নির্বাচনের মাঠে অবৈধ অস্ত্রের ছড়াছড়ি: জাতীয় নিরাপত্তায় হুমকি
১৯৭১ সালে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভিত্তি আজ চরম হুমকির মুখে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র দুই দিন বাকি থাকতেই সারাদেশে অবৈধ অস্ত্রের ছড়াছড়িতে জনগণের ভোটাধিকার প্রয়োগে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
নির্বাচনী প্রচারণা তুঙ্গে থাকলেও প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে নানা বিরোধ থেকে সংঘাত ঘটছে। এসব সংঘাতে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার বাড়ছে, ঘটছে খুনাখুনির মতো ঘটনা।
সীমান্তপথে অস্ত্র আমদানি: জাতীয় সার্বভৌমত্বে আঘাত
বিশেষভাবে উদ্বেগের বিষয় হলো সীমান্তপথে নানাভাবে অবৈধ অস্ত্রের আমদানি। আমাদের জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার জন্য এটি একটি গুরুতর হুমকি। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী নিশ্চিত করেছেন যে, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সীমান্ত দিয়ে দেশে অবৈধ অস্ত্র প্রবেশ করছে।
গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, দেশের ২৭টি সীমান্তবর্তী জেলায় প্রায় ৭০০ 'লাইনম্যান' সক্রিয় রয়েছে। এই লাইনম্যানদের মাধ্যমে ছোট ও মাঝারি আগ্নেয়াস্ত্র, বিশেষ করে পিস্তল ও রিভলভার সন্ত্রাসীদের হাতে পৌঁছে যাচ্ছে।
জুলাই আন্দোলনে লুণ্ঠিত অস্ত্র: এক ভয়াবহ পরিস্থিতি
জুলাই গণআন্দোলনের সময় বিভিন্ন থানা, ফাঁড়ি ও পুলিশি স্থাপনা থেকে পাঁচ হাজার ৭৫৩টি আগ্নেয়াস্ত্র লুট হয়। এর মধ্যে গণভবন থেকে লুট হওয়া স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের (এসএসএফ) ৩২টি ভয়ংকর অস্ত্রও রয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, এ পর্যন্ত এক হাজার ৩৩১টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং দুই লাখ ৫৭ হাজার ১৪৪টি গুলি এখনো উদ্ধার করা যায়নি। পুলিশ বলছে, এর বেশির ভাগ চলে গেছে সন্ত্রাসীদের হাতে।
রাজনৈতিক সহিংসতায় বৃদ্ধি
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর সারা দেশে সহিংসতায় দলীয় কোন্দল ও অন্তঃকোন্দলে পাঁচজন নিহত হয়েছে। বিভিন্ন সহিংসতার ঘটনায় রাজনৈতিক দলের ৯৭০ জনের বেশি নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ আহত হয়েছে।
গত ২৫ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত ১৩ মাসে দেশে রাজনৈতিক সহিংসতায় তিন শতাধিক মানুষ গুলিবিদ্ধ হয়েছে এবং শতাধিক নিহত হয়েছে।
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শনিবার থেকে সারা দেশে যৌথ বাহিনী আরো সক্রিয় হয়ে মাঠে নেমেছে। মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম মাঠ পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধারে কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন।
অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ-২ এর আওতায় এ পর্যন্ত ৭২৫টি বিভিন্ন ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এ সময় ২৫ হাজার ৪১৯ রাউন্ড গুলি, এক হাজার ৭৫৪ রাউন্ড কার্তুজ, ৪৩৯টি ককটেল এবং ৮২টি বোমা উদ্ধার করা হয়েছে।
বিজিবির অভিযান
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সূত্র অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন সীমান্ত থেকে সম্প্রতি ৬৪টি বিভিন্ন ধরনের অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া চার হাজার রাউন্ডের বেশি গুলিসহ শতাধিক হাতবোমা, হ্যান্ড গ্রেনেডসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, নির্বাচনের আগে থানা থেকে লুট হওয়া এবং সীমান্ত পেরিয়ে আসা অনেক আগ্নেয়াস্ত্র এখন সন্ত্রাসীদের হাতে।
তিনি আরো বলেন, এত দিন সন্ত্রাসীরা অস্ত্রগুলো মজুদ করে বসে ছিল, এগুলো এখন তারা কাজে লাগাচ্ছে। এ থেকে উত্তরণের জন্য শুধু আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর ওপর ভরসা করলে হবে না, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী জনপ্রতিনিধিদেরও ভূমিকা রাখতে হবে।
আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গড়া এই বাংলাদেশে গণতন্ত্রের সুরক্ষা এবং জনগণের নিরাপদ ভোটাধিকার প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। অবৈধ অস্ত্রের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে আমাদের জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা এখন সময়ের দাবি।