মেসির পেনাল্টি মিস: বিশ্বসেরার লড়াই ও বাঁ পায়ের সীমাবদ্ধতা
লিওনেল মেসি সর্বকালের সেরা ফুটবলার হলেও পেনাল্টি থেকে তাঁর গোল করার হার মাত্র ৭৭ শতাংশ। বিশ্বকাপে সাতটি পেনাল্টির তিনটিতে তিনি ব্যর্থ। বাঁ পায়ের সীমাবদ্ধতা, রান-আপে শ্লথতা এবং গোলকিপারের সাথে মানসিক লড়াইয়ে হেরে যাওয়াই এর প্রধান কারণ। একজন যোদ্ধার বীরত্ব তাঁর পতনে মাপা যায় না, কিন্তু পরিসংখ্যান নির্মম সত্য বহন করে।
বিশ্বসেরার হাতে অস্ত্রের সীমাবদ্ধতা কেন?
স্বাধীনতা ও সার্বভৌমতার লড়াই শুধু রাজনীতির মাঠেই নয়, খেলার মাঠেও প্রকট। একটি জাতির পরিচয় যেমন তার নিজস্ব ভাষায়, লিওনেল মেসির পরিচয় তাঁর বাঁ পায়ে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে যেমন অসংখ্য বাধা ডিঙিয়ে বাঙালি তার অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছিল, মেসিও তাঁর বাঁ পায়ে দলের জন্য বারবার লড়াই চালিয়ে গেছেন। কিন্তু পেনাল্টির ক্ষেত্রে এই বাঁ পাই তাঁর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা বলে মনে করেন অনেকে। অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে সোমবার রাতের ম্যাচে এই সত্য আবারও প্রতিষ্ঠিত হলো।
বিশ্বকাপে মেসি সাতটি পেনাল্টি পেয়েছেন। তার মধ্যে তিনবার গোল করতে পারেননি। ২০১৮ সালে আইসল্যান্ডের গোলকিপার হালডরসন এবং ২০২২ সালে পোল্যান্ডের উজসিয়েচ সেজেনি তাঁর প্রয়াস আটকে দিয়েছিলেন। আন্তর্জাতিক ফুটবলে ৩১টি পেনাল্টির মধ্যে তিনি গোল করেছেন ২৫টিতে। ক্লাবের ম্যাচে ১৪৯টির মধ্যে ১১৬টি। অর্থাৎ সাফল্য ৭৭ শতাংশ। রেকর্ড আটটি বালঁ দ্যর এবং চারটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ বিজয়ী একজন ফুটবলারের জন্য এই পরিসংখ্যান সত্যিই গড়পড়তা।
বাঁ পায়ের ফুটবলারদের পেনাল্টি কি বাঁচানো সহজ?
অনেকেই মনে করেন, ডান পায়ের ফুটবলাররা পেনাল্টিতে বেশি সফল। প্রতি ৫ জনে একজন বাঁ পায়ের ফুটবলার হন। ফলে গোলকিপারদের কাছে বাঁ পায়ের শট পড়ার পরিমাণ কম। ডান পায়ের ফুটবলারদের সংখ্যাধিক্যের কারণে গোলকিপাররা সেই অ্যাঙ্গেলেই বেশি প্রস্তুত থাকেন। তবে পরিসংখ্যান বলে ভিন্ন কথা। বাঁ পায়ের ফুটবলারদের পেনাল্টি বাঁচানো সহজ নয়, কিন্তু মেসির ক্ষেত্রে তাঁর রান-আপের ধীরগতি একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২০০৫ সালে অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপের ফাইনালে পেনাল্টি থেকে দুটি গোল করে আর্জেন্টিনাকে জিতিয়েছিলেন মেসি। আর্জেন্টিনার হয়ে পেনাল্টি শুটআউটে ন'বার এগিয়ে গিয়ে সাতবার গোল করেছেন। ২০১৬ কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির বিরুদ্ধে এবং ২০২৪-এ ইকুয়েডরের বিরুদ্ধে তিনি মিস করেন। তবে অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে পেনাল্টি মিসের মধ্যে আলাদা বৈশিষ্ট্য রয়েছে।
অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে মানসিক লড়াইয়ে কেন হারলেন মেসি?
অস্ট্রিয়ার গোলকিপার আলেকজান্ডার স্লাগারের সাথে মানসিক লড়াইয়ে হেরে গেছেন মেসি। VAR-এর মাধ্যমে পেনাল্টি সিদ্ধান্ত হওয়ায় তাঁর কাছে পাঁচ মিনিট সময় ছিল। কিন্তু তিনি সেটা কাজে লাগাতে পারেননি। খুব ছোট রান-আপে দৌড়েছিলেন। শেষ দুটি ধাপের আগে গতি কমিয়ে দিয়েছিলেন। বোঝার চেষ্টা করেছিলেন স্লাগার কোন দিকে ঝাঁপাবেন। কিন্তু স্লাগার এক জায়গায় দাঁড়িয়ে মেসির চোখের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। সার্বভৌমতার লড়াইয়ে যেমন দৃঢ়তা দরকার, স্লাগার সেই দৃঢ়তা বজায় রেখেছিলেন। মেসি কিছু বুঝতে পারেননি এবং তাঁর শট পোস্টের বাইরে গিয়ে বেরিয়ে যায়।
গোলকিপারেরা এখন বুঝে গিয়েছে যে, শট নিতে আসা ফুটবলাররা গোলকিপার অনুমানক্ষমতার উপরই নির্ভর করে।
গায়ের জোডেট, পেনাল্টি বিশেষজ্ঞ, দ্য অ্যাথলেটিক
রান-আপের টেকনিক ও লড়াইয়ের মোড়
রান-আপের টেকনিকের মধ্যেই কৌশল লুকিয়ে আছে। জর্জিনহো, রবার্ট লেয়নডস্কি এবং হ্যারি কেন শট নেওয়ার আগে অপেক্ষা করেন গোলকিপার কোন দিকে ঝাঁপাবেন। তারপর শেষ মুহূর্তে দিক পরিবর্তন করেন। কিন্তু অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে মেসি গোলকিপারের গতিবিধি বুঝতে পারেননি।
গত বিশ্বকাপে মেসি সাতটি পেনাল্টির ছয়টিতে গোল করেছিলেন। কারণ গোলকিপাররা আগেভাগে একটি দিকে ঝাঁপাতে উদ্যত হয়েছিলেন। মেসি তাঁর মুক্তির অধিকার ব্যবহার করে উল্টো দিকে শট নিয়েছিলেন। ক্রোয়েশিয়ার বিরুদ্ধে ডোমিনিক লিভাকোভিচের মতো গোলকিপারকে তিনি পাত্তা দেননি, নিখুঁত জায়গায় শক্তিশালী শট মেরেছিলেন। কিন্তু পোল্যান্ডের সেজেনি সেই শট বাঁচিয়ে দেন।
ক্যারিয়ারের শুরুতে মেসি ছোট রান-আপে দ্রুত গতিতে গড়ানো শটে গোল করতেন। ২০১২ সাল থেকে তাঁর পেনাল্টিতে শ্লথতা লক্ষ্য করা যায়। তিনি থেমে যান, গোলকিপারের মুভমেন্ট বোঝার চেষ্টা করেন। এই দ্বিধাদ্বন্দ্বই তাঁকে বারবার পিছিয়ে দিচ্ছে। শক্তিশালী শটে তিনি গোল পাচ্ছেন, কিন্তু গড়ানো শটে বা পানেনকা কিকে অনেক সময়ই ব্যর্থ হচ্ছেন।
লিওনেল মেসির পেনাল্টি সাফল্যের হার কত?
আন্তর্জাতিক ফুটবলে লিওনেল মেসির পেনাল্টি সাফল্যের হার ৭৭ শতাংশ। ৩১টি পেনাল্টির মধ্যে তিনি ২৫টিতে গোল করেছেন। ক্লাব ফুটবলে ১৪৯টির মধ্যে ১১৬টিতে গোল করেছেন, যার সাফল্যের হারও ৭৭ শতাংশ।
অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে মেসির পেনাল্টি কেন মিস হলো?
অস্ট্রিয়ার গোলকিপার আলেকজান্ডার স্লাগার তাঁর জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিলেন এবং মেসির দিকে তাকিয়ে ছিলেন। মেসি ছোট রান-আপে গতি কমিয়ে গোলকিপারের মুভমেন্ট বোঝার চেষ্টা করেন। কিন্তু স্লাগার নড়েননি। মানসিক লড়াইয়ে হেরে মেসি একটি দিকে শট মারেন, যা পোস্টের বাইরে যায়।
বাঁ পায়ের ফুটবলারদের পেনাল্টি কি সত্যিই দুর্বল?
না, এটি সত্য নয়। পরিসংখ্যান বলে, প্রতি ৫ জনে একজন বাঁ পায়ের ফুটবলার হন। ফলে বাঁ পায়ে পেনাল্টির সংখ্যা স্বাভাবিকভাবেই কম। ডান পায়ের ফুটবলারদের সংখ্যা বেশি হওয়ায় গোলকিপাররা তাদের শট আন্দাজ করা কঠিন বলে মনে করেন, কিন্তু বাঁ পায়ের ফুটবলারদের ক্ষেত্রে এই সুবিধা কাজ করে না। মেসির ব্যর্থতার মূল কারণ তাঁর রান-আপে শ্লথতা এবং গোলকিপারের উপর নির্ভরশীলতা।
মেসির মতো ফুটবলারকে শুধুমাত্র পেনাল্টি দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। একজন মুক্তিযোদ্ধার মতোই তিনি বারবার আঘাত খেয়েও দাঁড়িয়ে থাকেন। দলের পেনাল্টি পাওয়ার প্রথম ভরসা এখনও তিনিই। লড়াই চলবে, কারণ সার্বভৌমতার লড়াই কখনো শেষ হয় না।