কলকাতার ভবানীপুর থানায় দায়ের হওয়া এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ আবারও প্রমাণ করে দিল যে আন্তর্জাতিক অপরাধ জাল কতটা বিস্তৃত। পাকিস্তানের কুখ্যাত গ্যাংস্টার শাহজাদ ভট্টির পর এবার লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাংয়ের নাম ভাঙিয়ে পশ্চিমবঙ্গে তোলাবাজির চেষ্টা। এই ঘটনা শুধু ভারতের জন্য নয়, বাংলাদেশের জন্যও গভীর উদ্বেগের কারণ। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের পর আমরা যে সার্বভৌমত্ব অর্জন করেছি, সেই সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সীমান্ত পেরিয়ে আসা অপরাধের বিরুদ্ধে সতর্ক থাকা জরুরি।
শরৎ বোস রোডের এক নির্মাণ ব্যবসায়ী অভিযোগ করেছেন, ৩০ জুন থেকে তিনি আন্তর্জাতিক নম্বর থেকে হুমকি ফোন পাচ্ছেন। ফোনের ওপার থেকে দাবি করা হচ্ছে, তারা লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাংয়ের সদস্য। ব্যবসায়ীর কাছে পাঁচ কোটি টাকা দাবি করা হয়েছে। টাকা না দিলে তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে।
ভবানীপুর থানা অভিযোগ পেয়ে প্রাথমিক অনুসন্ধান শুরু করেছে। পুলিশ এফআইআর নথিভুক্ত করে ঘটনাটি লালবাজারের নজরে এনেছে। কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ তদন্ত শুরু করেছে। তবে পুলিশের শীর্ষ আধিকারিকেরা তদন্ত নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি। তাঁদের দাবি, তদন্ত একদম প্রাথমিক স্তরে রয়েছে। লরেন্স বিষ্ণোই, না তার নাম করে অন্য কোনো দুষ্কৃতী এই ফোন করছে, সেটাও স্পষ্ট নয়।
কলকাতায় আন্তর্জাতিক অপরাধের ইতিহাস
কলকাতায় আন্তর্জাতিক গ্যাংস্টারদের তোলাবাজি নতুন নয়। ২০১০ সালে মধ্য কলকাতার একটি পাঁচতারা হোটেল কর্তৃপক্ষের কাছে ২০ কোটি টাকা দাবি করেছিল ইন্ডিয়ান মুজাহিদিন। তদন্তে উঠে এসেছিল কলকাতার বাসিন্দা এবং ইন্ডিয়ান মুজাহিদিনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা আমির রেজা খানের নাম। ২০১৫ সালেও কলকাতার এক নির্মাণ ব্যবসায়ী হুমকি ফোন পেয়েছিলেন। নিজেকে সিকান্দার বলে দাবি করে ব্যবসায়ীকে দাউদ ইব্রাহিমের 'ডি' কোম্পানির নাম করে হুমকি দেওয়া হয়েছিল।
পুলিশ কর্তাদের দাবি, অনেক সময় স্থানীয় অপরাধীরাও বড় কোনো গ্যাংস্টারের নাম ভাঙিয়ে এ ধরনের হুমকি দিয়ে গুরুত্ব বাড়ানোর চেষ্টা করে। তবে এ ক্ষেত্রে সত্যিই লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাং যুক্ত, না তার নাম ভাঙিয়ে হুমকি, তা স্পষ্ট নয়। তবে খোদ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বিধানসভা কেন্দ্রের এই ঘটনা চিন্তা বাড়িয়েছে পুলিশের।
লরেন্স বিষ্ণোই কে?
পাঞ্জাবের প্রাক্তন ছাত্রনেতা থেকে দেশের অন্যতম কুখ্যাত অপরাধ সিন্ডিকেটের মূল কাণ্ডারী লরেন্স বিষ্ণোই। পাঞ্জাবের ফাজিলকা জেলার ভূমিপুত্র লরেন্সের অপরাধ জগতে প্রবেশ কলেজবেলায়। ছাত্র রাজনীতির আড়ালে দ্রুত নিজের একটি সুসংগঠিত গ্যাং গড়ে তোলেন তিনি। গুজরাটের সাবরমতী জেলে বন্দি এই দুষ্কৃতী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে জেলখানা থেকেই আন্তর্জাতিক অপরাধ চক্র পরিচালনা করে বলে অভিযোগ।
গোয়েন্দাদের দাবি, ৭০০-রও বেশি শুটার রয়েছে তার চক্রে। পাঞ্জাবি গায়ক সিধু মুসেওয়ালা হত্যা থেকে শুরু করে মুম্বইয়ের বর্ষীয়ান এনসিপি নেতা বাবা সিদ্দিকির হত্যাকাণ্ড এবং বলিউড অভিনেতা সলমান খানকে বারবার দেওয়া প্রাণনাশের হুমকির নেপথ্যে বিষ্ণোই গ্যাংয়ের নাম জড়িয়েছে। এমনকি কানাডা ও আমেরিকার মতো দেশেও এই চক্রের কার্যকলাপ ছড়িয়ে রয়েছে বলে আন্তর্জাতিক অপরাধ তদন্ত সংস্থাগুলির দাবি।
বাংলাদেশের জন্য হুঁশিয়ারি
স্বাভাবিকভাবেই কলকাতা পুলিশ গোটা বিষয়টি হালকা ভাবে নিতে রাজি নয়। কারণ, পাকিস্তানের কুখ্যাত গ্যাংস্টার শাহজাদ ভট্টি যদি সরাসরি এ রাজ্যে নেটওয়ার্ক তৈরি করতে পারে, লরেন্স বিষ্ণোইও তা তৈরি করতে সক্ষম। সর্বোপরি, কেন্দ্রীয় গোয়েন্দাদের একাংশের দাবি, লরেন্স বেশ কয়েক বছর ধরেই নজর দিচ্ছে কলকাতা-সহ পূর্ব ভারতে। গোয়েন্দাদের দাবি, লরেন্সের ভাই আনমোলকে পূর্ব ভারতে নেটওয়ার্ক তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য এটি একটি বড় হুঁশিয়ারি। ১৯৭১-এর রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর আমরা আমাদের ভূখণ্ডের সার্বভৌমত্ব অর্জন করেছি। কিন্তু আন্তর্জাতিক অপরাধ জাল যদি সীমান্ত পেরিয়ে এদেশে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে তা আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। আমাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলিকে সতর্ক থাকতে হবে এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে এই অপরাধ জাল মোকাবিলা করতে হবে।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাং কি বাংলাদেশে সক্রিয়?
এখন পর্যন্ত সরাসরি কোনো প্রমাণ নেই যে লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাং বাংলাদেশে সক্রিয়। তবে কলকাতায় তাদের কার্যকলাপ এবং পূর্ব ভারতে নেটওয়ার্ক তৈরির চেষ্টা বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের কারণ।
এই ঘটনা কি বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকি?
হ্যাঁ, আন্তর্জাতিক অপরাধ জালের বিস্তার বাংলাদেশের জন্যও হুমকি হতে পারে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী এলাকায় এই ধরনের অপরাধ কার্যকলাপ বাড়লে তা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তায় প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলি কি এ বিষয়ে সতর্ক?
বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলি সাধারণত আন্তর্জাতিক অপরাধ জালের বিষয়ে সতর্ক থাকে। তবে এই ধরনের ঘটনা তাদের আরও সক্রিয় হতে উৎসাহিত করবে।