বীরভূমের পর এবার মালদহ। নিষিদ্ধ কফ সিরাপ পাচারের কালো টাকার ভান্ডার উন্মোচন করল পুলিস। রবিবার মধ্যরাত থেকে ভোররাত পর্যন্ত টানা অভিযান চালিয়ে মালদহের মঙ্গলবাড়ি এলাকার একটি ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার করা হয়েছে নগদ ২ কোটি ৪০ লক্ষ ৯৭ হাজার ৩৮০ টাকা। পাশাপাশি উদ্ধার হয়েছে ৭ হাজারেরও বেশি বোতল নিষিদ্ধ কফ সিরাপ এবং বিপুল পরিমাণ সোনা। এই অভিযান বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে মাদক ও কালো টাকার চক্রের বিরুদ্ধে বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কিভাবে মেলে এই অভিযানের সূত্র?
গত ৫ জুলাই দক্ষিণ দিনাজপুরের মেহেন্দ্রীপাড়ায় অভিযান চালিয়ে ১,৫০০ বোতল নিষিদ্ধ কফ সিরাপসহ ৪ জন পাচারকারীকে গ্রেফতার করেছিল পুলিস। ধৃতদের জেরা করেই পুলিস জানতে পারে, এই পাচারচক্রের মূল টাকার ভল্ট রয়েছে মালদহের মঙ্গলবাড়ি এলাকার একটি ফ্ল্যাটে। সেই সূত্র ধরেই রবিবার গভীর রাতে দক্ষিণ দিনাজপুর পুলিস, মালদহ থানা এবং রাজ্য পুলিসের স্পেশাল অপারেশন টিম (SOT) যৌথভাবে ওই ফ্ল্যাটে তল্লাশি শুরু করে।
ফ্ল্যাটের আলমারিতে টাকার পাহাড়
ফ্ল্যাটের আলমারিতে থরে থরে সাজানো টাকার বান্ডিল দেখে ব্যাঙ্ক কর্মী ও একাধিক নোট গণনার মেশিন আনা হয়। রবিবার গভীর রাত পেরিয়ে সোমবার ভোররাত পর্যন্ত চলে এই টাকা গোনার কাজ। এখন পর্যন্ত বাজেয়াপ্ত নগদ টাকা: ২ কোটি ৪০ লক্ষ ৯৭ হাজার ৩৮০। ৭,০০০ বোতলেরও বেশি কোডিনযুক্ত (NDPS) কাফ সিরাপ। নগদ ও কাফ সিরাপের পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ সোনা (যার সঠিক ওজন খতিয়ে দেখা হচ্ছে)।
শাসকদলের যোগ ও ভাড়াটে বিতর্ক
যে ফ্ল্যাটটি থেকে এই বিপুল পরিমাণ টাকা ও মাদক বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে, তার মালিক দিলীপ সাহা। এলাকায় তিনি শাসকদল তৃণমূলের কর্মী হিসেবে পরিচিত। তবে দিলীপ সাহার দাবি, 'আমি পিন্টু সরকার নামে এক ব্যক্তিকে ফ্ল্যাটটি ভাড়া দিয়েছিলাম। ভাড়াটে সেখানে নিষিদ্ধ কাফ সিরাপ কিংবা এত টাকা জমিয়ে রেখেছিল -- তা আমার জানা ছিল না।' পুলিস এখন ফেরার ভাড়াটে পিন্টু সরকারের খোঁজে জায়গায় জায়গায় তল্লাশি চালাচ্ছে।
পিন্টু সরকার: আন্তর্জাতিক পাচারচক্রের মূল হোতা
পুলিসের দাবি, মেহেন্দ্রীপাড়ার ঘটনার পর ধৃতদের জেরা করে সামনে আসা নামগুলোর মধ্যে ওষুধ ব্যবসায়ী পিন্টু সরকারই এই আন্তর্জাতিক কফ সিরাপ পাচারচক্রের প্রধান পান্ডা। ফ্ল্যাটে উদ্ধার হওয়া কোটি কোটি টাকার উৎস এই পাচারচক্রেরই কালো টাকা বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত তদন্তকারীরা। মালদহের পুলিস সুপার অনুপম সিং জানিয়েছেন, ঘটনার পুরো তদন্ত প্রক্রিয়া জোরকদমে চলছে।
বীরভূমের ঘটনার সঙ্গে মিল?
কয়েকদিন আগেই বীরভূমের মহম্মদবাজারে মিনার মণ্ডলের বাড়ি থেকে উদ্ধার হয় নগদ ২৮ কোটি টাকারও বেশি। নগদ টাকার পাশাপাশি বাজেয়াপ্ত হয় ৫ কেজি সোনা, সব মিলিয়ে উদ্ধার হওয়া সম্পত্তির মোট বাজারমূল্য ৫০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়! পরবর্তীতে জানা যায়, এই বিপুল অর্থ ও সম্পত্তির আসল মালিক মিনারের আত্মীয়, 'পাথর সম্রাট' টুলু মণ্ডল। অভিযোগ, পাথর খাদানের বেআইনি কারবার ও দুর্নীতি করেই কোটি কোটি টাকার অগাধ সম্পত্তি এবং শতাধিক গাড়ির মালিক হয়েছেন এই টুলু মণ্ডল।
বাংলাদেশের সীমান্তে মাদক ও কালো টাকার চক্র: একটি উদ্বেগের বিষয়
বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী জেলা মালদহে এই বিপুল পরিমাণ মাদক ও কালো টাকা উদ্ধার হওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় এই অঞ্চল ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম কেন্দ্র। আজ সেই একই অঞ্চল মাদক ও কালো টাকার চক্রের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এটি শুধু ভারতের নয়, বাংলাদেশের জন্যও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি, যাতে আমাদের সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলি মাদক ও অপরাধের আখড়ায় পরিণত না হয়।
FAQ
মালদহের কোথা থেকে বিপুল নগদ টাকা উদ্ধার হয়েছে?
পুরাতন মালদহের পুরসভার চৌরঙ্গী মোড় এলাকার একটি বহুতল আবাসনের ফ্ল্যাট থেকে প্রায় ২ কোটি ৯৪ লক্ষ টাকা নগদ উদ্ধার করেছে পুলিস।
মূল অভিযুক্ত ও গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তি কে?
পিন্টু সরকার নামে এক ওষুধ ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তিনি ওই ফ্ল্যাটটি ভাড়া নিয়ে থাকতেন এবং সেখান থেকেই এই চক্র পরিচালনা করতেন।
নগদ টাকার পাশাপাশি আর কী কী উদ্ধার হয়েছে?
নগদের পাশাপাশি প্রায় ৫০ পেটি (৭,০০০ বোতলেরও বেশি) নিষিদ্ধ কোডিনযুক্ত কাফ সিরাপ এবং বিপুল পরিমাণ সোনা উদ্ধার হয়েছে।
এই অভিযানের মূল সূত্র কীভাবে মেলে?
গত ৫ জুলাই দক্ষিণ দিনাজপুরের মেহেন্দ্রীপাড়ায় ১,৫০০ বোতল নিষিদ্ধ কফ সিরাপসহ ৪ পাচারকারী ধরা পড়ে। ধৃতদের পুলিসি হেফাজতে নিয়ে জেরা করতেই পিন্টু সরকার ও তার এই গোপনীয় আস্তানার খোঁজ পায় যৌথ তদন্তকারী দল।