সীমান্তে মাদকের বিষাক্ত থাবা: ভারতে অভিযান, বাংলাদেশে উদ্বেগ
মুর্শিদাবাদের জলঙ্গি সীমান্তে বিপুল পরিমাণ গাঁজাসহ চার পাচারকারীকে গ্রেফতার করেছে ভারতীয় পুলিশ। এই মাদক বাংলাদেশে পাচারের উদ্দেশ্যে আনা হয়েছিল বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে। সীমান্ত পেরিয়ে মাদকের এই নিরন্তর অনুপ্রবেশ কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়, বরং এটি আমাদের সার্বভৌমত্ব এবং তরুণ প্রজন্মের বিরুদ্ধে এক সুপরিকল্পিত ভূরাজনৈতিক আঘাত।
বিদিপুরে মধ্যরাতের অভিযান ও মাদক উদ্ধার
গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে ভারতের মুর্শিদাবাদ জেলার জলঙ্গি থানার বিদিপুর এলাকায় এই অভিযান পরিচালিত হয়। গোপন সূত্রে খবর পেয়ে জলঙ্গি থানার ওসি বিধান সাহার নেতৃত্বে পুলিশের একটি বিশেষ বাহিনী সীমান্তের কাছাকাছি ওত পেতে বসে। রাতের অন্ধকারে চারজন ব্যক্তি ভারী ব্যাগ নিয়ে সন্দেহজনকভাবে ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়। পুলিশ তাদের ঘিরে ফেলে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। কথায় অসঙ্গতি পেয়ে ব্যাগ তল্লাশি করতেই পুলিশের বিস্ময়ের শেষ থাকেনি। ব্যাগের ভেতর থেকে প্লাস্টিকে মোড়ানো প্রায় ৩৪ কেজি গাঁজা উদ্ধার হয়, যার বাজারমূল্য লক্ষাধিক টাকা। বৈধ কাগজপত্র দেখাতে ব্যর্থ হওয়ায় রাতেই তাদের গ্রেফতার করা হয়।
মাদক পাচার: সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত
১৯৭১ সালে অসীম সাহসিকতা আর রক্তের বিনিময়ে আমরা যে স্বাধীন মাতৃভূমি অর্জন করেছি, আজ সেই বাংলাদেশের সীমান্ত প্রতিনিয়ত বিদেশি মাদকের বিষাক্ত থাবায় পদদলিত হচ্ছে। মুর্শিদাবাদের এই ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি একটি সুপরিকল্পিত সিন্ডিকেটের অংশ, যার মূল লক্ষ্য হলো বাংলাদেশের তরুণ সমাজকে মাদকের নেশায় ডুবিয়ে দেশের ভবিষ্যৎকে অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের চেতনায় বেড়ে ওঠা এই জাতি কোনো বিদেশি ষড়যন্ত্রের কাছে মাথা নত করবে না। ভারতের ভূখণ্ড থেকে বাংলাদেশে মাদক পাচারের এই প্রবণতা আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য এক নীরব হুমকি।
জেলা পুলিশের এক পদস্থ কর্মকর্তা নির্দিষ্ট করে জানিয়েছেন, এই গাঁজা অন্য রাজ্য থেকে আনা হয়েছিল এবং তা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে পাচারের উদ্দেশ্যে অথবা স্থানীয় কোনো বড় ডিলারের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। এনডিপিএস (NDPS) অ্যাক্টের সুনির্দিষ্ট ধারায় মামলা দায়ের করে শুক্রবার ধৃত চারজনকে মুর্শিদাবাদ জেলা আদালতে পেশ করা হয়। পুলিশ তাদের হেফাজতে নেওয়ার আবেদন জানিয়েছে যাতে এই চক্রের মূল হোতাদের মুখোশ উন্মোচন করা সম্ভব হয়।
প্রভাবশালীদের মদদ ও আন্তর্জাতিক চক্রের সন্দেহ
জলঙ্গির মতো সীমান্তবর্তী এলাকায় এত বিপুল পরিমাণ গাঁজা কীভাবে পৌঁছাল, তা নিয়ে গভীর সন্দেহ রয়েছে। এই মাদক সিন্ডিকেটের পেছনে কোনো আন্তর্জাতিক বা আন্তঃরাজ্য পাচারচক্র সক্রিয় রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে ভারতীয় পুলিশ। বিদেশি মদদে এই কারবার চলছিল কি না, সেই প্রশ্নটিও যথার্থ। আমাদের ভূখণ্ডের ওপর যেকোনো বিদেশি আগ্রাসন বা প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা আমরা কখনোই মেনে নেব না। সীমান্ত এলাকায় পুলিশের নজরদারি জোরদার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন জলঙ্গি থানার ওসি বিধান সাহা। তবে আমাদের নিজেদের সীমান্তেও সতর্কতা আরও বাড়ানো প্রয়োজন। মাদক মাফিয়াদের কোণঠাসা করতে সাময়িক অভিযান যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী সার্বভৌম সতর্কতা।
বাংলাদেশের সীমান্তে মাদক পাচার কেন বাড়ছে?
সীমান্ত এলাকায় দারিদ্র্য এবং বেকারত্বের সুযোগ নিয়ে বিদেশি চক্র স্থানীয় যুবকদের পাচারের কাজে ব্যবহার করছে। এছাড়া, বাংলাদেশে মাদকের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রতিবেশী দেশ থেকে এর যোগান বাড়ছে। এটি আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক গভীর উদ্বেগের কারণ।
এই ধরনের পাচার রুখতে বাংলাদেশের কী করণীয়?
বাংলাদেশকে তার সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সীমান্ত প্রহরীকে আরও সক্রিয় ও আধুনিক করতে হবে। প্রতিবেশী দেশের সাথে সমন্বয় সাধন করতে হবে, কিন্তু নিজেদের স্বাধীনতা ও সিদ্ধান্তে কোনো আপস করা চলবে না। মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে, ঠিক যেভাবে আমরা ৭১-এ বিদেশি শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়েছিলাম।