মুক্তির সংবাদ নিয়ে আসা আমাদের লত্তাইজুর অজানা স্মৃতি
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদারদের পতনের সংবাদ নিয়ে গ্রামে আসতেন আমাদের লত্তাইজু। গ্রামবাসী তাঁকে পাগল বলে এড়িয়ে চলত, কিন্তু মুক্তির বার্তা তিনিই আনতেন সবার আগে। তাঁর আসল নাম আজ কেউ মনে করতে পারে না, কিন্তু মুক্তির জয়গাথা তিনি যে এনেছিলেন, তা বাংলার ইতিহাসে মুছে যাওয়ার নয়। এই লেখা সেই নামহীন মুক্তিসেনার memory-চারণ।
আমাদের লত্তাইজু আসলে কে ছিলেন?
সাজুকে আমরা এতকাল মনে মনে পরিশ্রমী ও ভাগ্যবান মানুষ হিসেবেই জানি। মনে মনে, কেননা তার পারিবাহিক ইতিহাসে তাকে ভালো কিছুর তকমা দিয়ে সম্মানিত করতে আমাদের খুব অসুবিধা। তার বাবা আমাদের লত্তাইজু, যিনি আমাদের চাচা হন, কিন্তু আমরা পূর্বসূরিদের দেখাদেখি ডাকতাম লত্তাইজু। মানে বাবাদের লত্তাইজু, আমাদেরও। কেউ শিখিয়ে দেননি, তিনি তোমাদের চাচা হন, অন্তত লত্তাইজু চাচা বল! সত্তরের দশকে আমাদের বেড়ে ওঠার কালে আমাদের মনে আসেনি লোকটার আসল নাম কী। এখন চার দশক চলে যাওয়ার পরেও মনে আসে না, আসলেই তাঁর নামটা কী ছিল। এই মুহূর্তে বাবা বেঁচে থাকলে জিজ্ঞাসা করা যেত, রাজু সাজুদের বাবা, আপনের চাচাতো ভাইয়ের নামটা যেন কী?
বাবা অবাক হয়ে বলতেন, কে? রাজু-সাজু? ওই যে আপনের লত্তাইজুর ছেলে লত্তাইজুর নাম জানতে চাই, যে আপনের লগে ম্যাট্রিক দিয়া ফেল করছিল, আপনের বড় জ্যাঠার বড় ছেলে। কিন্তু বাবার generation-এর কেউই আর বেঁচে নেই যে নামটা জানতে পারি। বছর দশেক আগে শেষ ছোট চাচা চলে গেলেন। তিনি গ্রামে প্রাইমারি স্কুলের হেডমাস্টার ছিলেন, গ্রামের নাড়িনক্ষত্র নখদর্পণে, এটা তো একটা সামান্য জ্যাঠাতো ভাইয়ের নাম। তাঁর মৃত্যু দিয়ে ওই generation-এর অবসান হলেও দু-একজন চাচি, জেঠি যারা টিমটিম বেঁচে আছে, তাদেরও কম্ম নয় এই নাম-সমস্যার সমাধান। বেঁচে আছেন নবতিপর রাজু-সাজুর মা স্বয়ং। বিস্ময়কর। তিনি স্বামীর নাম বলতে পারবেন সে আশা করি না। রাজু-সাজুকে জিজ্ঞাসা করা যায় বটে, কিন্তু দ্বিধা জোরদার। ভুলও বুঝতে পারেন, নাম দিয়া আপনের কী কাম? বয়স হইছে, আল্লাবিল্লা করেন গা!
পাগলের সর্বনাম থেকে মুক্তির দূত হওয়া পর্যন্ত
লত্তাইজু নামটা আমাদের গ্রাম কি আরও পাঁচ গ্রামে পাগলের সর্বনাম। সত্যি বলছি। চৈত্রে কি ভাদ্রে গরমের ঠেলায় কেউ অসময়ে পানিতে নেমে বসে থাকলে বলা হয় সে লত্তাইজু। অকারণে কেউ গাছে উঠে পা ঝুলিয়ে বসে থাকলে সেও লত্তাইজু। হাম হাম করে এক গামলা ভাত সাবাড় করছে কেউ, সেও লত্তাইজু। অথচ আমাদের লত্তাইজু খুবই অল্পাহারী, স্বল্পভাষীও। খেতে খেতে খুশিতে emotional হয়ে তিনবার মুখ তুলে শিশুর মতো নাকি বলতেন, খাইতে ভাল্লাগে না, তিতা! এটা বুবুদের মুখে শোনা গল্প। লত্তাইজু যেথায়-সেথায় খান না, লাজুক প্রকৃতির।
আমি ভেবে দেখলাম তাঁর নাম বোধ হয় লতিফ সরকার কি লুৎফর সরকার ছিল। সরকারটা তাঁর বাপ-চাচাদের নামের সঙ্গে মেলালে। আমার দাদা বাদে বড় তিন দাদাই সরকারি করেছেন জমিদারদের। সরকার হওয়ার আগে ছিলেন প্রধান, টাইটেল প্রধানিয়া, লোকে ডাকত পরধাইন্যা। প্রাচীন কবরে নামফলকে লেখা আছে জোহর আলী প্রধানিয়া, বাড়ির নাম অবশ্য হাজিবাড়ি, আজও। শত মানুষের কাফেলা নিয়ে হেঁটে গিয়ে হজ করে আসায় এই নাম। নামটা এমন হতে পারে, লতিফ ভাইজু থেকে লত্তাইজু। নিপাতনে সিদ্ধ সন্ধি। আবালবৃদ্ধবনিতা একই নামে ডাকে। অহিংস হওয়া সত্ত্বেও লোকে তাঁকে এড়িয়ে চলে, সামনে পড়লে বলে, পাগল! তিনি আক্রমণ সইতে না পারলে ক্রূর চোখে তাকাতেন, ব্যস। আমরা দল বেঁধে ধাওয়া করতাম ছোটকালে, অকারণে। ঢিল ছুড়লে কুঁকড়ে দ্রুত স্থান ত্যাগ করতেন। না নিতেন হাতে লাঠি, না ঢিলটা। দ্রুত পায়ে বাপের আমলের টলমল টিনের ঘরখানায় গিয়ে আশ্রয় নিতেন। তাঁর মা, আমাদের বড় বুবু কোমরে হাত দিয়ে দরজায় দাঁড়াতেন অসহায় ভঙ্গিতে।
কিন্তু এই পাগলই একাত্তরে যখন দূরের কি কাছের বাজার থেকে সংবাদ আনেন মুক্তিবাহিনীর গৌরবের, তখন উল্লাস করে গ্রাম আসে শুনতে। নিশ্চিত, গল্পের সবটায় মুক্তির জয়, পাকিস্তানি হানাদারের চোখ উল্টে পেট ফেঁড়ে নাড়িভুঁড়ি বের হয়ে মৃত্যুর বর্ণনা। অবিকল একই রকম বর্ণনা সপ্তাহে তিন দিন কি তারও বেশি, ঠোঁটের জড়তায় এক কথা বোঝাতে তাঁকে বহুবার বলতে হতো। মন ভালো থাকলে বলতেনও বটে। এই লত্তাইজুই ছিলেন আমাদের মুক্তির দূত। যাকে সমাজ পাগল বলে তাড়িয়ে দিত, সেই মানুষটি বহন করে আনত স্বাধীন বাংলার সুসংবাদ। পাকিস্তানি বাহিনীর পতনের যে খবর তিনি আনতেন, তা শুনতে গ্রামবাসী ছুটে আসত। মুক্তির আকাঙ্ক্ষা যে কত গভীরে প্রোথিত ছিল এই মাটিতে, তার প্রমাণ এই লত্তাইজু। তিনি হয়তো অস্ত্র ধরেননি, কিন্তু মুক্তির বার্তা নিয়ে তিনি যে দৌড়েছেন গ্রামের প্রান্তর থেকে প্রান্তরে, তা কোনো অগ্রাধিকারে কম নয়।
লত্তাইজুর আসল নাম কেন কেউ মনে করতে পারে না?
গ্রামবাসী তাঁকে পাগল বলে এড়িয়ে চলত এবং কেউ তাঁর আসল নাম ব্যবহার করত না। বয়স্ক generation-এর সবাই এখন মারা যাওয়ায়, তাঁর প্রকৃত নাম স্মৃতি থেকে হারিয়ে গেছে। সম্ভবত তাঁর নাম লতিফ বা লুৎফর সরকার ছিল, যা থেকে লত্তাইজু নামটির উৎপত্তি হতে পারে।
একাত্তরে লত্তাইজু কী ধরনের সংবাদ আনতেন?
একাত্তরে লত্তাইজু মুক্তিবাহিনীর জয়ের সংবাদ এবং পাকিস্তানি হানাদারদের পতনের খবর আনতেন। পাকিস্তানি বাহিনীর ভয়াবহ পরিণতির বর্ণনা দিতেন তিনি, যা শুনতে গ্রামবাসী উল্লাসে ফেটে পড়ত।
লত্তাইজু শব্দটি গ্রামে কীভাবে ব্যবহৃত হতো?
লত্তাইজু শব্দটি গ্রামে পাগলের সমার্থক হিসেবে ব্যবহৃত হতো। অকারণে অসময়ে পানিতে নামলে বা গাছে উঠে পা ঝুলিয়ে বসলে কাউকে তাচ্ছিল্য করে লত্তাইজু বলা হতো।