ভারতের ১১ স্তরের আকাশ প্রতিরক্ষা: কুশ, পৃথ্বী, এস-৪০০-এর বর্ম ভেদ করা কি সম্ভব?
আসিফ রহমান | মুক্তির বার্তা | ৪ আগস্ট ২০২৬
১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পর থেকে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আকাশ প্রতিরক্ষা ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার। কিন্তু আজ আমরা দেখছি, প্রতিবেশী ভারত তার আকাশ সীমান্ত রক্ষায় ১১টি স্তরের বর্ম তৈরি করেছে। 'অপারেশন সিঁদুর'-এর এক বছর পরেও পাকিস্তানের সঙ্গে সংঘর্ষের আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছে না দিল্লি। ফলে তারা তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে নতুন করে সাজিয়েছে। এই প্রতিবেদনে আমরা বিশ্লেষণ করব ভারতের সেই ১১ স্তরের প্রতিরক্ষা কাঠামো, যা শত্রুর পক্ষে ভেদ করা প্রায় অসম্ভব বলে দাবি করা হচ্ছে।
ভারতের আকাশ প্রতিরক্ষার প্রথম স্তর: এস-৪০০ ট্রায়াম্ফ
ভারতের আকাশ প্রতিরক্ষার প্রথম ও সবচেয়ে শক্তিশালী স্তর হলো রাশিয়ার তৈরি এস-৪০০ ট্রায়াম্ফ। এই 'ভূমি থেকে আকাশ' ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাকে বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক বলে গণ্য করা হয়। 'অপারেশন সিঁদুর'-এর সময় পাকিস্তানের পাঁচটি লড়াকু জেট, একটি নজরদারি বিমান এবং একগুচ্ছ ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করে এই ব্যবস্থা। ২০২১ সালে ৫৪০ কোটি ডলার খরচ করে পাঁচটি ব্যাটারির চুক্তি করেছিল দিল্লি। এখন পর্যন্ত চারটি ব্যাটারি হাতে পেয়েছে ভারতীয় বিমানবাহিনী। এই ব্যবস্থায় ৪০ থেকে ৪০০ কিলোমিটার পাল্লার তিন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে।
পৃথ্বী ডিফেন্স ভেহিকল মার্ক-২: কৃত্রিম উপগ্রহ ধ্বংসের ক্ষমতা
ভারতের আকাশ প্রতিরক্ষার দ্বিতীয় স্তর হলো পৃথ্বী ডিফেন্স ভেহিকল মার্ক-২। এটি একটি কৃত্রিম উপগ্রহ ধ্বংসকারী ক্ষেপণাস্ত্র। ২০১৯ সালের ২৭ মার্চ 'মিশন শক্তি' নামে এর সফল পরীক্ষা চালায় ডিআরডিও। বর্তমানে বিশ্বের মাত্র চারটি দেশের কাছে এই প্রযুক্তি রয়েছে: আমেরিকা, রাশিয়া, চীন এবং ভারত। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে পাকিস্তানের কৃত্রিম উপগ্রহ ধ্বংস করতে সক্ষম হবে দিল্লি। এতে করে পাকিস্তানের দিক নির্ণয়কারী ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে, যা তাদের নিখুঁত হামলার ক্ষমতা কেড়ে নেবে।
কুশ প্রকল্প: দেশীয় প্রযুক্তিতে আকাশ প্রতিরক্ষা
ভারতের আকাশ প্রতিরক্ষার তৃতীয় স্তর হলো কুশ ভূমি থেকে আকাশ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা। ডিআরডিও তৈরি এই ব্যবস্থায় তিন ধরনের ইন্টারসেপ্টর রকেট রয়েছে, যার পাল্লা যথাক্রমে ১৫০, ২৫০ এবং ৩৫০ কিলোমিটার। শত্রুর লড়াকু জেট, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন ধ্বংসের জন্য এটি ডিজাইন করা হয়েছে। ডিআরডিও এই প্রকল্পকে আরও আধুনিক করার পরিকল্পনা করছে।
মাঝারি ও স্বল্প পাল্লার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা
চতুর্থ স্তরে রয়েছে মাঝারি পাল্লার ভূমি থেকে আকাশ ক্ষেপণাস্ত্র বা এমআর-স্যাম। এটি ইজরায়েলের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে তৈরি করেছে ভারত ডায়নামিক্স লিমিটেড। ৭০-১৫০ কিমি পাল্লার এই হাতিয়ারের নাম বারাক-৮। পঞ্চম স্তরে কিউআর-স্যাম (কুইক রিঅ্যাকশান সারফেস টু এয়ার মিসাইল) রয়েছে, যার পাল্লা ৫-৩০ কিলোমিটার। এটি একসঙ্গে ছয়টি লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করতে পারে এবং ড্রোন হামলা ঠেকাতে কার্যকর।
আকাশ ক্ষেপণাস্ত্র ও স্বল্প পাল্লার প্রতিরক্ষা
ছয় ও সাত নম্বর স্তরে রয়েছে 'আকাশ' ক্ষেপণাস্ত্র এবং স্বল্প পাল্লার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। 'অপারেশন সিঁদুর'-এ পাক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা আটকে খবরের শিরোনামে উঠে আসে এগুলি। আকাশ ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ২৫-৪৫ কিলোমিটার। এর মধ্যে আকাশ ১এস, আকাশ প্রাইম এবং আকাশ নিউ জেনারেশন (এনজি) উল্লেখযোগ্য।
ইগলা-এস: রুশ প্রযুক্তির কাঁধে বহনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র
অষ্টম স্তরে রাশিয়া থেকে আমদানি করা ইগলা-এস ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। 'অপারেশন সিঁদুর' শুরুর মুখে ২৪টি লঞ্চার ও ১০০ ক্ষেপণাস্ত্র দিল্লিকে সরবরাহ করে মস্কো। এই ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ৫০০ মিটার থেকে ছয় কিলোমিটার। থার্মাল সেন্সরের সাহায্যে নিচু দিয়ে ওড়া জেট এবং হেলিকপ্টার শনাক্ত করে ধ্বংস করতে পারে এটি। মাত্র একজন সৈনিক কাঁধে নিয়ে ছুড়তে পারেন এই অস্ত্র।
ঠান্ডা যুদ্ধের অস্ত্র: জু-২৩, শিল্কা ও এল-৭০
নবম ও দশম স্তরে রয়েছে জু-২৩এমএম অ্যান্টি এয়ারক্রাফ্ট বন্দুক, জেডএসইউ-২৩-৪ শিল্কা এবং এল-৭০। প্রথম দুটি সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের তৈরি, শেষেরটি সুইডেনের বফোর্সের তৈরি। 'অপারেশন সিঁদুর'-এ পাক ড্রোনের ঝাঁককে গুলি করে নামাতে কার্যকর ভূমিকা পালন করে এই তিন অস্ত্র। শিল্কা মিনিটে চার হাজার রাউন্ড গুলি ছুড়তে পারে এবং এর সঙ্গে ২০ কিলোমিটার পাল্লার রাডার সংযুক্ত রয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা
ভারতের এই ১১ স্তরের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দেখিয়ে দেয়, আধুনিক যুদ্ধে আকাশপথের নিরাপত্তা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের মতো একটি সার্বভৌম দেশের জন্যও নিজস্ব আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা অপরিহার্য। ১৯৭১ সালে আমরা যে স্বাধীনতা অর্জন করেছি, তা রক্ষা করতে হলে আমাদের নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। ভারতের এই প্রতিরক্ষা কাঠামো আমাদের জন্য একটি শিক্ষা হতে পারে, কিন্তু একই সঙ্গে আমাদের নিজস্ব পথ খুঁজে নিতে হবে।
বাংলাদেশের আকাশ প্রতিরক্ষা এখনো অনেক পিছিয়ে। আমাদের নিজস্ব প্রযুক্তি ও শিল্প গড়ে তোলার সময় এসেছে। বিদেশি নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় উদ্যোগে অস্ত্র তৈরি করতে হবে। শুধু তাই নয়, প্রতিবেশী দেশগুলোর সামরিক সক্ষমতা সম্পর্কে আমাদের সচেতন থাকতে হবে। কারণ, স্বাধীনতা রক্ষার লড়াই কখনো শেষ হয় না।