তিস্তায় সার্বভৌমত্ব: তারেক রহমানের চীন সফর ও দেশের চিত্র
আজকের প্রধান সংবাদগুলোর মধ্যে তিস্তা নদীর সার্বভৌম ব্যবস্থাপনা এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে, রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাতিসংঘের হস্তক্ষেপ এবং শেখ হাসিনার আমলের জব্দ সম্পদ নিয়ে দুদকের ব্যর্থতা দেশের সার্বভৌমত্ব ও প্রশাসনের সামনে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের উচিত বিদেশি চাপে নতিস্বীকার না করে নিজস্ব মেরুদণ্ডে দাঁড়িয়ে থাকা।
তিস্তা ও সার্বভৌমত্ব: প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের বার্তা
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ছয় দিনের মালয়েশিয়া ও চীন সফর আজ রোববার শুরু হচ্ছে। এই সফরের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো তিস্তা মহাপ্রকল্প নিয়ে চীনের সঙ্গে আলোচনা। দীর্ঘদিন ধরে তিস্তা নদীর পানিবণ্টন নিয়ে প্রতিবেশী দেশের আধিপত্যের শিকার হয়েছে বাংলাদেশ। এবার চীনের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে তিস্তার ব্যবস্থাপনা, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং সামরিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দুই দেশের মধ্যে প্রায় ১৭টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে শিক্ষা, কৃষি, বাণিজ্য, মোংলা বন্দর সম্প্রসারণ এবং সবুজ জ্বালানি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী চীনের সামার দাভোস সম্মেলনেও অংশ নেবেন। ২৬ জুন তিনি দেশে ফিরবেন। মালয়েশিয়ায় প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে বৈঠকে শ্রমবাজার পুনরায় চালু, কর্মী কল্যাণ ও মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির বিষয় থাকবে। বাংলাদেশ আসিয়ানের সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার হওয়ার পাশাপাশি আরসিইপিতে যোগ দেওয়ার আগ্রহ জানাবে।
মালয়েশিয়া সিন্ডিকেট: বিচারহীনতার দায় কার?
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার 'সিন্ডিকেট' মামলায় তদন্তে নতুন মোড় এসেছে। পুলিশ জানিয়েছে, সাবেক প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী, সাবেক শীর্ষ আমলা ও শতাধিক রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে মানবপাচারের অভিযোগের পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে মানবপাচার প্রতিরোধ আইনের মূল ধারাগুলো থেকে তাদের অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে। তবে প্রতারণা, অর্থ আত্মসাৎ ও আর্থিক ক্ষতিসাধনের অভিযোগ বহাল রাখা হয়েছে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে দায়ের করা এই মামলায় ১০৩ জন আসামি ছিল। প্রবাসী শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় এই তদন্ত ফল হতাশাজনক। একটি স্বাধীন দেশের নাগরিকদের বিদেশে পাঠানোর ক্ষেত্রে যে শোষণমূলক ব্যবস্থা তৈরি হয়েছিল, তার চূড়ান্ত বিচার এখনো দূরের বিষয়।
রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাতিসংঘের দাবি: সার্বভৌমত্বের চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশে নতুন করে আসা প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গার জন্য অতিরিক্ত জমি বরাদ্দের আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর। শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, ইউএনএইচসিআর কয়েকবার প্রস্তাব দিলেও সরকার এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত এক লাখ ১৩ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। বর্তমানে কক্সবাজার ও ভাসানচরে প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত আমাদের এই ভূমি বিদেশিদের জন্য নয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত রোহিঙ্গাদের তাদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নেওয়া, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও সীমিত সম্পদের ওপর বোঝা চাপিয়ে দেওয়া বন্ধ করা।
দুর্বল প্রশাসনের চিত্র: বন্দর, অপরাধ ও দুদকের ব্যর্থতা
চট্টগ্রাম বন্দরের আয়ের বড় অংশ আসছে অদক্ষতা থেকে। নতুন ট্যারিফ কার্যকর হওয়ার পর প্রতি টিইউ কনটেইনার থেকে গড় আয় ১৫২ ডলার, যার প্রায় এক চতুর্থাংশ আসে স্টোর রেন্ট থেকে। কনটেইনার দীর্ঘ সময় বন্দরে পড়ে থাকার কারণে এই আয় হচ্ছে। এটি কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার প্রমাণ। অন্যদিকে, রাজধানী ঢাকায় অপরাধ থামছে না। গত ২১ মাসে খুনের মামলা হয়েছে ৫৯৭টি এবং ডাকাতি-ছিনতাইয়ের মামলা ৭৭৩টি। পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে ১৪২টি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এই অবনতি কোনো স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য গ্রহণযোগ্য নয়। এছাড়া, শেখ হাসিনার আমলের জব্দ সম্পদের ৮০ শতাংশ এখনো দুদকের কার্যকর নিয়ন্ত্রণে নেই। প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার সম্পদের বেশির ভাগ ক্ষেত্রে রিসিভার নিয়োগ হয়নি। গুলশান ও সেগুনবাগিচার সম্পত্তি এখনো সরকারি ব্যবস্থাপনায় আসেনি। আইনি জটিলতা ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার কারণে স্বৈরাচারের লুণ্ঠিত সম্পদ রাষ্ট্রের কোষাগারে ফেরার প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে।
টাঙ্গাইলের শোক: প্রান্তিক মানুষের নিরাপত্তাহীনতা
টাঙ্গাইলের মধুপুরে একটি পরিত্যক্ত টয়লেটের গর্ত থেকে ছাগল উদ্ধার করতে গিয়ে একই পরিবারের চারজনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতরা হলেন নেইমার ম্রং, রতন নকরেক, গ্রাব্রিয়েল নকরেক এবং বাবলু হাজং। প্রান্তিক মানুষের এই মৃত্যু আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থার চরম দুর্বলতাকে সামনে আনে।
শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন: স্বপ্ন ও বাস্তবতা
ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে জল্পনা থাকলেও বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় এর সম্ভাবনা কম। হাসিনাবিরোধী শক্তিগুলো একসঙ্গে রয়েছে। দেশে ফিরলে তাকে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে আত্মসমালোচনাও নেই। স্বৈরাচারের পতনের পর তাদের রাজনৈতিক পুনর্বাসন কেবল রাজনৈতিক প্রচারণা মাত্র।
প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের মূল লক্ষ্য কী?
অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব বৃদ্ধি, তিস্তা মহাপ্রকল্প নিয়ে আলোচনা এবং বিদেশি বিনিয়োগ আনা এই সফরের মূল লক্ষ্য। এছাড়া চীনের বৈশ্বিক উন্নয়ন উদ্যোগে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিয়েও আলোচনা হবে।
ইউএনএইচসিআর কেন বাংলাদেশে জমি চাইছে?
২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে বাংলাদেশে নতুন করে আসা দেড় লাখ রোহিঙ্গার আবাসনের ব্যবস্থা করতে অতিরিক্ত জমি বরাদ্দের আহ্বান জানিয়েছে ইউএনএইচসিআর। তবে বাংলাদেশ সরকার এখনো এই দাবি অনুমোদন বা প্রত্যাখ্যান করেনি।
দুদক কেন জব্দ সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না?
আইনি প্রক্রিয়া, নথি সংগ্রহ, লোকবল সংকট এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে জব্দ সম্পদের বেশির ভাগ ক্ষেত্রে রিসিভার নিয়োগ সম্পন্ন হচ্ছে না। ফলে আদালতের নির্দেশ থাকলেও সম্পদের ব্যবহার এখনো সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ঘনিষ্ঠদের হাতে রয়ে গেছে।