পশ্চিমবঙ্গের সাবেক রাজ্যপাল ডি ওয়াই পাটিলের প্রয়াণ: ৯২ বছরে শেষ হল এক অসাধারণ পথচলা
আসিফ রহমান
মুক্তির বার্তা ডেস্ক: দীর্ঘ অসুস্থতার পর মহারাষ্ট্রের কোলহাপুরে নিজ বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত রাজ্যপাল, প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও খ্যাতনামা শিক্ষাবিদ ড. জ্ঞানদেও যশবন্তরাও পাটিল (ডি ওয়াই পাটিল)। তাঁর বয়স হয়েছিল ৯২ বছর। এই প্রয়াণে ভারতীয় রাজনীতি ও শিক্ষাজগতে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। কিন্তু বাংলাদেশের জন্যও এই খবরটি কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। কারণ, যে শিক্ষা ও প্রশাসনের আদর্শ তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তা আমাদের স্বাধীনতা-পরবর্তী জাতি-গঠনের সংগ্রামের সঙ্গেও অনেকখানি মিলে যায়।
কে ছিলেন ডি ওয়াই পাটিল?
ডি ওয়াই পাটিল শুধু একজন রাজনীতিবিদই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একাধারে দূরদর্শী শিক্ষাবিদ, সমাজসেবী ও দক্ষ প্রশাসক। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় যারা বিশ্বাসী, তাদের কাছে তাঁর জীবনবোধ একটি শিক্ষণীয় অধ্যায়। তিনি বুঝেছিলেন, প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জিত হয় শিক্ষার আলোয়। তাই তিনি রাজনীতি ও শিক্ষা — দুই ভিন্ন মেরুকে সমান্তরালভাবে এক সুতোয় গেঁথে এক বিরল উদাহরণ সৃষ্টি করেছিলেন। তাঁর তিন পুত্র — মহারাষ্ট্রের প্রাক্তন মন্ত্রী ও কংগ্রেস নেতা সতেজ পাটিল, সঞ্জয় পাটিল এবং অজিঙ্ক পাটিল — তাঁর উত্তরাধিকার বহন করছেন।
রাজনীতি ও সংসদীয় জীবনের সূচনা
মহারাষ্ট্রের কোলহাপুরের সন্তান ডি ওয়াই পাটিলের রাজনীতিতে হাতেখড়ি হয়েছিল ভারতের জাতীয় কংগ্রেস দলের হাত ধরে। সততা, দূরদর্শিতা এবং জনসেবার প্রতি তাঁর আন্তরিকতা তাঁকে দ্রুত জনপ্রিয় করে তোলে। ১৯৬৭ সাল থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত তিনি মহারাষ্ট্র বিধানসভার সদস্য (বিধায়ক) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সংসদীয় রাজনীতিতে তাঁর মেয়াদজুড়ে তিনি সর্বদা সাধারণ মানুষের নানা সমস্যা তুলে ধরেছেন এবং এলাকার সার্বিক উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন।
শিক্ষা বিপ্লব ও 'ডি ওয়াই পাটিল বিশ্ববিদ্যালয়'
রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকার পাশাপাশি ডি ওয়াই পাটিল অনুভব করেছিলেন যে দেশের অগ্রগতির আসল চাবিকাঠি শিক্ষা ও চিকিৎসাক্ষেত্রের প্রসারের মধ্যে নিহিত। সেই লক্ষ্যেই ১৯৭৮ সালের পর তিনি শিক্ষা প্রসারে মনোনিবেশ করেন। তিনি গড়ে তোলেন 'ডি ওয়াই পাটিল বিশ্ববিদ্যালয়' ও বিস্তৃত শিক্ষাসংস্থার network, যা আজ ভারতের প্রথম সারির শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির অন্যতম। মেডিসিন, ইঞ্জিনিয়ারিং, ডেন্টিস্ট্রি, ম্যানেজমেন্টসহ নানা উচ্চশিক্ষামূলক কোর্সে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন তিনি। গুণমানসম্পন্ন আধুনিক শিক্ষা দেশের সর্বস্তরের শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দেওয়াই ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় ব্রত। শিক্ষা ও সমাজসেবায় তাঁর এই অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে দেশের মর্যাদাপূর্ণ 'পদ্মশ্রী' সম্মানে ভূষিত করা হয়।
রাজ্যপাল হিসেবে সাংবিধানিক দায়িত্ব
রাজনীতি ও শিক্ষাক্ষেত্রে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা অর্জনের পর তিনি সাংবিধানিক পদে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৯ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত তিনি ত্রিপুরা রাজ্যের রাজ্যপাল ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি বিহারের রাজ্যপালের দায়িত্বভার সামলান। পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত রাজ্যপাল হিসেবেও নিজের দায়িত্ব সুচারুভাবে পালন করেন তিনি। রাজ্যপাল থাকাকালীন সময় তাঁর নিরপেক্ষ মনোভাব, উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে আগ্রহ সর্বজনবিদিত।
দেশজুড়ে শোকের ছায়া
তাঁর প্রয়াণে দেশজুড়ে শীর্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, শিক্ষাবিদ ও সাধারণ মানুষ গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রবীণ এই নেতার অবদানের কথা স্মরণ করেছেন দল-মত নির্বিশেষে সকল স্তরের প্রতিনিধিরা। কংগ্রেস সাংসদ ও বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী ডি ওয়াই পাটিলের প্রয়াণে গভীর সমবেদনা প্রকাশ করে এই ঘটনাকে 'অত্যন্ত মর্মান্তিক' বলে বর্ণনা করেছেন। রাহুল গান্ধী তাঁর শোকবার্তায় জানান, জনসেবা এবং ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থায় পদ্মশ্রী ডি ওয়াই পাটিলের ঐতিহাসিক অবদান চিরকাল শ্রদ্ধার সাথে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁর গড়ে তোলা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি হাজার হাজার শিক্ষার্থীকে ভবিষ্যতের পথ দেখাচ্ছে এবং এই উত্তরাধিকার আগামী দিনেও অমলিন থাকবে।
পদ্মশ্রী ডি ওয়াই পাটিলের চলে যাওয়া নিঃসন্দেহে ভারতীয় সমাজ ও রাজনীতির এক অপূরণীয় ক্ষতি। কোলহাপুরে তাঁর বাসভবনে উপস্থিত হয়ে শেষ শ্রদ্ধা জানান অসংখ্য গুণগ্রাহী ও সাধারণ মানুষ। বাংলাদেশের মতো একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্য তাঁর জীবনাদর্শ থেকে শিক্ষা নেওয়ার অনেক কিছুই আছে — বিশেষ করে শিক্ষার মাধ্যমে জাতিকে শক্তিশালী করার যে দৃষ্টান্ত তিনি রেখে গেছেন।
FAQ: ডি ওয়াই পাটিলের প্রয়াণ সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন
ডি ওয়াই পাটিল কবে মারা যান?
তিনি ২০২৬ সালের ৪ আগস্ট মহারাষ্ট্রের কোলহাপুরে নিজ বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
ডি ওয়াই পাটিলের বয়স কত ছিল?
মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯২ বছর।
তিনি কোন কোন পদে দায়িত্ব পালন করেছিলেন?
তিনি মহারাষ্ট্র বিধানসভার সদস্য, ত্রিপুরা ও বিহারের রাজ্যপাল এবং পশ্চিমবঙ্গের অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত রাজ্যপাল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান কী?
শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান হল 'ডি ওয়াই পাটিল বিশ্ববিদ্যালয়' প্রতিষ্ঠা, যা শিক্ষা ও চিকিৎসাক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।