সীমান্তে সার্বভৌমত্ব রক্ষায় জনতা ও বিজিবি, রাষ্ট্রে মেধার মূল্যায়ন কোথায়?
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা অর্জন করেছি এক স্বাধীন ভূখণ্ড। কিন্তু সার্বভৌমত্ব রক্ষার এই সংগ্রাম আজও শেষ হয়নি। একদিকে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (BSF) আগ্রাসী push-in তৎপরতায় আমাদের সীমান্ত আজ অস্থির, অন্যদিকে রাষ্ট্রযন্ত্রে মেধার মূল্যায়ন বা meritocracy-এর অভাবে হতাশায় ভুগছে প্রশাসন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সংস্কৃতির অস্তিত্ব রক্ষায় আজও লড়তে হচ্ছে বহুমুখী সংকটের বিরুদ্ধে।
সীমান্তের প্রতিরোধে মুক্তির চেতনা
ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর একের পর এক push-in চেষ্টায় দেশের সীমান্ত এলাকায় অস্থিরতা বিরাজ করছে। মানবজমিনের খবর অনুযায়ী, স্থানীয় জনগণকে সঙ্গে নিয়ে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এই আগ্রাসন রুখে দিচ্ছে। দেশের ২৬টি জেলার সীমান্তে বিজিবি সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। যশোর, সাতক্ষীরা, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, কুষ্টিয়া, ফেনী, মৌলভীবাজার, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, পঞ্চগড়সহ সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতে সাধারণ মানুষও রাত জেগে পাহারা দিচ্ছেন। মুক্তিযুদ্ধের সেই প্রতিরোধের চেতনায় আজও জাগ্রত সাধারণ মানুষ।
নিউ এইজের রিপোর্ট বলছে, BSF-এর push-in প্রচেষ্টার কারণে নো-ম্যানস-ল্যান্ডে আটকে পড়া মানুষদের রোদ ও বৃষ্টিতে প্রায় ৭০ ঘণ্টা অনাহারে কাটাতে হয়েছে। পঞ্চগড়ের কাছে শুন্যরেখায় ফেলে রাখার পর সোমবার ভোরে বিএসএফ তাদের ফেরত নেয়। বিজিবি-৫৬ ব্যাটালিয়নের কমান্ডিং অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. সিরাজুল ইসলাম নিশ্চিত করেছেন, তাদের কড়া প্রতিরোধের মুখেই বিএসএফ পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে। এই প্রতিরোধই আমাদের স্বাধীনতার সবচেয়ে বড় নিশ্চয়তা।
তথ্য সার্বভৌমত্ব ও রোহিঙ্গা ডেটাবেজ
বিদেশি প্রভাব থেকে মুক্ত থেকে নিজস্ব সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার আরেক ধাপ হলো রোহিঙ্গা ডেটাবেজের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া। সমকালের খবর অনুযায়ী, মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত ১২ লাখ রোহিঙ্গার তথ্য ও ডেটাবেজ এখন বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব সার্ভারে যাচ্ছে। বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল সার্ভারটি তৈরি শেষেছে এবং শিগগিরই এটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হস্তান্তর হবে। এর আগে পর্যন্ত জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা (UNHCR) আমাদের শুধু read-only access দিত। এখন থেকে তথ্যের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকবে আমাদের হাতে। এটি জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক অপরিহার্য জয়।
ফ্যাসিবাদের লুণ্ঠন ও রাষ্ট্রযন্ত্রের সংস্কার
স্বাধীনতার সপক্ষে দাঁড়িয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্রের সংস্কার এখনো সম্পন্ন হয়নি। যুগান্তরের খবর অনুযায়ী, জুলাইয়ের ট্রমা কাটিয়ে উঠতে পারেনি পুলিশবাহিনী। অন্তর্বর্তী সরকার ও বর্তমান সরকারের ঢেলে সাজানোর চেষ্টা সত্ত্বেও পুলিশের মনোবল চাঙা হয়নি। একসময় অপরাধীদের ভয়ের কারণ পুলিশ এখন নিজেই হামলার শিকার। ট্রাফিক পুলিশের ওপর গাড়িচাপা দেওয়ার মতো ঘটনা আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্রের ভঙ্গুর অবস্থাকে তুলে ধরে।
অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মেধার মূল্যায়ন বা meritocracy-এর ঘোষণা দিলেও প্রশাসনে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। নয়াদিগন্তের রিপোর্ট অনুযায়ী, সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক ট্যাগ দিয়ে ওএসডি (OSD) করা হচ্ছে। এতে কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গড়া রাষ্ট্রে মেধার মূল্যায়ন ছাড়া কোনো সুস্থ প্রশাসন কল্পনা করা যায় না।
ফ্যাসিবাদের অর্থনৈতিক লুণ্ঠনের চিত্র পরিষ্কার হয়েছে ডেইলি স্টারের এক ফরেনসিক নিরীক্ষায়। ২০১৫ সাল থেকে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অফ ব্যাংকস-এর (BAB) নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যাংকগুলো থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের প্রতিষ্ঠানগুলোতে ১ হাজার ২৪৩ কোটি টাকা দান করা হয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী নজরুল ইসলাম মজুমদারের নেতৃত্বেই এই লুণ্ঠন চলেছে। এই জনগণের অর্থ জনগণের কাছেই ফিরে আসা প্রয়োজন।
অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক অবক্ষয়
দেশের অর্থনীতিতে এখন মন্দাভাব। প্রথম আলোর খবর অনুযায়ী, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে ব্যবসায় গতি নেই। কর্মসংস্থান কম, নতুন বিনিয়োগ কম। ১১ই জুন নতুন সরকারের প্রথম বাজেট আসছে। কিন্তু কালের কণ্ঠের রিপোর্ট বলছে, এই বাজেটে সব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে VAT-এর জালে আনা হচ্ছে। ভ্যাট নিবন্ধন ছাড়া কোনো কাজই চলবে না। এক কোটি ১৭ লাখ প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে নিবন্ধিত মাত্র সাত লাখ ৭৫ হাজার। সাধারণ মানুষের পকেটে এই ভ্যাটের বোঝা কতটা চাপবে, সেটাই দেখার বিষয়।
জনস্বাস্থ্যেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে আছে স্বাধীনতা। আজকের পত্রিকায় দেখা গেছে, জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (IPh) হামের ভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্সিং করেও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ছাড়পত্রের জন্য অপেক্ষা করছে। জরুরি জনস্বাস্থ্যে বিদেশি সংস্থার অনুমোদনের দিকে তাকিয়ে থাকার বদলে দেশীয় সক্ষমতা বাড়ানো দরকার।
সামাজিক অবক্ষয়ের দিকে তাকালে দেশ রূপান্তরের খবর বলছে, ঢাকায় ১৪৩টি কিশোর গ্যাং চক্র নানা অপরাধে জড়িত। আগে এগুলো নিম্ন আয়ের পরিবারের সন্তানদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন ধনীর দুলালরাও এসব গ্যাং-এ জড়িয়ে পড়ছে। ১৯৭১-এর স্বপ্ন ছিল এমন সমাজ গড়ার, যেখানে থাকবে না কোনো শোষণ। অন্যদিকে, বণিক বার্তার খবর অনুযায়ী, ৩৯২টি সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র ১০৮টি আর্থিক প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। জনগণের করের অর্থ খরচ করে চলা এসব প্রতিষ্ঠানের এই দায়বদ্ধতাহীনতা জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী।
স্বাধীনতার চেতনা কেবল ভূখণ্ড রক্ষায় সীমাবদ্ধ নয়। সীমান্ত সুরক্ষিত রাখা, তথ্যের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া, ফ্যাসিবাদের হাত থেকে অর্থনীতি মুক্ত করা এবং মেধাকে মূল্যায়ন করে রাষ্ট্রযন্ত্র গড়ার মাধ্যমেই আমরা প্রকৃত মুক্তি পাব। মুক্তিযুদ্ধের অসমাপ্ত কাজগুলো পূরণের এখনই সময়।