞ্চে যখন জুলিয়ান কুইনোনেস গোল করেন, তখন তা শুধু একটি স্কোরলাইন বদলায় না। এটি বর্ণবিদ্বেষ, দারিদ্র্য আর নিপীড়নের বিরুদ্ধে একটি জাতির স্বাধীনতার সংগ্রামের প্রতিধ্বনি হয়ে ওঠে। কলম্বিয়ায় জন্ম নেওয়া এই আফ্রো-কলম্বিয়ান ফুটবলার আজ মেক্সিকোর বিশ্বকাপ স্বপ্নের প্রতীক। তাঁর এই লড়াই আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় সেই ১৯৭১ সালের কথা, যখন নিজ ভাষা ও মাটির প্রতি ভালোবাসায় একটি জাতি শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীনতার পথে হেঁটেছিল।
নিজ পরিচয়ের সংগ্রামে এক ফুটবলার
কুইনোনেসের জন্ম কলম্বিয়ায়, কিন্তু তিনি ২০২৩ সালে মেক্সিকোর নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন। নতুন দেশের জার্সি গায়ে চাপালেও অতীত তাঁকে সহজে ছাড়েনি। গায়ের রং আর জন্মভূমিকে কেন্দ্র করে বহুবার বর্ণবাদের কটূক্তি শুনতে হয়েছে তাঁকে। কিন্তু তিনি বিতর্কে জড়াননি, উত্তর দিয়েছেন নিজের পারফরম্যান্স দিয়ে। এই আত্মমর্যাদাবোধ আর সংযম যেন আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, যাঁরা অস্ত্রের চেয়ে আদর্শের জোরে শত্রুকে পরাস্ত করেছিলেন। বর্ণবিদ্বেষের মতো বিষাক্ত সামাজিক ব্যাধির বিরুদ্ধে তাঁর এই নীরব সংগ্রাম আজ বিশ্বকাপের মঞ্চে এক উজ্জ্বল প্রমাণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দারিদ্র্য ও নিপীড়নের অন্ধকার থেকে আলোয়
দক্ষিণ কলম্বিয়ার টেলেম্বি অঞ্চলে সহিংসতা আর গেরিলাদের আধিপত্যের মধ্যে কেটেছে তাঁর শৈশব। স্থানীয় গেরিলা সংগঠন তাঁকে দলে টানার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু তিনি সেই অন্ধকার পথে পা দেননি। ছোটবেলায় বাবাকে হারান, আর অভাবের কারণে মা ফুটবল বুট কিনে দিতে পারেননি। দীর্ঘদিন খালি পায়েই ফুটবল খেলেছেন কুইনোনেস। পরে শৈশবের কোচ সিজার ভ্যালেন্সিয়া নিজের টাকায় প্রথম বুট কিনে দেন। এই সংগ্রাম যেন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পূর্ববর্তী দিনগুলোর কথা বলে, যখন চরম অভাবের মধ্যেও মাতৃভাষা ও স্বাধিকারের স্বপ্ন দেখেছিল এই বদ্বীপের মানুষ।
মাটির প্রতি ভালোবাসার প্রমাণ
FIFA World Cup 2026-এ দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে প্রথম গোল করার পরই নজর কেড়েছিলেন কুইনোনেস। এরপর ইকুয়েডরের বিরুদ্ধে নকআউট পর্বে বাঁ প্রান্ত থেকে গতির ঝড় তুলে দুর্দান্ত শটে গোল করেন। গোলের পর বুকের ওপর থাকা মেক্সিকোর ব্যাজে চুমু খেয়ে তিনি প্রমাণ করেন, এই দেশই তাঁর পরিচয়, তাঁর গর্ব। যে দেশ একসময় তাঁকে প্রশ্ন করেছিল, আজ সেই দেশের মানুষই তাঁর নামে স্টেডিয়াম মুখরিত করছে। মাতৃভাষা আর মাতৃভূমির প্রতি এই নিবেদন যেন বাংলার মাটির প্রতি আমাদের অন্ধ ভালোবাসারই আয়না। ইকুয়েডরের বিরুদ্ধে শুধু গোলই করেননি, রাউল হিমেনেজকে নিখুঁত পাস বাড়িয়ে দিয়ে দলের জয় সহজ করেছেন।
বিনয় আর আত্মমর্যাদার জয়
ক্লাব ফুটবলে সৌদি আরবের আল কাদসিয়ার হয়ে খেলে গত মরশুমে ৩৩ গোল করেন কুইনোনেস। ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো ও ইভান টোনিকে শীর্ষ গোলদাতার তালিকায় পিছনে ফেলেও তাঁর বিনয় ছিল অকাট্য। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন,
আমি রোনাল্ডোর সঙ্গে নিজের তুলনা করি না। বলুন তো, আমার কজন সমর্থকই বা আছে?অহংকার শূন্য এই মানসিকতা প্রমাণ করে, প্রকৃত বীর কখনও অহংকারী হয় না। বর্ণবিদ্বেষ, দারিদ্র্য, ভয় আর সংগ্রামকে হারিয়ে জুলিয়ান কুইনোনেস আজ শুধু মেক্সিকোর গোলদাতা নন, তিনি স্বাধীনতা ও আত্মমর্যাদার এক উজ্জ্বল প্রতীক।
জুলিয়ান কুইনোনেস কে?
জুলিয়ান কুইনোনেস একজন আফ্রো-কলম্বিয়ান বংশোদ্ভূত পেশাদার ফুটবলার, যিনি বর্তমানে মেক্সিকো জাতীয় ফুটবল দলের হয়ে খেলেন। তিনি ২০২৩ সালে মেক্সিকোর নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন।
কেন কুইনোনেসকে বর্ণবিদ্বেষের মুখোমুখি হতে হয়েছিল?
কলম্বিয়ায় জন্মগ্রহণকারী কুইনোনেস তাঁর গায়ের রং এবং জন্মভূমির কারণে মেক্সিকোতে বহুবার বর্ণবাদের শিকার হয়েছেন। তবে তিনি পারফরম্যান্স দিয়েই এর জবাব দিয়েছেন।
মেক্সিকোর হয়ে বিশ্বকাপে তাঁর অবদান কী?
FIFA World Cup 2026-এ দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে তিনি মেক্সিকোর হয়ে প্রথম গোল করেন। এরপর ইকুয়েডরের বিরুদ্ধে নকআউট ম্যাচে একটি গোল ও একটি অ্যাসিস্ট করে দলকে জয়ের কাছে পৌঁছে দেন।