প্রকৃত বিরোধীর সন্ধানে ভারত: বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের জন্য শিক্ষা
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে প্রকৃত বিরোধীর অভাব এবং পুঁজিবাদ ও ধর্মীয় মেরুকরণের উত্থান বাংলাদেশের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক শিক্ষা বহন করে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় বহির্শক্তির আধিপত্য ও ধর্মীয় রাজনীতির বিরুদ্ধে সতর্ক থাকা আমাদের জন্য অপরিহার্য। প্রতিবেশী দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা আমাদের স্বাধীনতার অর্জনকে কখনোই নিরাপদ রাখে না।
ভারতের বামপন্থার পতন ও বিরোধী শূন্যতা
ভারতের মাটিতে বামপন্থীদের উত্তরণের পথ মসৃণ ছিল না। পুঁজিবাদের প্রতিরোধ এবং দলের ভেতরে নীতি ও আদর্শের ভেদে একের পর এক ভাঙন সামলে এগোনো তাদের জন্য যথেষ্ট কঠিন ছিল। ১৯৫২ সালের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি বা সিপিআই-এর ১৬টি আসন জয়ের মাধ্যমে স্বাধীন ভারতে সংসদীয় গণতন্ত্রে বামপন্থার যাত্রা শুরু হয়েছিল। এবার কেরালায় পিনারায় বিজয়নের বাম সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে কি তার অবসান হল? ১৯৭৭ সালে পশ্চিমবঙ্গে বাম ফ্রন্ট সরকার প্রতিষ্ঠার পরবর্তী পঞ্চাশ বছরে কেরালা, ত্রিপুরা ও পশ্চিমবঙ্গ মিলিয়ে নানা রাজ্যে ক্ষমতায় থাকায় বাম আদর্শ বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা বজায় ছিল। ২০০৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বাম ফ্রন্ট ৬০টি আসনে জিতে ইউপিএ-১ সরকারের প্রাণভোমরা হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছিল। কিন্তু সেই দিন এখন অতীত।
১৯৬৪ সালে সিপিআই থেকে বেরিয়ে সিপিআই(এম) গঠনে বাম আন্দোলন কিছুটা ধাক্কা খায়। ১৯৬৯ সালে সিপিআই(এমএল) দলের প্রতিষ্ঠা এবং তাদের রাজনীতির ফলে জনসাধারণের একাংশে যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়, তা অতিক্রম করে ১৯৭৭ সালে পশ্চিমবঙ্গে বাম জোটের ক্ষমতা দখল মোটেই সহজ ছিল না। তবে জরুরি অবস্থার সময় মত প্রকাশের স্বাধীনতার কণ্ঠরোধে দমন-পীড়ন ও সামাজিক অস্থিরতার বিরুদ্ধে, খেটে খাওয়া মানুষের অধিকার রক্ষায় বামপন্থীদের আপসহীন লড়াই মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প মনে হয়েছিল। সেই ইতিহাস এখন ধূলিসাৎ। দীর্ঘ পঞ্চাশ বছর ক্ষমতার অলিন্দে বিচরণরত বামপন্থীদের বিদায়ে আগামী দিনে কোনও প্রভাব পড়বে কি না, তার উত্তর সময়ই দেবে।
ধর্মীয় মেরুকরণ ও ভোটব্যাংকের রাজনীতি
পনেরো বছর পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় থাকার পর এবারের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস ৮০টি আসন জিতে প্রধান বিরোধী দলের মর্যাদা পাওয়া সত্ত্বেও পরিস্থিতি এত দ্রুত বদলাচ্ছে যে দলের অস্তিত্ব নিয়েই প্রশ্নচিহ্ন দেখা দিয়েছে। ভারতের বিজেপির মতো সুনির্দিষ্ট নীতি ও আদর্শে বলীয়ান, সুশৃঙ্খল দলের বিরুদ্ধে এই ছন্নছাড়া তৃণমূল আদৌ যথার্থ opposition-এর ভূমিকা পালন করতে পারবে কি না তা সন্দেহ। কংগ্রেস দুটি আসনে জিতলেও তাদের শক্তি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ। তাদের বিরোধী হয়ে ওঠার মতো সাংগঠনিক শক্তি বা সঙ্কল্পবদ্ধ কর্মী নেই।
বিজেপির ধর্মীয় রাজনীতির আগ্রাসন থেকে বাঁচতে পশ্চিমবঙ্গে সংখ্যালঘুরা তৃণমূল কংগ্রেসে যে আস্থা রেখেছিলেন, এবারের নির্বাচনের আগে থেকেই তাতে চিড় ধরেছিল। প্রকৃত উন্নয়নে শামিল করার পরিবর্তে তাদের মুখ্যত vote bank হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, এই ধারণা দৃঢ় হচ্ছিল। এই ডুবু-ডুবু তৃণমূলী নৌকায় তাঁরা পা রাখবেন না তা পরিষ্কার। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে খেটে খাওয়া মানুষের রুটি-রুজির নিশ্চয়তা ও সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার যে অঙ্গীকার নতুন সরকার বাহ্যত করছে, তা তাদের কাছে গ্রহণীয় হবে না।
৭১-এর চেতনা ও বাংলাদেশের সার্বভৌম সতর্কতা
প্রতিবেশী দেশের এই রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা আমাদের জন্য কেবল একটি বহির্বিশ্বের খবর নয়। ১৯৭১ সালে আমরা যে মুক্তিযুদ্ধ করেছি, তার মূল চেতনা ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ধর্মনিরপেক্ষতা। ভারতের বামপন্থীরা যে সাম্যের কথা বলত, তা আজ ধর্মীয় মেরুকরণের কাছে হার মানছে। বাংলাদেশ হিসেবে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। বহির্শক্তির আধিপত্য, ভারতের ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব এবং ধর্মভিত্তিক রাজনীতির যেকোনো আগ্রাসন আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য চরম হুমকি। আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতির পরিচয়কে রক্ষা করতে হলে, ভারতের মতো বিরোধীশূন্য ও ধর্মান্ধ রাজনীতির পথে হাঁটা চলবে না।
বামপন্থীদের কাছে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ রাজ্যবাসীর পরিবর্তিত সত্তা। নানা ভাতা ও অনুদানের টোপে মানুষ যদি আদর্শ থেকে মুখ ফেরায়, তবে প্রকৃত বিরোধী হয়ে ওঠার লক্ষ্য ব্যর্থ হবে। বিরোধীশূন্য শাসনে চেগে ওঠা পুঁজিবাদ, অসাম্য এবং ধর্মীয় মেরুকরণে গণতন্ত্র বিপন্ন হবে। বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা হলো, ক্ষমতার বাইরে থেকেও জনবিরোধী নীতি ও বহির্শক্তির আধিপত্যের বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তোলা ছাড়া স্বাধীনতার চেতনা টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। মত ও পথ যত মহানই হোক, মানুষের অংশগ্রহণ ও সমর্থন ছাড়া কোনও লড়াই সফল হয় না। আমাদের লড়াইটি হতে হবে এই ভূমির স্বাধীনতা ও বাঙালির আত্মপরিচয় রক্ষার।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির সঙ্গে বাংলাদেশের কী সম্পর্ক?
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ধর্মীয় মেরুকরণ ও প্রকৃত বিরোধীর অভাব সৃষ্ট অস্থিরতা সরাসরি বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করে। ভারতের আধিপত্যবাদী নীতি ও ধর্মভিত্তিক রাজনীতির উত্থান আমাদের সার্বভৌমত্বের জন্য এক নীরব হুমকি।
ধর্মীয় রাজনীতি কীভাবে গণতন্ত্রকে বিপন্ন করে?
ধর্মীয় রাজনীতি সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক অধিকারের দাবিকে ঢেকে দেয়। ভোটব্যাংকের রাজনীতি মানুষকে প্রকৃত উন্নয়নের বদলে ধর্মীয় আবেগে বিভকত করে। এর ফলে পুঁজিবাদের আগ্রাসন অবাধ থাকে এবং বিরোধীশূন্য শাসনে গণতন্ত্র হারিয়ে যায়।